এমএলএম ও সমিতি কী
এমএলএমে সাধারণত টাকা দিয়ে বা পণ্য কিনে একটা কোম্পানির সদস্য হতে হয়। এরপর আয়ের কথা বলা হয় দুই পথে: পণ্য বিক্রি করে, আর নতুন মানুষকে সদস্য বানিয়ে।
সমিতি স্কিমে আপনি একটা সমিতির কাছে টাকা জমা রাখেন, আর তারা প্রতি মাসে ব্যাংকের চেয়ে অনেক বেশি মুনাফা দেওয়ার কথা বলে। দুই ক্ষেত্রেই আপনার হাতে থাকে শুধু একটা প্রতিশ্রুতি; কোনো সম্পদের মালিক আপনি হন না, আর ব্যাংকের মতো আমানত সুরক্ষাও থাকে না।
ধরা যাক সেলিনার এক প্রতিবেশী তাঁকে একটা সমিতির কথা বললেন: ৳ ১ লাখ রাখলে প্রতি মাসে ৳ ৩,০০০ মুনাফা। প্রথম কয়েক মাস ঠিকমতো টাকা আসায় সেলিনা আরও টাকা রাখলেন, আর নিজের বোনকেও যোগ দিতে বললেন। পরে মুনাফা দেরিতে আসতে শুরু করল, তারপর একদিন অফিসটাই বন্ধ। শুরুর মুনাফা আসলে এসেছিল নতুন সদস্যদের জমা থেকে, আর মূল টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এটা একটা কাল্পনিক উদাহরণ।
কীভাবে কাজ করে
এমএলএম (মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং) মানে এমন ব্যবসা যেখানে সদস্যরা পণ্য বিক্রি করেন আর নতুন সদস্য আনেন; নিজের বিক্রির পাশাপাশি নিচের স্তরের সদস্যদের বিক্রি থেকেও কমিশন পান। কাগজে এটা পণ্য বিক্রির ব্যবসা।
সমস্যা শুরু হয় যখন আয়ের মূল উৎস হয়ে দাঁড়ায় পণ্য বিক্রি নয়, নতুন সদস্যের যোগদান ফি বা “ইনভেস্টমেন্ট”। তখন এটা পিরামিড স্কিম: পুরোনোদের টাকা দেওয়া হয় নতুনদের টাকা থেকে। প্রতিটা স্তরে আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ লাগে, আর একসময় নতুন মানুষ পাওয়া যায় না। তখন টাকা আসা বন্ধ হয়, স্কিম ভেঙে পড়ে, আর পরে যোগ দেওয়া বেশিরভাগ মানুষ টাকা হারান।
সমিতির ফাঁদ একটু আলাদা। আইনে সমবায় সমিতি হলো সদস্যদের নিজেদের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কিছু সমিতি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যাংকের মতো আমানত নেয় আর অনেক বেশি মাসিক মুনাফার প্রতিশ্রুতি দেয়। সেই মুনাফা প্রায়ই নতুন আমানত থেকে দেওয়া হয়, ফলে কাঠামোটা পিরামিডের মতোই হয়ে যায়। ব্যাংকের মতো আমানত সুরক্ষা এখানে নেই।
ধরুন প্রত্যেক সদস্যকে লাভ পেতে ৬ জন নতুন সদস্য আনতে হয়। প্রথম স্তরে ১ জন, দ্বিতীয় স্তরে ৬, তৃতীয়তে ৩৬, এভাবে ১১তম স্তরে লাগে ৬ কোটির বেশি নতুন মানুষ, আর ১২তম স্তরে ৩৬ কোটির বেশি, যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার দ্বিগুণের বেশি। তাই শেষ স্তরগুলোর মানুষের লাভ পাওয়া গাণিতিকভাবেই অসম্ভব।
বাংলাদেশের আইন কী বলে
বাংলাদেশে এমএলএম নিয়ন্ত্রণ করা হয় মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কার্যক্রম (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ দিয়ে (প্রথমে সেপ্টেম্বর ২০১৩-এ অধ্যাদেশ, পরে আইন)। এই আইনে লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম ব্যবসা করা নিষিদ্ধ (লাইসেন্স দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর, আরজেএসসি), আর যেখানে আয়ের মূল উৎস নতুন সদস্য আনা, সেই পিরামিড ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। লঙ্ঘনে কারাদণ্ড ও বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান আছে।
সমবায় সমিতি নিবন্ধিত হয় সমবায় অধিদপ্তরে, সমবায় সমিতি আইন ২০০১ অনুযায়ী। সমিতি ব্যাংক নয়: সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত নিয়ে ব্যাংকিং করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স লাগে, যা সমিতির নেই, আর সমিতিতে রাখা টাকা আমানত সুরক্ষার আওতায় পড়ে না। ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা আলাদা, তাদের লাইসেন্স দেয় মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময় জনসাধারণকে এমএলএম ধরনের স্কিমে লেনদেন না করতে সতর্ক করেছে, এর মধ্যে ২০২৩ আর ২০২৫ সালের বিজ্ঞপ্তিও আছে।
অতীতে কী ঘটেছে
