BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

কর্পোরেট বন্ড

সরকার নয়, কোনো কোম্পানি বা ব্যাংককে ধার দেওয়া। বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা আর মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত, তবে ফেরতের দায় সেই কোম্পানির, তাই ঝুঁকিও তার অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

ভিডিও আসছে
কর্পোরেট বন্ড: কোম্পানিকে ধার দেওয়া

কর্পোরেট বন্ড কী

কর্পোরেট বন্ড মানে কোনো কোম্পানি বা ব্যাংককে টাকা ধার দেওয়া। ব্যবসা বড় করতে, কারখানা বানাতে বা পুরোনো ঋণ শোধ করতে কোম্পানির টাকা লাগে; ব্যাংক থেকে না নিয়ে তারা সরাসরি মানুষের কাছ থেকেও ধার নিতে পারে। আপনি ঋণদাতা, কোম্পানি ঋণগ্রহীতা।

বিনিময়ে কোম্পানি নিয়মিত মুনাফা আর মেয়াদ শেষে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেয়। সরকারি বন্ডের সঙ্গে বড় পার্থক্য হলো টাকা ফেরতের দায় কার: সরকারের নয়, ওই কোম্পানির। কোম্পানি বিপদে পড়লে আপনার টাকাও আটকে যেতে পারে।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক সুমাইয়া একটা কোম্পানির ৫ বছর মেয়াদি বন্ডে ৫০,০০০ টাকা দিলেন, আর ধরা যাক বছরে ১০% মুনাফা। কোম্পানি ঠিকঠাক চললে তিনি প্রতি বছর ৫,০০০ টাকা পাবেন, আর পাঁচ বছর পর ৫০,০০০ টাকা ফেরত। কিন্তু মাঝপথে কোম্পানি লোকসানে পড়লে মুনাফা দেরিতে আসতে পারে, এমনকি মূল টাকার একটা অংশও আটকে যেতে পারে।

কীভাবে কাজ করে

কোনো কোম্পানি ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে সরাসরি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ধার নিতে বন্ড ইস্যু করে। আপনি বন্ড কিনলে কোম্পানি নির্দিষ্ট সময় পরপর মুনাফা (কুপন) দেয় আর মেয়াদ শেষে মূল টাকা ফেরত দেয়। কুপন স্থির হতে পারে, আবার কোনো রেফারেন্স রেটের সঙ্গে একটা মার্জিন যোগ করে ভাসমানও (ফ্লোটিং) হতে পারে।

বাংলাদেশে বন্ড ইস্যু অনুমোদন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), প্রধানত বিএসইসি (ডেট সিকিউরিটিজ) রুলস ২০২১ অনুযায়ী। ব্যাংক বন্ড ইস্যু করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনও লাগে। ইস্যুর সঙ্গে সাধারণত একজন ট্রাস্টি থাকে, যার কাজ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ দেখা, আর একটা ক্রেডিট রেটিং।

বাস্তবে বাংলাদেশের বেশিরভাগ কর্পোরেট বন্ড প্রাইভেট প্লেসমেন্টে বিক্রি হয়, অর্থাৎ বেছে নেওয়া কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে, প্রায়ই প্রতি ইউনিট লাখ বা কোটি টাকার অঙ্কে। সাধারণ মানুষের জন্য পথ মূলত দুটি: পাবলিক অফারে আবেদন, আর স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত বন্ড বিও হিসাব দিয়ে কেনা।

উদাহরণ (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)

একটা বন্ডের কুপন “রেফারেন্স রেট + ২%”। যে সময়ে রেফারেন্স রেট ৮%, তখন কুপন বছরে ১০%; ৳ ১,০০,০০০-এ বছরে ৳ ১০,০০০, কর কাটার আগে। রেফারেন্স রেট ৬%-এ নামলে কুপনও নামে ৮%-এ। অনেক বন্ডে কুপনের একটা নিচের ও ওপরের সীমা (ফ্লোর ও ক্যাপ) থাকে। হারগুলো উদাহরণ মাত্র।

