BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

সরকারি সুকুক

সরকারের কোনো প্রকল্পের সম্পদের মালিকানার অংশ কেনা, আর সেই সম্পদ সরকারকে ভাড়া দিয়ে নিয়মিত ভাড়া পাওয়া। সুদ নয়, ভাড়া; তাই শরিয়াহসম্মত।

ভিডিও আসছে
সরকারি সুকুক: শরিয়াহভিত্তিক সরকারি ইনভেস্টমেন্ট

সুকুক কী

সুকুক হলো সুদ ছাড়া সরকারের কাছে টাকা খাটানোর একটা শরিয়াহসম্মত উপায়। সাধারণ বন্ডে আপনি সরকারকে ধার দেন আর সুদ পান। সুকুকে আপনার টাকায় কেনা হয় কোনো সরকারি প্রকল্পের সম্পদের একটা অংশ, আর আপনি সেই অংশের মালিক হন।

সরকার সেই সম্পদ ব্যবহার করে আর তার জন্য ভাড়া দেয়, যা মালিকদের মধ্যে ভাগ হয়। মেয়াদ শেষে আপনার মূল টাকা ফেরত আসে। আয়টা সুদ নয়, ভাড়া; এটাই সাধারণ বন্ডের সঙ্গে মূল পার্থক্য।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক আরিফ সুদ এড়িয়ে চলেন, কিন্তু সঞ্চয় অলস ফেলে রাখতে চান না। তিনি একটা গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ১ লাখ টাকার সুকুক কিনলেন। ধরা যাক বছরে ৯% ভাড়া; তাহলে বছরে তিনি পান ৯,০০০ টাকা, ছয় মাস পরপর দুই ভাগে। মেয়াদ শেষে তার ১ লাখ টাকা ফেরত আসে।

কীভাবে কাজ করে

ইসলামি শরিয়াহতে সুদ নিষিদ্ধ, তাই সরকার সাধারণ বন্ডের মতো সুদে ধার না নিয়ে সুকুক ইস্যু করে। বাংলাদেশে এর নাম বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথমটি ইস্যু হয়; প্রতিটি সুকুক কোনো নির্দিষ্ট সরকারি প্রকল্পের (যেমন পানি সরবরাহ, গ্রামীণ সড়ক বা সেতু) সঙ্গে যুক্ত।

বেশিরভাগ সরকারি সুকুক ইজারা (ভাড়া) চুক্তিভিত্তিক। কাঠামোটা মোটামুটি এ রকম: বাংলাদেশ ব্যাংক একটা বিশেষ প্রতিষ্ঠান (এসপিভি) হিসেবে সুকুক বিক্রি করে, বিনিয়োগকারীরা প্রকল্পের সম্পদের আনুপাতিক মালিক হন, সেই সম্পদ সরকার ভাড়া নেয়, আর সরকারের দেওয়া ভাড়া বিনিয়োগকারীদের কাছে যায়। মেয়াদ শেষে সরকার সম্পদটা কিনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, ফলে আপনার মূল টাকা ফেরত আসে।

প্রকল্প তৈরি হওয়ার আগে যে ভাড়া দেওয়া হয়, তাকে অগ্রিম ভাড়া ধরা হয়; তাই কিছু সুকুকে ইজারার সঙ্গে ইস্তিসনা (নির্মাণ চুক্তি) মিলিয়ে কাঠামো বানানো হয়। ভাড়ার হার নিলামের আগেই ঘোষণা করা হয় এবং সাধারণত ছয় মাস পরপর দেওয়া হয়। মেয়াদ সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছর; ২০২৬ সালে প্রথমবার এক বছরের কম মেয়াদের সুকুকও এসেছে।

উদাহরণ (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)

