BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

ট্রেজারি বিল

এক বছরের কম সময়ের জন্য সরকারকে ধার দেওয়া। বিল কেনেন গায়ের দামের চেয়ে কমে, মেয়াদ শেষে পান পুরো গায়ের দাম; মাঝের পার্থক্যটাই আপনার লাভ।

ভিডিও আসছে
ট্রেজারি বিল: এক বছরের কম সময়ের জন্য সরকারকে ধার

ট্রেজারি বিল কী

ট্রেজারি বিল মানে অল্প সময়ের জন্য সরকারকে টাকা ধার দেওয়া, কয়েক মাস থেকে এক বছরের কম। এখানে আপনি ঋণদাতা, সরকার ঋণগ্রহীতা। মেয়াদ শেষে সরকার আপনাকে যত টাকা দিয়েছিলেন তার চেয়ে একটু বেশি ফেরত দেয়; বাড়তি অংশটুকুই আপনার আয়।

নাম শুনে জটিল মনে হলেও ধারণাটা বন্ধুকে কয়েক মাসের জন্য টাকা ধার দেওয়ার মতোই। পার্থক্য হলো, এখানে বন্ধুটা সরকার, আর কত বেশি ফেরত আসবে তা শুরুতেই ঠিক হয়ে থাকে।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক তানভীর ৯৭,০০০ টাকা দিয়ে এক বছর মেয়াদের এমন একটা বিল কিনল, যার গায়ের দাম ১ লাখ টাকা। বছর শেষে সরকার তাকে পুরো ১ লাখ টাকা দিল। মাঝের ৩,০০০ টাকাই তার আয়। (অঙ্কগুলো শুধু বোঝানোর জন্য; আসল দাম ঠিক হয় নিলামে।)

কীভাবে কাজ করে

ট্রেজারি বিল সরকারের স্বল্পমেয়াদি ঋণ। সরকারের হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত নিলামে বিল বিক্রি করে। সাধারণ মানুষের জন্য প্রধান মেয়াদ তিনটি: ৯১ দিন, ১৮২ দিন আর ৩৬৪ দিন। মূলত ব্যাংকের জন্য খুব ছোট মেয়াদের (যেমন ১৪ দিনের) বিলও আছে।

বিলে আলাদা করে সুদ (কুপন) আসে না। বিলটা বিক্রি হয় ডিসকাউন্টে, অর্থাৎ গায়ের দামের চেয়ে কম দামে। মেয়াদ শেষে সরকার পুরো গায়ের দাম ফেরত দেয়। কেনা দাম আর ফেরত পাওয়া টাকার পার্থক্যই আপনার আয়, আর সেটাকে বছরের হারে প্রকাশ করলে বলা হয় ইল্ড।

ইল্ড ঠিক হয় নিলামে। ব্যাংক ও অন্য অংশগ্রহণকারীরা দর দেয়, সরকার কত টাকা নেবে আর কোন হার পর্যন্ত মানবে তা ঠিক করে। ফলে প্রতি নিলামে হার কিছুটা বদলায়। একবার কিনে ফেললে আপনার হার মেয়াদ পর্যন্ত আটকে থাকে।

উদাহরণ (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)

৳ ১,০০,০০০ গায়ের দামের একটা ৩৬৪ দিনের বিল বছরে ১০% ইল্ডে কিনলে আজ দিতে হয় মোটামুটি ৳ ৯১,০০০। এক বছর পর পান ৳ ১,০০,০০০, অর্থাৎ আয় প্রায় ৳ ৯,০০০। এর ওপর উৎসে কর কাটা হয়। হারটা উদাহরণ মাত্র; আসল ইল্ড নিলামভেদে বদলায়।

তিন মেয়াদের বিল

৯১ দিনের বিল
প্রায় তিন মাস। সবচেয়ে ছোট মেয়াদ, টাকা তাড়াতাড়ি ফেরত আসে।
১৮২ দিনের বিল
প্রায় ছয় মাস।
৩৬৪ দিনের বিল
প্রায় এক বছর। এর চেয়ে লম্বা মেয়াদে সরকারকে ধার দিতে চাইলে ট্রেজারি বন্ড।

কেনার পথ

নিলামে সরাসরি দর দেয় মূলত ব্যাংক, বিশেষ করে প্রাইমারি ডিলার ব্যাংক। সাধারণ মানুষ সাধারণত কোনো ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন করেন; ব্যাংক আপনার হয়ে নিলামে দর দেয় বা নিজের কেনা বিল থেকে বিক্রি করে। অনেক ব্যাংকে সরকারি সিকিউরিটিজ রাখার জন্য একটা আলাদা হিসাব (বিপিআইডি) খুলতে হয়।

ন্যূনতম অঙ্ক আর চার্জ ব্যাংকভেদে আলাদা; অনেক ব্যাংক ৳ ১ লাখ ও তার গুণিতকে বিক্রি করে। ট্রেজারি বন্ডের মতো বিল সাধারণত স্টক এক্সচেঞ্জে কেনাবেচা হয় না। মেয়াদের আগে টাকা লাগলে ব্যাংকের মাধ্যমে সেকেন্ডারি বাজারে বিক্রির চেষ্টা করতে হয়, যা সবসময় সহজ নয়।

ট্রেজারি বিলের হার কেন গুরুত্বপূর্ণ

ট্রেজারি বিলের ইল্ডকে দেশের “ঝুঁকিমুক্ত” স্বল্পমেয়াদি সুদের হারের মাপকাঠি ধরা হয়। ব্যাংকের আমানত ও ঋণের হার অনেকটা এর সঙ্গে ওঠানামা করে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদের জন্য যে রেফারেন্স রেট চালু করেছিল (স্মার্ট), সেটাও ট্রেজারি বিলের ইল্ড থেকে হিসাব করা হতো।

