বিশেষ সঞ্চয় স্কিম কী
ব্যাংকের বিজ্ঞাপনে যে “টাকা দ্বিগুণ”, “মাসিক মুনাফা” বা “কোটিপতি স্কিম” দেখেন, সেগুলোই বিশেষ সঞ্চয় স্কিম। এগুলো ব্যাংকেরই সঞ্চয় পণ্য: আপনি ব্যাংকে টাকা রাখেন, ব্যাংক সুদসহ ফেরত দেয়। নতুনত্ব মূলত নামে আর উপস্থাপনে, কারণ প্রতিটি স্কিম একটা লক্ষ্য বা আকর্ষণীয় অঙ্ক সামনে রেখে সাজানো।
তাই স্কিম বাছার সময় নামটা নয়, ভেতরের শর্তগুলো দেখা জরুরি: কত টাকা, কত দিনের জন্য, আর শেষে কত।
ধরা যাক জাহিদ ব্যাংকে গিয়ে দুটো পোস্টার দেখলেন: একটায় লেখা “৭ বছরে টাকা দ্বিগুণ”, অন্যটায় “মাসে মাসে মুনাফা”। দুটোই শুনতে আকর্ষণীয়, কিন্তু একটায় টাকা শেষে একবারে বাড়ে, অন্যটায় প্রতি মাসে অল্প করে হাতে আসে। কোনটা বেশি দিচ্ছে, বুঝতে হলে দুটোকেই একই মাপে আনতে হবে: বছরে কত শতাংশ।
কীভাবে কাজ করে
বিশেষ সঞ্চয় স্কিম মানে নতুন কোনো জাদু নয়। একবারে টাকা রেখে মেয়াদ শেষে বেশি পাওয়া হলো এফডিআর; প্রতি মাসে জমিয়ে মেয়াদ শেষে থোক টাকা পাওয়া হলো ডিপিএস। ব্যাংক এগুলোকে একটা লক্ষ্য বা আকর্ষণীয় অঙ্কের চারপাশে সাজিয়ে আলাদা নাম দেয়।
বিজ্ঞাপনে সাধারণত হার নয়, ফলাফল দেখানো হয়: “৬ বছরে দ্বিগুণ”, “লাখে মাসে এত টাকা”, “মাসে এত দিলে ১০ বছরে ১০ লাখ”। একই ফলাফল ভিন্ন মেয়াদে ভিন্ন হার বোঝায়, তাই তুলনার আগে ফলাফলটাকে বার্ষিক হারে রূপান্তর করা দরকার।
খোলার দিন শর্ত ঠিক হয় এবং সাধারণত পুরো মেয়াদে থাকে। তবে আগে ভাঙালে, কিস্তি বাদ পড়লে বা কর বিবেচনায় নিলে আসল প্রাপ্তি বিজ্ঞাপনের অঙ্ক থেকে অনেক আলাদা হতে পারে।
চক্রবৃদ্ধিতে টাকা দ্বিগুণ হতে কত বছর লাগে, তা মোটামুটি ৭২ ÷ বার্ষিক হার। উল্টো করে, ৭২ ÷ বছর দিলে আনুমানিক হার পাওয়া যায়। “৬ বছরে দ্বিগুণ” মানে বছরে প্রায় ১২.২%; “৬ বছর ৯ মাসে দ্বিগুণ” মানে প্রায় ১০.৮%; “৮ বছরে দ্বিগুণ” মানে প্রায় ৯.১%। অঙ্কগুলো উদাহরণ মাত্র।
সাধারণ ধরনগুলো
- টাকা দ্বিগুণ বা তিন গুণ স্কিম
- একবারে টাকা রেখে নির্দিষ্ট বছরে দ্বিগুণ বা তিন গুণ ফেরত। আসলে চক্রবৃদ্ধি সুদের দীর্ঘমেয়াদি এফডিআর।
- মাসিক মুনাফা স্কিম
- মূল টাকা মেয়াদ পর্যন্ত আটকে থাকে, প্রতি মাসে সুদ হাতে আসে। অবসরপ্রাপ্ত বা নিয়মিত আয় চান এমন মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়।
- লাখপতি বা কোটিপতি স্কিম
- মেয়াদ শেষে ১ লাখ, ১০ লাখ বা ১ কোটি টাকা পেতে কত মাসিক কিস্তি লাগবে, সেভাবে সাজানো ডিপিএস।
- লক্ষ্যভিত্তিক স্কিম
- শিক্ষা, বিয়ে, হজ, বাড়ি বা অবসরের নামে স্কিম; কোথাও সঙ্গে ছোট বীমা সুবিধা থাকে।
বিজ্ঞাপন থেকে আসল হার বের করা
মাসিক মুনাফা স্কিমে হিসাব সহজ: প্রতি লাখে মাসে যত টাকা দেয়, তাকে ১২ দিয়ে গুণ করে ১,০০০ দিয়ে ভাগ করলে বার্ষিক হার (%) পাওয়া যায়। যেমন লাখে মাসে ৳ ৯০০ মানে বছরে ১০.৮%। দেখুন অঙ্কটা কর কাটার আগের না পরের।
লাখপতি-কোটিপতি স্কিমে মোট যত টাকা জমা দেবেন, আর মেয়াদ শেষে যত পাবেন, দুটো পাশাপাশি রাখুন। যেমন ১০ বছরে ১০ লাখ টাকা পেতে মাসিক প্রায় ৳ ৫,১৩০ লাগলে, আপনি দেন মোট প্রায় ৳ ৬,১৫,৬০০; এটা বছরে প্রায় ৯% হারে মাসিক চক্রবৃদ্ধির সমান, কর কাটার আগে।
একটা সাধারণ ভুল: “৬ বছরে দ্বিগুণ” শুনে অনেকে ভাবেন বছরে ১০০ ÷ ৬ = প্রায় ১৬.৭%। চক্রবৃদ্ধিতে আসল হার অনেক কম, প্রায় ১২.২%। একই মেয়াদ ও ঝুঁকির সাধারণ এফডিআরের হারের সঙ্গে তুলনা করলেই বোঝা যায় স্কিমটা আসলে বেশি দিচ্ছে কি না।