যেসব ধরন দেখা যায়

সাধারণ কর্পোরেট বন্ড
নির্দিষ্ট মেয়াদ, নির্দিষ্ট বা ভাসমান কুপন। কিছু বন্ড জামানতযুক্ত (সিকিউরড), বেশিরভাগ জামানতহীন।
সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড
মূলত ব্যাংক মূলধন বাড়াতে ইস্যু করে, মেয়াদ সাধারণত ৫–৭ বছর। ব্যাংক বন্ধ হলে আমানতকারী ও অন্য পাওনাদাররা আগে টাকা পান, সাবঅর্ডিনেটেড বন্ডধারীরা পরে।
পারপেচুয়াল বন্ড
কোনো মেয়াদ নেই; ইস্যুকারী চাইলে নির্দিষ্ট শর্তে ফেরত কিনে নিতে পারে, কিন্তু বাধ্য নয়। মুনাফা আটকে দেওয়া বা লোকসান হলে মূল্য কমিয়ে দেওয়ার শর্ত থাকতে পারে। বিএসইসির নিয়মে এগুলোর অন্তত ১০% পাবলিক অফারে দিতে হয় এবং স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়।
জিরো-কুপন বন্ড
মাঝে কোনো মুনাফা নেই; কম দামে কিনে মেয়াদ শেষে গায়ের দাম পাওয়া।
কনভার্টিবল বন্ড ও কর্পোরেট সুকুক
কিছু বন্ড পরে শেয়ারে রূপান্তর করা যায়; কিছু কোম্পানি শরিয়াহভিত্তিক সুকুকও ইস্যু করে।

ক্রেডিট রেটিং কী বলে, কী বলে না

ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ইস্যুকারীর টাকা ফেরত দেওয়ার সামর্থ্য নিয়ে একটা মতামত দেয়, অক্ষরে (যেমন AAA, AA, A, BBB…)। রেটিং যত নিচে, ঝুঁকি তত বেশি ধরা হয় এবং সাধারণত কুপনও তত বেশি দিতে হয়।

রেটিং নিশ্চয়তা নয়। এটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের মতামত, পরে বদলাতে পারে, আর অতীতে উঁচু রেটিংয়ের প্রতিষ্ঠানও সমস্যায় পড়েছে। রেটিং দেখুন, কিন্তু সেটাকেই একমাত্র যাচাই ভাববেন না।

ঝুঁকিগুলো কোথায়

এফডিআরের মতো আমানত সুরক্ষা বন্ডে নেই। ব্যাংকের সাবঅর্ডিনেটেড বা পারপেচুয়াল বন্ড কিনলে আপনি আমানতকারী নন, তাই ব্যাংক সমস্যায় পড়লে আপনার টাকা সুরক্ষিত সীমার আওতায় পড়ে না। ২০২৫ সালে কয়েকটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার সময় তাদের ইস্যু করা বন্ডের টাকা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে।

লেনদেন খুব কম। স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত বন্ডেও প্রায়ই দিনের পর দিন লেনদেন হয় না, ফলে দরকারের সময় বেচতে গেলে গায়ের দামের চেয়ে কম দাম নিতে হতে পারে। ব্যাংক বন্ডের বেশিরভাগ এখন পর্যন্ত কিনেছে অন্য ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান; সাধারণ বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ খুব কম।

সুদের হারের ঝুঁকিও আছে। বাজারের হার বাড়লে স্থির কুপনের বন্ডের দাম কমে, ঠিক ট্রেজারি বন্ডের মতো।

কত লাভ আশা করা যায়

বাংলাদেশে বন্ডের আয়ের কোনো একক সরকারি পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের হাতের কাছে নেই, আর প্রতিটি বন্ডের শর্ত আলাদা। ২০২১–২০২৩ সালে ইস্যু হওয়া অনেক ব্যাংক বন্ডের কুপন ঘোষিত হয়েছিল বছরে ৬–১০%-এর সীমার মধ্যে, বা কোনো রেফারেন্স রেট (যেমন আমানতের গড় হার) যোগ ২–৩% মার্জিন হিসেবে।

ভাসমান কুপনের বন্ডে হার সময়ের সঙ্গে রেফারেন্স রেট অনুযায়ী ওঠানামা করে, আর ফ্লোর ও ক্যাপ সেই ওঠানামাকে সীমিত রাখে। তাই কোনো বন্ডের বর্তমান কুপন জানতে তার প্রসপেক্টাস বা ট্রাস্টির ঘোষণা দেখতে হয়।

সরকারি বন্ডের চেয়ে বেশি কুপন মানে বাড়তি ঝুঁকির দাম। সাম্প্রতিক কিছু বছরে ঝুঁকিমুক্ত সরকারি বিল ও বন্ডের ইল্ড অনেক ব্যাংক বন্ডের আয়ের চেয়েও বেশি ছিল, যা বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম থাকার একটা কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র: বিএসইসি অনুমোদন ও তালিকাভুক্তি নিয়ে প্রতিবেদন, প্রথম আলো (জুন ২০২২), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (২০২১–২০২৩), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (আগস্ট ২০২৬); বিনিয়োগকারী ও বাজার: দ্য ডেইলি স্টার (জানুয়ারি ২০২৬)

