ডিপিএস কী
ডিপিএস মানে ডিপোজিট পেনশন স্কিম, সহজ কথায় মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প। একবারে বড় অঙ্ক নয়, আপনি কয়েক বছর ধরে প্রতি মাসে একটা ছোট নির্দিষ্ট অঙ্ক ব্যাংকে জমা দেন। মেয়াদ শেষে জমানো সব টাকা আর তার ওপর সুদ একসঙ্গে ফেরত পান।
এটা অনেকটা মাটির ব্যাংকে টাকা ফেলার মতো, তবে টাকাটা থাকে ব্যাংকের কাছে আর তার ওপর সুদ আসে। প্রতি মাসে দেওয়ার বাধ্যবাধকতাই অনেকের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে দেয়।
ধরা যাক সুমাইয়া চান, পাঁচ বছর পর মেয়ের স্কুলে ভর্তির সময় হাতে কিছু টাকা থাকুক। এখন তাঁর কাছে বড় অঙ্ক নেই, তাই তিনি মাসে ৳ ১,০০০-এর একটা ডিপিএস খুললেন। পাঁচ বছরে তিনি নিজে দেবেন ৳ ৬০,০০০; মেয়াদ শেষে তার সঙ্গে সুদ যোগ হয়ে ফেরত আসবে।
কীভাবে কাজ করে
আপনি মাসিক কিস্তির অঙ্ক (যেমন ৫০০, ১,০০০ বা ৫,০০০ টাকা) আর মেয়াদ (সাধারণত ৩ থেকে ১০ বছর, কোথাও আরও বেশি) বেছে নেন। প্রতি মাসের একটা নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে কিস্তি জমা দিতে হয়; অনেকে সঞ্চয়ী হিসাব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখেন।
খোলার দিন সুদের হার ঠিক হয়। প্রতিটি কিস্তি জমা হওয়ার পর থেকে সুদ পায়, আর সুদের ওপরও সুদ যোগ হয় (চক্রবৃদ্ধি)। ফলে প্রথম দিকের কিস্তিগুলো সবচেয়ে বেশি সময় ধরে বাড়ে, আর শেষ দিকে মোট অঙ্ক দ্রুত বাড়তে দেখা যায়।
ব্যাংক সাধারণত খোলার সময় একটা তালিকা দেয়: এত টাকা মাসিক, এত বছর, মেয়াদ শেষে আনুমানিক এত টাকা। এই অঙ্ক কর কাটার আগের না পরের, আর সব কিস্তি সময়মতো দিলে তবেই মিলবে কি না, তা খেয়াল করুন।
মাসে ৳ ২,০০০ করে ৫ বছর জমালে আপনি দেন মোট ৳ ১,২০,০০০। বছরে ৮% হারে মাসিক চক্রবৃদ্ধিতে মেয়াদ শেষে কর কাটার আগে হয় প্রায় ৳ ১,৪৭,৯০০, অর্থাৎ সুদ প্রায় ৳ ২৭,৯০০। ১০% উৎসে কর কাটলে হাতে আসে প্রায় ৳ ১,৪৫,১০০। হার ৬% হলে একই হিসাবে কর কাটার আগে হতো প্রায় ৳ ১,৪০,২০০। হারগুলো উদাহরণ মাত্র।
কিস্তি বাদ পড়লে কী হয়
নিয়ম ব্যাংকভেদে আলাদা, তবে সাধারণ চিত্রটা এমন: দেরিতে কিস্তি দিলে বিলম্ব ফি কাটা হতে পারে বা মেয়াদপূর্তির অঙ্ক কমে যায়। পরপর কয়েকটা কিস্তি (অনেক ব্যাংকে দুই-তিনটা) বাকি পড়লে ডিপিএস সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
বন্ধ হয়ে গেলে জমা টাকা ফেরত পান, কিন্তু সুদ সাধারণত আগে ভাঙানোর নিয়মে, অর্থাৎ কম হারে হিসাব হয়।
মেয়াদের আগে ভাঙালে
অনেক ব্যাংকে প্রথম এক বছরের মধ্যে ভাঙালে কোনো সুদ মেলে না, শুধু জমা টাকা ফেরত আসে। এক বছরের পর ভাঙালে সাধারণত চুক্তির হারের চেয়ে কম হারে (কোথাও সঞ্চয়ী হিসাবের হারে, কোথাও চুক্তির হারের চেয়ে ১–২ শতাংশ পয়েন্ট কম) সুদ দেয়।
হঠাৎ টাকা লাগলে ডিপিএস না ভেঙে অনেক ব্যাংকে জমা টাকার একটা বড় অংশ (প্রায়ই ৮০–৯০%) ঋণ হিসেবে নেওয়া যায়। ঋণের সুদ ডিপিএসের হারের চেয়ে বেশি, তাই হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিন।
যেসব রূপে পাওয়া যায়
- লক্ষ্যভিত্তিক ডিপিএস
- শিক্ষা, বিয়ে, হজ বা অবসরের মতো লক্ষ্যের নামে বিক্রি হওয়া ডিপিএস; ভেতরের হিসাব একই।
- লাখপতি বা কোটিপতি ডিপিএস
- মেয়াদ শেষে একটা গোল অঙ্ক পেতে কত মাসিক কিস্তি লাগবে, সেভাবে সাজানো। বিস্তারিত বিশেষ সঞ্চয় স্কিমের পাতায়।
- ইসলামি মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প
- মুদারাবা ভিত্তিতে চলে; মুনাফার হার আগে আনুমানিক, পরে চূড়ান্ত হয়।
- মোবাইল অ্যাপে ডিপিএস
- মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপ থেকে অংশীদার ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানিতে ডিপিএস খোলা যায়; টাকা কোন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন।
আপনার টাকা কতটা সুরক্ষিত
ব্যাংকের ডিপিএস আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর আওতায় পড়ে: ব্যাংক বন্ধ হলে প্রতি আমানতকারী ওই ব্যাংকে তাঁর সব আমানত মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাওয়ার কথা। ফাইন্যান্স কোম্পানিতে খোলা ডিপিএস এই সুরক্ষার আওতায় আসার কথা ২০২৮ সালের জুলাই থেকে।
কত লাভ আশা করা যায়
ডিপিএসের হার সাধারণত একই ব্যাংকের এফডিআরের হারের কাছাকাছি চলে। ২০২০ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত সুদহারের সীমার সময়ে অনেক ব্যাংকে হার ছিল ৫–৭%-এর আশপাশে। ২০২৪-এ সুদহার বাজারভিত্তিক হওয়ার পর বহু ব্যাংকের ডিপিএস হার ৮–১১%-এ উঠেছে; ২০২৬ সালের শুরুতে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দেওয়া ডিপিএসে হার ছিল মোটামুটি ৮.৫–৯.৭৫%।
খোলার সময়ের হার পুরো মেয়াদে থাকে, তাই কোন সময়ে খুলছেন, তার প্রভাব অনেক বছর ধরে থাকে। আসল লাভ বুঝতে কর আর মূল্যস্ফীতি বাদ দিয়ে হিসাব করুন।
যে কারণে মানুষ বেছে নেয়
- অল্প অঙ্ক দিয়ে শুরু করা যায়; একবারে বড় টাকা লাগে না।
- প্রতি মাসে বাধ্যতামূলক জমা সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে।
- হার সাধারণত সঞ্চয়ী হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি, আর খোলার সময় ঠিক হয়ে যায়।
- না ভেঙে ডিপিএসের বিপরীতে ঋণ নেওয়া যায়।
যা ভেবে দেখার
- কিস্তি বাদ পড়লে জরিমানা বা হিসাব বন্ধ হতে পারে।
- আগে ভাঙালে সুদ অনেক কমে যায়, প্রথম বছরে প্রায়ই শূন্য।
- দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যস্ফীতি বেশি হলে প্রকৃত লাভ কম বা ঋণাত্মক হতে পারে।
- বিজ্ঞাপনের মেয়াদপূর্তির অঙ্ক কর কাটার আগের হতে পারে।
কর
সুদ বা মুনাফা দেওয়ার সময় ব্যাংক উৎসে কর কেটে রাখে। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার ছিল টিআইএন থাকলে ১০% আর না থাকলে ১৫%; প্রতি বছরের অর্থ আইনে হার বদলাতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিপিএসে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা কর রেয়াতের যোগ্য বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয়েছে। আপনি রিটার্ন জমা দিলে এতে মোট কর কিছুটা কমতে পারে; সীমা ও নিয়ম অর্থ আইনে বদলাতে পারে।
স্থিতি একটা সীমা ছাড়ালে বছরে একবার আবগারি শুল্কও কাটা হয়; সীমা অর্থ আইনে নির্ধারিত হয়।
করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কীভাবে শুরু করবেন
- ব্যাংক বেছে নিন; শুধু হার নয়, ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও দেখুন, কারণ টাকা অনেক বছর থাকবে।
- এমন মাসিক অঙ্ক বেছে নিন, যা খারাপ মাসেও দিতে পারবেন।
- কাগজপত্র: জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, নমিনির পরিচয়পত্র ও ছবি, আর টিআইএন থাকলে সেটি।
- সঞ্চয়ী হিসাব থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিস্তি কাটার ব্যবস্থা রাখুন।
- কিস্তি বাদ পড়া, আগে ভাঙানো আর ঋণের নিয়ম লিখিতভাবে জেনে নিন।
শুরুর আগে যাচাই করুন
- পুরো মেয়াদ ধরে প্রতি মাসে এই অঙ্ক দিতে পারব?
- মেয়াদপূর্তির অঙ্ক কর কাটার আগের না পরের?
- কয়টা কিস্তি বাদ পড়লে হিসাব বন্ধ হয়, জানি?
- প্রথম বছরে বা মাঝপথে ভাঙালে কত সুদ পাব?
- টাকা কোন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে: ব্যাংক না ফাইন্যান্স কোম্পানি?
- নমিনি ঠিকমতো দেওয়া আছে?