৳ ৫,০০,০০০ রেখে বছরে ১০% হারে মাসিক মুনাফা নিলে প্রতি মাসে কর কাটার আগে ৳ ৪,১৬৭, আর ১০% উৎসে কর কাটার পর প্রায় ৳ ৩,৭৫০ আসে। মেয়াদ শেষে মূল ৳ ৫,০০,০০০ ফেরত পান। মুনাফা খরচ হয়ে যায় বলে এখানে চক্রবৃদ্ধি হয় না। হারটা উদাহরণ মাত্র।
আপনার টাকা কতটা সুরক্ষিত
নাম যা-ই হোক, ব্যাংকের স্কিম ব্যাংকের আমানত। আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী ব্যাংক বন্ধ হলে প্রতি আমানতকারী ওই ব্যাংকে সব আমানত মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাওয়ার কথা। দ্বিগুণ বা কোটিপতি স্কিমে অঙ্ক প্রায়ই এর চেয়ে অনেক বড়, তাই বাকি টাকার নিরাপত্তা ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
কত লাভ আশা করা যায়
স্কিমের আসল হার সাধারণত একই সময়ের এফডিআর বা ডিপিএস হারের কাছাকাছি থাকে, দীর্ঘ মেয়াদে কিছুটা বেশি। ২০২০–২০২৩ সালে সুদহারের সীমার সময়ে এগুলো কম ছিল। ২০২৪-এ সুদহার বাজারভিত্তিক হওয়ার পর কিছু ব্যাংক প্রায় সাড়ে ৫ বছরে দ্বিগুণের (বছরে প্রায় ১৩.৪%) প্রস্তাব দিয়েছে; ২০২৫ সালের শেষে কিছু স্কিমে দ্বিগুণ হতে লাগছিল প্রায় ৬ বছর ৯ মাস (বছরে প্রায় ১০.৮%)।
কোনো স্কিম একই সময়ে অন্যদের চেয়ে অনেক দ্রুত দ্বিগুণের কথা বললে প্রশ্ন করুন কেন। আমানত টানতে দুর্বল প্রতিষ্ঠান প্রায়ই বেশি হার দেয়।
যে কারণে মানুষ বেছে নেয়
- লক্ষ্য আর অঙ্ক স্পষ্ট থাকায় পরিকল্পনা সহজ হয়।
- শর্ত খোলার সময় ঠিক হয়ে যায়।
- মাসিক মুনাফা স্কিম নিয়মিত আয়ের উৎস হতে পারে।
- অনেক স্কিমে না ভেঙে ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকে।
যা ভেবে দেখার
- আকর্ষণীয় নাম আসল হার আড়াল করতে পারে।
- মেয়াদ দীর্ঘ; আগে ভাঙালে লাভ অনেক কমে যায়।
- দীর্ঘ মেয়াদে মূল্যস্ফীতি “দ্বিগুণ” টাকার ক্রয়ক্ষমতা অনেক কমিয়ে দিতে পারে।
- বড় অঙ্ক এক ব্যাংকে থাকলে সুরক্ষার সীমার বাইরে চলে যায়।
কর
স্কিমের সুদ বা মুনাফা থেকে ব্যাংক উৎসে কর কেটে রাখে। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার ছিল টিআইএন থাকলে ১০% আর না থাকলে ১৫%; প্রতি বছরের অর্থ আইনে হার বদলাতে পারে।
“দ্বিগুণ” বা “১০ লাখ” অঙ্কটা অনেক সময় কর কাটার আগের, তাই হাতে আসে কিছুটা কম। মাসিক কিস্তির স্কিমে (ডিপিএস ধরনের) সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জমা কর রেয়াতের যোগ্য হয়েছে; নিয়ম বদলাতে পারে।
স্থিতি একটা সীমা ছাড়ালে বছরে একবার আবগারি শুল্কও কাটা হয়; সীমা অর্থ আইনে নির্ধারিত হয়।
করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কীভাবে শুরু করবেন
- আগে ঠিক করুন আপনার দরকার কোনটা: থোক টাকা বাড়ানো, মাসিক আয়, নাকি প্রতি মাসে জমানো।
- কয়েকটা ব্যাংকের একই ধরনের স্কিমের বিজ্ঞাপিত ফলাফল সংগ্রহ করে বার্ষিক হারে রূপান্তর করুন।
- অঙ্কটা কর কাটার আগের না পরের, লিখিতভাবে জেনে নিন।
- আগে ভাঙানো, কিস্তি বাদ পড়া আর ঋণের নিয়ম জেনে নিন।
- কাগজপত্র এফডিআর বা ডিপিএসের মতোই: জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, নমিনির তথ্য, আর টিআইএন থাকলে সেটি।
শুরুর আগে যাচাই করুন
- বিজ্ঞাপনের ফলাফলটা বছরে কত শতাংশ হারের সমান, হিসাব করেছি?
- একই মেয়াদের সাধারণ এফডিআর বা ডিপিএসের চেয়ে এটা কি সত্যিই বেশি দেয়?
- অঙ্কটা কর কাটার আগের না পরের?
- পুরো মেয়াদ টাকা রেখে বা কিস্তি দিয়ে যেতে পারব?
- এক ব্যাংকে আমার মোট আমানত কি সুরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে?
- নমিনি ঠিকমতো দেওয়া আছে?