BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

ফাইন্যান্স কোম্পানির মেয়াদি আমানত (এনবিএফআই)

ব্যাংক নয়, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সে চলা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যারা মেয়াদি আমানত নেয় এবং ঋণ ও লিজ দেয়। হার প্রায়ই ব্যাংকের চেয়ে বেশি, ঝুঁকিও বেশি হতে পারে, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাতটা বড় সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে।

ভিডিও আসছে
ফাইন্যান্স কোম্পানিতে আমানত: বেশি হার, কিন্তু কেন?

ফাইন্যান্স কোম্পানি কী

ফাইন্যান্স কোম্পানি (এনবিএফআই) এমন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যা ব্যাংক নয়, তবু মানুষের কাছ থেকে আমানত নেয় আর ব্যবসা, গাড়ি বা বাড়ির জন্য ঋণ দেয়। এখানে টাকা রাখা মানে কোম্পানিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য টাকা ধার দেওয়া; চুক্তি হলো, মেয়াদ শেষে সে সুদসহ ফেরত দেবে।

নাম আর অফিস দেখে অনেকে একে ব্যাংক ভেবে ভুল করেন। ব্যাংক আর ফাইন্যান্স কোম্পানি দুটোই বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সে চলে, কিন্তু তাদের নিয়মকানুন আর ঝুঁকির ধরন এক নয়।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক নাসরিন একটা ফাইন্যান্স কোম্পানির বিজ্ঞাপনে দেখলেন, সুদ তাঁর ব্যাংকের চেয়ে বেশি। তিনি সেখানে ৳ ২,০০,০০০ দুই বছরের জন্য রাখলেন। এর মানে তিনি টাকাটা ওই কোম্পানিকে ধার দিলেন; মেয়াদ শেষে ফেরত পাওয়া নির্ভর করবে কোম্পানি নিজে যাদের ঋণ দিয়েছে, তারা ঠিকমতো শোধ করছে কি না, তার ওপর।

কীভাবে কাজ করে

ফাইন্যান্স কোম্পানি (আগে বলা হতো নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা লিজিং কোম্পানি) বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়ে ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন ২০২৩-এর অধীনে চলে। এরা ব্যবসা, যন্ত্রপাতি লিজ, গাড়ি বা বাড়ির জন্য ঋণ দেয়, আর সেই টাকার একটা অংশ জনগণের মেয়াদি আমানত থেকে আসে।

ব্যাংকের সঙ্গে বড় পার্থক্য: ফাইন্যান্স কোম্পানি সঞ্চয়ী বা চলতি হিসাব খুলতে পারে না, চেক বই দেয় না; শুধু নির্দিষ্ট মেয়াদে আমানত নেয়। আপনি একবারে টাকা রাখেন, মেয়াদ বেছে নেন, আর খোলার দিনের হারে মেয়াদ শেষে বা মাসে মাসে মুনাফা পান, অনেকটা এফডিআরের মতো।

হার বেশি হয় কারণ ফাইন্যান্স কোম্পানির টাকা জোগাড়ের খরচ বেশি এবং তাদের ঋণগ্রহীতারা প্রায়ই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বাড়তি হার এই বাড়তি ঝুঁকির দাম। আগে ভাঙানোর নিয়ম ব্যাংকের চেয়ে কড়া হতে পারে, আর দুর্বল প্রতিষ্ঠানে মেয়াদ শেষেও টাকা পেতে দেরি হতে পারে।

উদাহরণ (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)

৳ ১,০০,০০০ এক বছরের জন্য ফাইন্যান্স কোম্পানিতে বছরে ১১% হারে রাখলে সুদ হয় ৳ ১১,০০০; একই সময়ে কোনো ব্যাংকে ৯% হলে ৳ ৯,০০০। পার্থক্য ৳ ২,০০০ (কর কাটার আগে)। এই বাড়তি টাকার বিনিময়ে আপনি কতটা বাড়তি ঝুঁকি নিচ্ছেন, সেটাই আসল প্রশ্ন। হারগুলো উদাহরণ মাত্র।

যেসব রূপে পাওয়া যায়

মেয়াদি আমানত
কয়েক মাস থেকে কয়েক বছরের জন্য থোক টাকা; মেয়াদ শেষে মূল ও মুনাফা।
মাসিক বা ত্রৈমাসিক মুনাফা
মূল টাকা আটকে থাকে, মুনাফা নিয়মিত হাতে আসে।
দ্বিগুণ-তিন গুণ স্কিম
নির্দিষ্ট বছরে টাকা দ্বিগুণ বা তিন গুণ করার প্রস্তাব; আসল বার্ষিক হার বের করার পদ্ধতি বিশেষ সঞ্চয় স্কিমের পাতায়।
মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প
ডিপিএসের মতো প্রতি মাসে জমা; কিছু মোবাইল অ্যাপের ডিপিএসও ফাইন্যান্স কোম্পানিতে খোলা হয়।

আমানত সুরক্ষা কবে থেকে

দীর্ঘদিন ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতে কোনো আইনি সুরক্ষা ছিল না; পুরোনো আমানত বীমা আইন শুধু ব্যাংকের জন্য ছিল। আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ (যা ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের জায়গা নিয়েছে) প্রথমবার ফাইন্যান্স কোম্পানিকে আওতায় এনেছে, তাদের জন্য আলাদা আমানত সুরক্ষা তহবিল রেখে। প্রতি আমানতকারীর সীমা ব্যাংকের মতোই ২ লাখ টাকা।

তবে ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো এই তহবিলের সদস্য হবে ২০২৮ সালের ১ জুলাই থেকে। তাই তার আগে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে এই আইনের ২ লাখ টাকার সুরক্ষা প্রযোজ্য হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়; সিদ্ধান্তটা সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর নির্ভর করবে।