যে কারণে মানুষ বেছে নেয়

  • সরকারি বন্ডের চেয়ে বেশি কুপন পাওয়ার সম্ভাবনা।
  • নিয়মিত মুনাফা; অনেক বন্ডে ছয় মাস পরপর।
  • তালিকাভুক্ত বন্ড বিও হিসাব দিয়ে কেনাবেচা করা যায়।
  • বিএসইসির নিয়ম, ট্রাস্টি আর রেটিংয়ের মাধ্যমে কিছুটা তদারকি আছে।

যা ভেবে দেখার

  • টাকা ফেরত দেওয়া ইস্যুকারীর আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে; আমানত সুরক্ষা নেই।
  • সাবঅর্ডিনেটেড ও পারপেচুয়াল বন্ডধারীরা পাওনার লাইনে পেছনে।
  • লেনদেন কম; দরকারে বেচা কঠিন, কম দামে বেচতে হতে পারে।
  • পারপেচুয়াল বন্ডের মেয়াদ নেই, মুনাফা আটকেও যেতে পারে।

কর

বন্ডের মুনাফা আপনার মোট আয়ের অংশ, আর সাধারণত দেওয়ার সময় উৎসে কর কাটা হয়। কোন হারে কাটা হবে, তা আয়কর আইন ২০২৩ ও প্রতি বছরের অর্থ আইনে নির্ধারিত হয় এবং বদলাতে পারে। রিটার্ন জমা দিলে কেটে রাখা কর মোট করের সঙ্গে সমন্বয় হয়।

অনুমোদিত জিরো-কুপন বন্ডের আয় দীর্ঘদিন করমুক্ত ছিল; অর্থ বিল ২০২৬-এ এই ছাড় তুলে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। কোনো বন্ড কেনার আগে সে বছরের নিয়মটা দেখে নিন। স্টক এক্সচেঞ্জে বেচে লাভ হলে তার করের নিয়মও আলাদা হতে পারে।

করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

কীভাবে শুরু করবেন

  1. বিও হিসাব খুলুন, বা আগে থেকে থাকলে ব্রোকারকে জানান যে বন্ড কিনতে চান।
  2. তালিকাভুক্ত বন্ডের তালিকা স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে দেখুন; পাবলিক অফারের ঘোষণা বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জে আসে।
  3. যে বন্ডে আগ্রহী, তার প্রসপেক্টাস বা তথ্য বিবরণী পড়ুন: কুপন, মেয়াদ, সাবঅর্ডিনেটেড না পারপেচুয়াল, রেটিং আর ট্রাস্টি।
  4. বাজারে সাম্প্রতিক লেনদেন হয়েছে কি না, আর কোন দামে, দেখে নিন।
  5. ব্রোকারের কমিশন আর অন্য চার্জ জেনে নিন।

শুরুর আগে যাচাই করুন

  • ইস্যুকারী টাকা ফেরত দিতে না পারলে কী হবে, বুঝেছি?
  • এটা সাবঅর্ডিনেটেড না পারপেচুয়াল, আর তাতে আমার অবস্থান কোথায়?
  • রেটিং কত, কবে দেওয়া, আর সর্বশেষ আপডেট কবে?
  • কুপন স্থির না ভাসমান; ফ্লোর ও ক্যাপ কত?
  • দরকারে বেচতে না পারলে কত দিন টাকা ছাড়া চলতে পারব?
  • একই সময়ের সরকারি বন্ডের ইল্ডের তুলনায় বাড়তি আয়টা কি বাড়তি ঝুঁকির উপযুক্ত মনে হয়?

কাছাকাছি আর যা আছে

সূত্র
নিয়ম: বিএসইসি (ডেট সিকিউরিটিজ) রুলস ২০২১ ও সংশোধনী, sec.gov.bd।
পারপেচুয়াল বন্ডের ১০% পাবলিক অফার ও তালিকাভুক্তি: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২০২১।
কুপন-সীমা ও রেফারেন্স রেট যোগ মার্জিন: প্রথম আলো, জুন ২০২২; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২০২৩; দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৫ আগস্ট ২০২৬।
প্রাইভেট প্লেসমেন্টের প্রাধান্য: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১২ আগস্ট ২০২৩।
ব্যাংক বন্ডের ক্রেতা, ঝুঁকি ও ২০২৫ সালের একীভূতকরণ: দ্য ডেইলি স্টার, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬।
জিরো-কুপন বন্ডের কর ছাড়: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১৪ জুন ২০২৬।
এই পাতার সংখ্যাগুলো একটা সময়ের পরিসর, নির্দিষ্ট দিনের হার নয়। আজকের হার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন। এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়।