BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

অনুমোদনহীন ইনভেস্টমেন্ট ও আয়ের অ্যাপ

“প্রতিদিন ২% লাভ”, “ভিডিও দেখে আয়”, “টাস্ক করে কমিশন”: মোবাইল অ্যাপ, ওয়েবসাইট আর সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে এমন প্রস্তাব প্রায়ই আসে। এই পাতায় এগুলো কীভাবে কাজ করে, কেন টেকে না, আর কোনো প্ল্যাটফর্ম লাইসেন্সপ্রাপ্ত কি না নিজে কীভাবে যাচাই করবেন, তা বোঝানো হয়েছে।

ভিডিও আসছে
অনুমোদনহীন ইনভেস্টমেন্ট অ্যাপ: কীভাবে কাজ করে, কেন ভেঙে পড়ে

অনুমোদনহীন ইনভেস্টমেন্ট অ্যাপ কী

এগুলো মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইট, যেখানে টাকা জমা দিলে প্রতিদিন বা প্রতি সপ্তাহে লাভ দেওয়ার কথা বলা হয়, অথবা ছোট ছোট “কাজ” করে আয়ের সুযোগ দেখানো হয়। “অনুমোদনহীন” মানে, মানুষের টাকা নিয়ে কাজ করার জন্য বাংলাদেশের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার লাইসেন্স তাদের নেই।

আপনি টাকা পাঠান অ্যাপের পেছনের অচেনা মানুষদের কাছে, আর বিনিময়ে পান শুধু অ্যাপের পর্দায় একটা ব্যালান্স। কোনো শেয়ার, আমানতের রসিদ বা আইনি চুক্তি সাধারণত আপনার হাতে থাকে না।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক কলেজছাত্র সোহেল একটা ফেসবুক গ্রুপে দেখল, একটা অ্যাপে ৳ ২,০০০ রাখলে প্রতিদিন লাভ জমা হয়। কয়েক দিন পর সে ৳ ৩০০ তুলতে পারল, তাই ভরসা করে আরও ৳ ১০,০০০ দিল আর দুই বন্ধুকেও যোগ দিতে রাজি করাল। এরপর টাকা তুলতে গেলে বলা হলো আগে “আনলক ফি” দিতে হবে, আর কিছুদিন পর অ্যাপটাই আর খুলছে না। টাকা কার কাছে গেল, কোথায় অভিযোগ করবে, সোহেল জানে না। এটা একটা কাল্পনিক উদাহরণ।

কীভাবে কাজ করে

বেশিরভাগ এমন অ্যাপের কাঠামো একই। প্রথমে ছোট অঙ্কে “ইনভেস্ট” করতে বলা হয়, আর অ্যাপের ভেতরের ব্যালান্সে প্রতিদিন লাভ জমা হতে দেখা যায়। শুরুতে অল্প টাকা তুলতেও দেওয়া হয়, যাতে আস্থা তৈরি হয়। তারপর বলা হয় বড় “প্যাকেজ” কিনলে বা নতুন মানুষ আনলে লাভ আরও বেশি।

অ্যাপের পর্দায় যে ব্যালান্স দেখা যায়, সেটা শুধু একটা সংখ্যা; পেছনে আসল কোনো ব্যবসা বা সম্পদ সাধারণত থাকে না। যারা টাকা তোলেন, তাদের দেওয়া হয় নতুন যোগ দেওয়া মানুষের টাকা থেকে। নতুন টাকা আসা কমলে প্রথমে উত্তোলনে “সাময়িক সমস্যা”, “ট্যাক্স” বা “আনলক ফি” দেখানো হয়, তারপর অ্যাপ বা ওয়েবসাইট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়।

টাকা সাধারণত পাঠানো হয় ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর বা ব্যক্তিগত হিসাবে, কোম্পানির নামে নয়। পরিচালনাকারীরা অনেক সময় দেশের বাইরে থাকেন বা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখেন, তাই প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হলে টাকা ফেরত পাওয়া প্রায় অসম্ভব।

উদাহরণ: “দিনে ২%” কতটা অবাস্তব

দিনে ২% চক্রবৃদ্ধি হারে ৳ ১০,০০০ এক বছরে হিসাব অনুযায়ী দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। কোনো বৈধ ব্যবসা এভাবে টাকা বাড়াতে পারে না। ২০২০–২০২৬ সময়ে ব্যাংকের এফডিআরে হার ছিল বছরে মোটামুটি ৫–১২%। প্রতিশ্রুত হার যত অবাস্তব, ঝুঁকি তত বেশি।