খাতের সাম্প্রতিক সংকট

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৫টি ফাইন্যান্স কোম্পানির মোট ঋণের প্রায় ৩৭% ছিল খেলাপি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০টি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত বা “রেড” শ্রেণিতে রাখে। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের আমানতকারী বছরের পর বছর মেয়াদ শেষেও টাকা তুলতে পারেননি।

২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৯টি প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রক্রিয়া শুরু করে। ঘোষণা অনুযায়ী ব্যক্তি আমানতকারীরা সরকারের দেওয়া প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে মূল টাকা ফেরত পাবেন, কিন্তু কোনো সুদ নয়; প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরা পাবেন সম্পদ বিক্রি করে যা উদ্ধার হয়, তার অংশ। অর্থাৎ বেশি হারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত অনেকে বছরের পর বছর কোনো মুনাফা পাননি।

সব ফাইন্যান্স কোম্পানি দুর্বল নয়; খাতের ভেতরে শক্ত আর দুর্বল প্রতিষ্ঠানের পার্থক্য অনেক। এ কারণেই প্রতিষ্ঠান ধরে ধরে যাচাই করা জরুরি।

কত লাভ আশা করা যায়

২০২২ সালের জুলাই থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতের হারে ৭%-এর সীমা দিয়েছিল, যদিও অনেকে তার বেশি দিত। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে সীমা তুলে বাজারভিত্তিক মানদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, এবং ২০২৪ সালে অনেক প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১১–১২% হারে আমানত নিয়েছে।

একই সময়ে ব্যাংকের এফডিআরের চেয়ে ফাইন্যান্স কোম্পানির হার সাধারণত ১–৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি থাকে। কোনো প্রতিষ্ঠান খাতের বাকিদের চেয়েও অনেক বেশি দিলে সেটা প্রায়ই আমানত টানার মরিয়া চেষ্টার লক্ষণ।

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার ও সুদহার তথ্য, ২০২২–২০২৪ (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত)

যে কারণে মানুষ বেছে নেয়

  • একই মেয়াদে হার সাধারণত ব্যাংকের চেয়ে বেশি।
  • বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স ও তদারকিতে চলে।
  • মাসিক মুনাফাসহ নানা মেয়াদ ও রূপ পাওয়া যায়।
  • ২০২৮ সালের জুলাই থেকে আমানত সুরক্ষার আওতায় আসার কথা।

যা ভেবে দেখার

  • খাতে খেলাপি ঋণ খুব বেশি; কিছু প্রতিষ্ঠান আমানত ফেরত দিতে পারেনি।
  • ২০২৮ সালের আগে আইনি আমানত সুরক্ষা নিশ্চিত নয়।
  • সঞ্চয়ী হিসাব নেই; আগে ভাঙানোর নিয়ম কড়া হতে পারে।
  • বেশি হার প্রায়ই বেশি ঝুঁকির সংকেত।

কর

সুদ দেওয়ার সময় ফাইন্যান্স কোম্পানি উৎসে কর কেটে রাখে। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার ছিল টিআইএন থাকলে ১০% আর না থাকলে ১৫%; প্রতি বছরের অর্থ আইনে হার বদলাতে পারে।

সুদ আপনার মোট আয়ের অংশ; রিটার্ন জমা দিলে কেটে রাখা কর মোট করের সঙ্গে সমন্বয় হয়। আবগারি শুল্কের নিয়মও অর্থ আইনে নির্ধারিত হয় এবং বদলাতে পারে।

করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

কীভাবে শুরু করবেন

  1. প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফাইন্যান্স কোম্পানির তালিকায় আছে কি না, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেখুন।
  2. প্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন দেখুন: খেলাপি ঋণের হার, মূলধন আর লোকসান আছে কি না।
  3. মেয়াদ, হার, অটো-রিনিউ আর আগে ভাঙানোর নিয়ম লিখিতভাবে জেনে নিন।
  4. কাগজপত্র: জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, নমিনির পরিচয়পত্র ও ছবি, আর টিআইএন থাকলে সেটি।
  5. আমানতের রসিদ নিরাপদে রাখুন, আর টাকা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে দিন, কোনো ব্যক্তির হাতে নয়।

শুরুর আগে যাচাই করুন

  • এই টাকা হারালে বা কয়েক বছর আটকে থাকলে আমি সামলাতে পারব?
  • হারটা ব্যাংকের এফডিআরের চেয়ে কত বেশি, আর কেন?
  • প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ও মূলধনের অবস্থা দেখেছি?
  • বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্বল বা বিপর্যস্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কি না, খবরে দেখেছি?
  • আমানত সুরক্ষা কবে থেকে প্রযোজ্য, বুঝেছি?
  • নমিনি ঠিকমতো দেওয়া আছে?

কাছাকাছি আর যা আছে

সূত্র
আমানতের হার: বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার, এপ্রিল ২০২২ (ঢাকা ট্রিবিউন, ১৯ এপ্রিল ২০২২); দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৭ অক্টোবর ২০২২; দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ১৯ মে ২০২৪।
আইন: ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন ২০২৩।
আমানত সুরক্ষা ও ২০২৮ থেকে সদস্যপদ: আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ (বাসস, এপ্রিল ২০২৬); আগে আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫।
খেলাপি ঋণ: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য, সেপ্টেম্বর ২০২৫ (দ্য ডেইলি স্টার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬)।
অবসায়ন ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬।
উৎসে কর: আয়কর আইন ২০২৩ ও সংশ্লিষ্ট অর্থ আইন।
এই পাতার সংখ্যাগুলো একটা সময়ের পরিসর, নির্দিষ্ট দিনের হার নয়। আজকের হার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন। এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়।