৳ ১,০০,০০০ সুকুকে বছরে ১০% ভাড়ার হার হলে প্রতি ছয় মাসে ভাড়া আসে ৳ ৫,০০০। এর ওপর উৎসে কর কাটা হয়। মেয়াদ শেষে সরকার সম্পদ কিনে নিলে ফেরত পান ৳ ১,০০,০০০। হারটা উদাহরণ মাত্র; প্রতিটি সুকুকের হার আলাদা।

সাধারণ মানুষ কীভাবে কিনতে পারেন

নিলামে সরাসরি দর দিতে পারে শুধু সেই ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি, যাদের বাংলাদেশ ব্যাংকে হিসাব আছে। দেশে ও বিদেশে থাকা বাংলাদেশি ব্যক্তিরা দর দেন এমন কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। প্রথমবার কিনতে হলে নিলামের আগেই ব্যাংকে গিয়ে একটা সুকুক ইনভেস্টর আইডি খুলতে হয়।

সাম্প্রতিক সুকুকগুলোতে ন্যূনতম অঙ্ক ছিল ৳ ১০,০০০, তার গুণিতকে; অর্থাৎ ট্রেজারি বন্ডের চেয়ে অনেক কম টাকায় শুরু করা যায়। তবে প্রতিটি সুকুকের একটা অংশ ইসলামি ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের জন্য সংরক্ষিত থাকে; ব্যক্তি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ইত্যাদির জন্য রাখা অংশ ইস্যুভেদে আলাদা হয়েছে (কখনো ২%, কখনো ২০%)। চাহিদা বেশি হলে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ হয়, ফলে যত চেয়েছেন তার চেয়ে কম পেতে পারেন।

মেয়াদের আগে বেচা যায়?

সরকারি সুকুক সাধারণত প্রকল্পের অন্তত অর্ধেক সম্পদ তৈরি ও হস্তান্তর হওয়ার পরেই দর-কষাকষির দামে কেনাবেচা করা যায়; তার আগে হস্তান্তর হয় শুধু গায়ের দামে। কখন থেকে কেনাবেচা চালু হবে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়। বাস্তবে সাধারণ মানুষের জন্য কেনাবেচার বাজার খুব ছোট, তাই মেয়াদ পর্যন্ত রেখে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে কেনা ভালো।

মেয়াদ বাড়ানোও হতে পারে। ২০২৫ সালে প্রথম সুকুকের মেয়াদ নতুন ভাড়ার হারে আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়; যাঁরা থাকতে চাননি, তাঁরা মূল মেয়াদের দিনে টাকা তুলে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।

কত লাভ আশা করা যায়

প্রথম দিকের সুকুকগুলোতে (২০২০–২০২২) ভাড়া বা মুনাফার হার ছিল বছরে ৫%-এর কাছাকাছি, তখনকার কম সুদের হারের সঙ্গে মিলিয়ে। ২০২৪–২০২৬ সালে বাজারের হার বাড়ার পর নতুন সুকুকের হার বছরে প্রায় ৯–১০.৫% হয়েছে।

ট্রেজারি বন্ডের মতো দর-কষাকষির নিলামে নয়, সুকুকের ভাড়ার হার নিলামের আগেই ঘোষণা করা হয়। প্রথম সুকুকের হার ঠিক হয়েছিল একটা ইসলামি বন্ডের হারের সঙ্গে নির্দিষ্ট মার্জিন যোগ করে। ২০২৫ সালে কিছু সুকুকের হার একই সময়ের ট্রেজারি বন্ডের ইল্ডের চেয়ে কিছুটা কম ছিল, তাই সুকুক মানেই বেশি আয়, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

আসল লাভ বুঝতে কর আর মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে হিসাব করুন।

সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের সুকুক নোটিশ ও তার ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন, দ্য ডেইলি স্টার (ডিসেম্বর ২০২০), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (এপ্রিল ২০২২, নভেম্বর ২০২৫, জুন ২০২৬), ব্রোকারেজ ও ব্যাংকের সুকুক সারসংক্ষেপ (২০২৪–২০২৫)