যেসব রূপে দেখা যায়

দৈনিক লাভের ইনভেস্টমেন্ট অ্যাপ
প্যাকেজ কিনলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট লাভ; প্রায়ই খনি, কৃষি, ই-কমার্স বা “এআই ট্রেডিং”-এর গল্প জুড়ে দেওয়া হয়।
টাস্ক বা ক্লিক করে আয়
ভিডিও দেখা, রিভিউ দেওয়া বা পণ্যে “ক্লিক” করে কমিশন; বড় টাস্ক পেতে নিজের টাকা জমা দিতে হয়।
অনুমোদনহীন অনলাইন ট্রেডিং
ফরেক্স, কমোডিটি বা “শেয়ার” ট্রেডিংয়ের প্ল্যাটফর্ম, যার বাংলাদেশে কোনো লাইসেন্স নেই; অনেক সময় “গ্যারান্টিড সিগন্যাল” বিক্রি করা হয়।
অনুমোদনহীন ঋণের অ্যাপ
সহজ ঋণের প্রস্তাব, কিন্তু চড়া সুদ, ফোনের কন্টাক্ট আর ছবিতে প্রবেশ, আর না দিলে হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইল।

লাইসেন্স কীভাবে যাচাই করবেন

বাংলাদেশে মানুষের টাকা নিয়ে যে প্রতিষ্ঠান কাজ করে, তাদের প্রায় সবার কোনো না কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার লাইসেন্স লাগে, আর নিয়ন্ত্রকরা তাদের ওয়েবসাইটে লাইসেন্সপ্রাপ্তদের তালিকা রাখে। প্রতিষ্ঠানের দেখানো সনদ নয়, নিয়ন্ত্রকের নিজের ওয়েবসাইটে নামটা খুঁজুন।

বাংলাদেশ ব্যাংক
ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) আর পেমেন্ট সেবাদাতা। অনুমোদন ছাড়া ঋণ দেওয়া বা পেমেন্ট সেবা চালানো পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইন ২০২৪ অনুযায়ী দণ্ডনীয়।
বিএসইসি (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন)
স্টক ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপক আর মিউচুয়াল ফান্ড। শেয়ার বা ফান্ডে ইনভেস্টের কথা বললে এখানে খুঁজুন।
আইডিআরএ (বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ)
জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানি। “বীমা” বা “পলিসি” নামে কিছু বিক্রি হলে এখানে খুঁজুন।
এমআরএ (মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি)
ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা। সঞ্চয় নেওয়া বা ক্ষুদ্রঋণের কথা বললে এখানে খুঁজুন।

সতর্ক হওয়ার লক্ষণ

দৈনিক বা সাপ্তাহিক নিশ্চিত লাভ
বৈধ ইনভেস্টমেন্টে এমন প্রতিশ্রুতি প্রায় দেওয়াই হয় না।
ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা পাঠানো
কোম্পানির নামে হিসাব নেই; টাকা যায় ব্যক্তিগত মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে।
উত্তোলনে বাধা
টাকা তুলতে গেলে “ট্যাক্স”, “ভেরিফিকেশন ফি” বা “লেভেল আপগ্রেড” চাওয়া।
নতুন মানুষ আনার চাপ
রেফারেল বোনাস, টিম লেভেল, “লিডার” পদবি।
নিয়ন্ত্রকের নাম বা লোগোর অপব্যবহার
বাংলাদেশ ব্যাংক বা আন্তর্জাতিক সংস্থার লোগো দেখিয়ে আস্থা তৈরি; বাংলাদেশ ব্যাংক এ নিয়ে প্রকাশ্যে সতর্ক করেছে।
শুধু মেসেজিং অ্যাপ বা সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে যোগাযোগ
কোনো অফিস, ঠিকানা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তির পরিচয় নেই।

কত লাভ আশা করা যায়

অ্যাপ যে হার দেখায়, সেটা রিটার্ন নয়, প্রতিশ্রুতি মাত্র। আসল রিটার্ন নির্ভর করে আপনি কখন যোগ দিলেন আর প্ল্যাটফর্ম কখন বন্ধ হলো তার ওপর। শুরুতে যোগ দেওয়া কেউ কেউ টাকা তুলতে পারেন; বেশিরভাগ মানুষ মূল টাকাও ফেরত পান না।

অনুমোদনহীন প্ল্যাটফর্মে কোনো আমানত সুরক্ষা, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা বা অভিযোগ জানানোর নিয়ন্ত্রিত পথ নেই। ঋণের অ্যাপে উল্টো ঝুঁকি: ধার করা টাকার চেয়ে অনেক বেশি ফেরত দিতে হতে পারে, সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের হুমকি।