কত লাভ আশা করা যায়

ট্রেজারি বিলের ইল্ড অর্থনীতির অবস্থার সঙ্গে অনেক বদলায়। ২০২১ সালে ব্যাংকে প্রচুর অলস টাকা থাকায় ৯১ দিনের বিলের ইল্ড ১%-এরও নিচে নেমেছিল। মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সুদের হার বাড়ানোর পর ২০২৩-এর শেষে ইল্ড ১১% ছাড়ায়, আর ২০২৫-এর মাঝামাঝি তিন মেয়াদেই প্রায় ১২%-এ পৌঁছায়। ২০২৫-এর শেষ থেকে ২০২৬-এর শুরুতে তা আবার ১০%-এর আশপাশে নামে।

তাই অতীতের হার দেখে ভবিষ্যতের হার ধরে নেওয়া যায় না। কেনার আগে সর্বশেষ নিলামের ফল দেখে নিন; বাংলাদেশ ব্যাংক আর সংবাদপত্র প্রতি নিলামের পর তা প্রকাশ করে।

আসল লাভ বুঝতে কর আর মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে হিসাব করুন। ২০২১-এর মতো সময়ে বিলের ইল্ড মূল্যস্ফীতির অনেক নিচে ছিল, অর্থাৎ প্রকৃত লাভ ঋণাত্মক।

সূত্র: নিলামের ফল, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (এপ্রিল ২০২১, জুন ২০২৫, নভেম্বর ২০২৫), দ্য ডেইলি স্টার (ডিসেম্বর ২০২৩), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (ফেব্রুয়ারি ২০২৬); মূল তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের

যে কারণে মানুষ বেছে নেয়

  • টাকা ফেরতের দায় সরকারের।
  • মেয়াদ ছোট, তিন মাস থেকে এক বছর।
  • কেনার দিনেই জানা যায় মেয়াদ শেষে কত পাবেন।
  • সাধারণত এতে আবগারি শুল্ক কাটা হয় না।

যা ভেবে দেখার

  • প্রতি নিলামে হার বদলায়; মেয়াদ শেষে আবার কিনলে হার কম-বেশি হতে পারে।
  • সাধারণ মানুষের জন্য কেনার প্রক্রিয়া ব্যাংকের আমানতের চেয়ে জটিল।
  • মেয়াদের আগে বিক্রি করা সহজ নয়।
  • মূল্যস্ফীতি বেশি হলে প্রকৃত লাভ কম বা ঋণাত্মক হতে পারে।

কর

বিল থেকে পাওয়া আয়ের (ডিসকাউন্টের) ওপর উৎসে কর কাটা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যক্তির জন্য এই হার সাধারণত ১০% ছিল; প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশি। আয়কর আইন ২০২৩ আর প্রতি বছরের অর্থ আইন বা অধ্যাদেশে হার বদলাতে পারে।

এই আয় আপনার মোট আয়ের অংশ। রিটার্ন জমা দিলে কেটে রাখা কর আপনার মোট করের সঙ্গে সমন্বয় হয়।

করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

কীভাবে শুরু করবেন

  1. আপনার ব্যাংক সরকারি সিকিউরিটিজ বিক্রি করে কি না জেনে নিন; সাধারণত প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকগুলো করে।
  2. সরকারি সিকিউরিটিজের হিসাব (বিপিআইডি) খুলুন। জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, ব্যাংক হিসাব আর টিআইএন থাকলে সেটি লাগবে।
  3. কোন মেয়াদ চান আর কত টাকা, তা ঠিক করে ক্রয়ের আবেদন জমা দিন।
  4. ব্যাংকের চার্জ আর কোন নিলামে বা কোন হারে কেনা হলো, লিখিতভাবে জেনে নিন।
  5. মেয়াদ শেষে টাকা কোন হিসাবে আসবে, নিশ্চিত হয়ে নিন।

শুরুর আগে যাচাই করুন

  • মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কি এই টাকা লাগতে পারে?
  • সর্বশেষ নিলামের ইল্ড দেখেছি?
  • ব্যাংকের চার্জ বাদ দিলে আমার আসল আয় কত?
  • একই মেয়াদের এফডিআর বা অন্য বিকল্পের সঙ্গে কর-পরবর্তী আয় তুলনা করেছি?
  • টিআইএন বা রিটার্নের প্রমাণ দিয়েছি, যাতে কর ঠিক হারে কাটে?

কাছাকাছি আর যা আছে

সূত্র
মেয়াদ, ৳ ১ লাখের গুণিতক, উৎসে কর ও আবগারি শুল্ক না থাকা: একটি প্রাইমারি ডিলার ব্যাংকের সরকারি সিকিউরিটিজ তথ্যপাতা (অক্টোবর ২০২৬ দেখা)।
ইল্ড: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৬ এপ্রিল ২০২১, ২ জুন ২০২৫ ও ৩ নভেম্বর ২০২৫; দ্য ডেইলি স্টার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৩; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
স্মার্ট রেফারেন্স রেট: দ্য ডেইলি স্টার, ডিসেম্বর ২০২৩।
উৎসে কর: আয়কর আইন ২০২৩ ও সংশ্লিষ্ট অর্থ আইন।
এই পাতার সংখ্যাগুলো একটা সময়ের পরিসর, নির্দিষ্ট দিনের হার নয়। আজকের হার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন। এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়।