গত দুই দশকে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটা বড় এমএলএম, “দ্বিগুণ লাভ” স্কিম আর আমানত নেওয়া সমিতি ভেঙে পড়েছে। প্রথম আলোর ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, এক এমএলএম গোষ্ঠীরই গ্রাহক ছিল প্রায় ৪৫ লাখ। একই প্রতিবেদনে সমবায় অধিদপ্তরের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী ২০০৮–২০১৭ সময়ে ২৬৬টা সমিতি গ্রাহকদের প্রায় ৪,১০০ কোটি টাকা ফেরত দেয়নি।
ধরনটা বারবার একই: শুরুতে নিয়মিত মুনাফা দিয়ে আস্থা তৈরি, পরিচিতজনদের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ানো, তারপর হঠাৎ অফিস বন্ধ। ২০২৫ সালেও এক উপজেলার কয়েকটি সমিতির বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্ত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তরা বছরের পর বছরেও টাকা ফেরত পাননি।
সতর্ক হওয়ার লক্ষণ
- নতুন সদস্য আনলেই আয়
- পণ্য বিক্রির চেয়ে মানুষ আনার ওপর বেশি জোর।
- যোগ দিতে বড় অঙ্কের টাকা
- যোগদান ফি, “প্যাকেজ” কেনা বা বাধ্যতামূলক মাল কেনা।
- নিশ্চিত ও অস্বাভাবিক বেশি মুনাফা
- ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রের চেয়ে অনেক বেশি “নিশ্চিত” মাসিক মুনাফা।
- পণ্যের দাম অস্বাভাবিক
- বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দামের পণ্য, বা পণ্য প্রায় নেই।
- সমিতি কিন্তু সবার কাছ থেকে আমানত
- “সদস্য” হতে শুধু একটা ফর্ম আর টাকা লাগে; আসলে সাধারণ আমানত নেওয়া।
- তাড়া আর গোপনীয়তা
- “এখনই না নিলে সুযোগ শেষ”, লিখিত কাগজ দিতে অনীহা, প্রশ্ন করলে বিরক্তি।
কত লাভ আশা করা যায়
এখানে “বছরে কত শতাংশ” বলা যায় না। শুরুতে যারা যোগ দেন, তাদের কেউ কেউ প্রতিশ্রুত মুনাফা পান, কারণ সেটা আসে পরে আসা মানুষের টাকা থেকে। স্কিম ভেঙে গেলে বাকিরা মূল টাকাও হারান।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশনের (এফটিসি) ভোক্তা নির্দেশিকা অনুযায়ী, বৈধ এমএলএমেও যোগ দেওয়া বেশিরভাগ মানুষ খুব কম বা কিছুই আয় করেন না, আর কেউ কেউ লোকসান করেন। পিরামিড বা আমানত নেওয়া অবৈধ সমিতিতে মূল টাকাই ঝুঁকিতে।
যে কারণে মানুষ বেছে নেয়
- লাইসেন্সপ্রাপ্ত, পণ্যভিত্তিক সরাসরি বিক্রয়ে কেউ কেউ কমিশন আয় করেন, তবে সেটা কাজের আয়, ইনভেস্টমেন্টের রিটার্ন নয়।
- সত্যিকারের সমবায় সমিতি সদস্যদের মধ্যে সঞ্চয় আর ঋণের সুযোগ দিতে পারে।
যা ভেবে দেখার
- পিরামিড কাঠামো গাণিতিকভাবেই একসময় ভেঙে পড়ে; পরে যোগ দেওয়া বেশিরভাগ মানুষ লোকসানে পড়েন।
- ব্যাংক আমানতের মতো কোনো সুরক্ষা নেই; টাকা ফেরত পাওয়া খুব কঠিন।
- লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম আর জনসাধারণের আমানত নেওয়া আইনত নিষিদ্ধ।
- আত্মীয়-বন্ধুদের যুক্ত করলে টাকার সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট হয়।
- কখন ভাঙবে, আগে বোঝা যায় না; “আমি আগে বেরিয়ে যাব” পরিকল্পনা প্রায়ই কাজ করে না।
কর
বৈধ সরাসরি বিক্রয় থেকে কমিশন আয় হলে সেটা আপনার মোট আয়ের অংশ, আর আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী করযোগ্য হতে পারে।
অবৈধ স্কিমে হারানো টাকা কর হিসাবে লোকসান হিসেবে সমন্বয়ের সুযোগ সাধারণত নেই। তাই প্রতারণার শিকার হলে আইনি পথেই অভিযোগ করতে হয়।
করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কীভাবে শুরু করবেন
- কেউ এমএলএম বা সমিতিতে যোগ দিতে বললে আগে প্রতিষ্ঠানের নাম লিখে নিন, তাড়াহুড়ো করবেন না।
- এমএলএম হলে আরজেএসসি থেকে পাওয়া হালনাগাদ লাইসেন্স আছে কি না, যাচাই করুন।
- সমিতি হলে সমবায় অধিদপ্তরে নিবন্ধন যাচাই করুন, আর মনে রাখুন নিবন্ধন থাকলেও সাধারণ মানুষের আমানত নেওয়ার অনুমতি থাকে না।
- আয় কোথা থেকে আসে, পণ্য বিক্রি না নতুন সদস্য, লিখিতভাবে জানতে চান।
- প্রতারণার শিকার হলে থানায় বা আদালতে অভিযোগ করুন, আর কাগজপত্র, রসিদ, মেসেজ সব সংরক্ষণ করুন।
শুরুর আগে যাচাই করুন
- আয়ের বড় অংশ কি নতুন মানুষ আনার ওপর নির্ভর করে?
- মুনাফা কি ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রের চেয়ে অনেক বেশি আর “নিশ্চিত”?
- প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা নিবন্ধন নিজে যাচাই করেছি, শুধু তাদের দেখানো কাগজ নয়?
- টাকা ফেরত চাইলে কীভাবে, কত দিনে পাব, তা লিখিত আছে?
- এই টাকা পুরো হারালে কি চলতে পারব?