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা (অক্টোবর ২০২৫) ও অনুমোদনহীন ঋণ অ্যাপে পেমেন্ট বন্ধের নির্দেশ (সেপ্টেম্বর ২০২৬), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন

যে কারণে মানুষ বেছে নেয়

  • ইনভেস্টমেন্ট হিসেবে এর কোনো নির্ভরযোগ্য সুবিধা নেই। যে কাজ বৈধ অ্যাপে করা যায় (সঞ্চয়, বিও হিসাব, বীমা), সেটা লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের অ্যাপেই করা যায়।

যা ভেবে দেখার

  • পুরো টাকা হারানোর ঝুঁকি বেশি; ফেরত পাওয়ার আইনি পথ কঠিন ও দীর্ঘ।
  • জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি আর ফোনের তথ্য অপব্যবহার হতে পারে।
  • বন্ধু-আত্মীয়দের যুক্ত করলে তাদের লোকসানের দায়ও মানসিকভাবে আপনার ওপর আসে।
  • অনুমোদনহীন প্ল্যাটফর্মে লেনদেন নিজেই আইনি ঝামেলা তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে বিদেশে টাকা গেলে।

কর

এখানে কর পরিকল্পনার প্রশ্ন আসলে ওঠে না। কোনো আয় হলে সেটা তত্ত্বগতভাবে আপনার মোট আয়ের অংশ, কিন্তু অবৈধ উৎসের আয় বা হারানো টাকা বৈধ ইনভেস্টমেন্টের মতো দেখানো বা সমন্বয় করা যায় না।

বিদেশি প্ল্যাটফর্মে টাকা পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রশ্নও তোলে; অনুমোদিত কারণ ছাড়া বিদেশে টাকা পাঠানো যায় না।

করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

কীভাবে শুরু করবেন

  1. কোনো অ্যাপ বা প্ল্যাটফর্মে টাকা দেওয়ার আগে তার পুরো নাম, ঠিকানা আর কোন নিয়ন্ত্রকের লাইসেন্স আছে তা লিখে নিন।
  2. সেই নিয়ন্ত্রকের নিজের ওয়েবসাইটে (বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএ, এমআরএ) তালিকায় নামটা খুঁজুন।
  3. নাম না পেলে বা সন্দেহ হলে টাকা দেবেন না, আর কোনো ব্যক্তিগত তথ্য বা ওটিপি দেবেন না।
  4. ইতিমধ্যে টাকা দিয়ে থাকলে আর টাকা পাঠাবেন না, “উত্তোলন ফি” দিলেও না।
  5. স্ক্রিনশট, লেনদেনের রসিদ আর নম্বর সংরক্ষণ করুন, আর থানায় বা পুলিশের সাইবার অপরাধ ইউনিটে অভিযোগ করুন।

শুরুর আগে যাচাই করুন

  • প্রতিষ্ঠানের নাম কি নিয়ন্ত্রকের নিজের ওয়েবসাইটের তালিকায় আছে?
  • টাকা কি কোম্পানির নামে পাঠাচ্ছি, নাকি কারও ব্যক্তিগত নম্বরে?
  • প্রতিশ্রুত লাভ কি ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রের চেয়ে অনেক গুণ বেশি?
  • টাকা তুলতে কি আরও টাকা দিতে বলছে?
  • নতুন মানুষ আনার জন্য কি চাপ আছে?
  • এই টাকা পুরো হারালে কি চলতে পারব?

কাছাকাছি আর যা আছে

সূত্র
বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইএমএফের লোগো অপব্যবহার করে ভুয়া ঋণ নিয়ে সতর্কবার্তা: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৯ অক্টোবর ২০২৫।
অনুমোদনহীন ঋণ অ্যাপে পেমেন্ট সেবা বন্ধের নির্দেশ (পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট সিস্টেমস আইন ২০২৪): ঢাকা ট্রিবিউন, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬।
বিদেশি এমএলএম-ধরনের অনলাইন ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৩।
লাইসেন্সপ্রাপ্তদের তালিকা: বাংলাদেশ ব্যাংক (bb.org.bd), বিএসইসি (sec.gov.bd), আইডিআরএ (idra.org.bd), এমআরএ (mra.gov.bd), দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬।
এফডিআরের হারের তুলনা: বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদহার পরিসংখ্যান, ২০২০–২০২৬।
এই পাতার সংখ্যাগুলো একটা সময়ের পরিসর, নির্দিষ্ট দিনের হার নয়। আজকের হার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন। এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়।