যে কারণে মানুষ বেছে নেয়

  • শরিয়াহসম্মত; সুদের বদলে ভাড়া।
  • ভাড়া দেওয়া ও সম্পদ কিনে নেওয়ার দায় সরকারের।
  • ন্যূনতম অঙ্ক কম, সাম্প্রতিক ইস্যুগুলোতে ৳ ১০,০০০।
  • ছয় মাস পরপর নিয়মিত ভাড়া।

যা ভেবে দেখার

  • ইস্যু অনিয়মিত; চাইলেই সবসময় কেনা যায় না।
  • ব্যক্তির কোটা ছোট হতে পারে, আর চাহিদা বেশি হলে বরাদ্দ কমে যায়।
  • মেয়াদের আগে বেচা কঠিন।
  • মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে, নতুন শর্তে।

কর

ভাড়ার ওপর সরকার-নির্ধারিত হারে উৎসে কর কাটা হয়, আয়কর আইন ২০২৩ ও সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী। কোন হারে কাটা হবে, তা প্রতিটি সুকুকের নোটিশ আর সেই বছরের অর্থ আইনে দেখে নিন; হার বদলাতে পারে।

এই ভাড়া আপনার মোট আয়ের অংশ। রিটার্ন জমা দিলে কেটে রাখা কর আপনার মোট করের সঙ্গে সমন্বয় হয়।

করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

কীভাবে শুরু করবেন

  1. বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বা সংবাদপত্রে নতুন সুকুকের ঘোষণার খোঁজ রাখুন।
  2. আপনার ব্যাংক গ্রাহকের হয়ে সুকুকের নিলামে দর দেয় কি না, জেনে নিন।
  3. নিলামের আগেই ব্যাংকের মাধ্যমে সুকুক ইনভেস্টর আইডি খুলুন; জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব আর টিআইএন থাকলে সেটি লাগবে।
  4. কত টাকার জন্য আবেদন করবেন ঠিক করুন, আর হিসাবে টাকা রাখুন।
  5. বরাদ্দ, ভাড়ার তারিখ আর মেয়াদ লিখিতভাবে জেনে নিন।

শুরুর আগে যাচাই করুন

  • মেয়াদ পর্যন্ত, বা মেয়াদ বাড়লে আরও বেশি দিন, টাকাটা রেখে দিতে পারব?
  • এই সুকুকের প্রকল্প, মেয়াদ আর ভাড়ার হার নোটিশে পড়েছি?
  • চাহিদা বেশি হলে কম বরাদ্দ পেলে বাকি টাকা কোথায় রাখব, ভেবেছি?
  • ব্যাংকের কোনো চার্জ আছে কি না, জেনেছি?
  • কর-পরবর্তী আয় অন্য বিকল্পের সঙ্গে তুলনা করেছি?

কাছাকাছি আর যা আছে

সূত্র
প্রথম সুকুক, হার ও অংশগ্রহণকারী: দ্য ডেইলি স্টার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২০।
ইজারা কাঠামো, ন্যূনতম অঙ্ক, ব্যক্তির কোটা, কেনাবেচার শর্ত ও কর: বাংলাদেশ ব্যাংকের সুকুক নোটিশের ভিত্তিতে ব্রোকারেজ ও ব্যাংকের সারসংক্ষেপ, ২০২৪–২০২৫।
ইস্তিসনা সুকুক ও ব্যক্তির ২% কোটা: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, এপ্রিল ২০২২।
প্রথম সুকুকের মেয়াদ বৃদ্ধি: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, নভেম্বর ২০২৫।
২০২৬ সালের সুকুক, সুকুক ইনভেস্টর আইডি ও স্বল্পমেয়াদি সুকুক: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও বণিক বার্তা, জুন ২০২৬।
এই পাতার সংখ্যাগুলো একটা সময়ের পরিসর, নির্দিষ্ট দিনের হার নয়। আজকের হার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন। এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়।