ক্রিপ্টোকারেন্সি কী
ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো শুধু ইন্টারনেটে থাকা একধরনের ডিজিটাল টাকা বা টোকেন। টাকার নোটের পেছনে যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক থাকে, ক্রিপ্টোর পেছনে তেমন কোনো সরকার, ব্যাংক বা কোম্পানি থাকে না। এর মালিক হওয়া মানে একটা ডিজিটাল খাতায় আপনার একটা গোপন কোডের নামে কিছু টোকেন লেখা থাকা।
ক্রিপ্টো কিনলে কেউ আপনাকে সুদ বা মুনাফা দেয় না; দাম ঠিক হয় অন্যরা এটা কত দিয়ে কিনতে চায়, তার ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশে এতে লেনদেনের অনুমতি নেই।
ধরা যাক আরিফ বন্ধুদের মুখে শুনল, কেউ কেউ একটা নতুন কয়েন কিনে কয়েক সপ্তাহে টাকা দ্বিগুণ করেছে। সে টিউশনির জমানো ৳ ২০,০০০ দিয়ে অনলাইনে পরিচিত এক লোকের মাধ্যমে সেই কয়েন কিনল। প্রথম সপ্তাহে দাম বাড়ল, তারপর হঠাৎ অর্ধেকের নিচে নেমে গেল। আর লেনদেনটা যেহেতু অনুমোদিত কোনো পথে হয়নি, অভিযোগ করার মতো কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানও তার নেই। এটা একটা কাল্পনিক উদাহরণ।
কীভাবে কাজ করে
ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো কম্পিউটার নেটওয়ার্কে রাখা ডিজিটাল টোকেন। কার কাছে কত আছে, তার হিসাব থাকে “ব্লকচেইন” নামের একটা সর্বজনীন খাতায়, যা কোনো একক প্রতিষ্ঠান নয়, হাজার হাজার কম্পিউটার মিলে হালনাগাদ রাখে। বিটকয়েন সবচেয়ে পুরোনো আর পরিচিত; এর পরে হাজার হাজার অন্য টোকেন তৈরি হয়েছে।
ক্রিপ্টোর কোনো সুদ বা লভ্যাংশ নেই, আর কেউ মূল টাকা ফেরত দেওয়ার দায় নেয় না। দাম ঠিক হয় শুধু চাহিদা আর জোগানে: অন্যরা ভবিষ্যতে কত দিয়ে কিনতে রাজি, তার ওপর। তাই দাম খবর, গুজব আর মানুষের মনোভাবে খুব দ্রুত বদলায়।
বিদেশে ক্রিপ্টো সাধারণত কেনাবেচা হয় অনলাইন এক্সচেঞ্জে, আর রাখা হয় ডিজিটাল “ওয়ালেটে”। ওয়ালেটের গোপন চাবি (প্রাইভেট কি বা সিড ফ্রেজ) হারালে বা কেউ জেনে গেলে টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো উপায় সাধারণত থাকে না, কারণ অভিযোগ জানানোর কোনো ব্যাংক বা নিয়ন্ত্রক নেই।
বিটকয়েনের দাম ২০১৭ সালের শেষে প্রায় ২০,০০০ ডলারে উঠে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রায় ৩,২০০ ডলারে নামে, অর্থাৎ ৮০%-এর বেশি পতন। ২০২১ সালের নভেম্বরে প্রায় ৬৮,০০০ ডলার থেকে ২০২২ সালের মাঝামাঝি ২০,০০০ ডলারের নিচে নামে, ৭০%-এর বেশি পতন। কেউ সর্বোচ্চ দামে ৳ ১,০০,০০০-এর সমপরিমাণ কিনলে কয়েক মাসে সেটার মূল্য ৳ ৩০,০০০-এর নিচে নেমে যেত।
বাংলাদেশে আইনি অবস্থান
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ মুদ্রা নয়, আর এর কেনাবেচার জন্য কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত এক্সচেঞ্জ বা নিয়ন্ত্রক কাঠামো নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে বেশ কয়েকবার প্রকাশ্যে সতর্ক করেছে:
- সেপ্টেম্বর ২০১৪
- বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেন না করতে সতর্কবার্তা; বলা হয়, এতে বৈদেশিক মুদ্রা ও মানি লন্ডারিং আইন ভঙ্গ হতে পারে।
- ডিসেম্বর ২০১৭
- আবার সতর্কবার্তা: ভার্চুয়াল মুদ্রা কোনো কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত নয়, আর এতে লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ ভঙ্গ করতে পারে।
- সেপ্টেম্বর ২০২২
- সার্কুলারে সবাইকে ভার্চুয়াল সম্পদ ও মুদ্রায় লেনদেন থেকে বিরত থাকতে বলা হয়; ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আর মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে এতে সহায়তা করতে নিষেধ করা হয়। নির্দেশ অমান্য করে লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ২৩(১) অনুযায়ী দণ্ডনীয় বলে উল্লেখ করা হয়, যেখানে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয়ের বিধান আছে।
বৈদেশিক মুদ্রার নিয়ম কেন প্রাসঙ্গিক
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭-এর অধীনে নিয়ন্ত্রিত; শুধু অনুমোদিত কারণে (যেমন পড়াশোনা, চিকিৎসা, ভ্রমণ, আমদানি) পাঠানো যায়। ক্রিপ্টো কেনা অনুমোদিত কারণ নয়। তাই কার্ড বা অন্য কোনো পথে বিদেশি এক্সচেঞ্জে টাকা পাঠানো এই আইনের প্রশ্ন তোলে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালে রপ্তানিকারকদেরও ক্রিপ্টোতে রপ্তানি মূল্য না নিতে সতর্ক করেছে। ফ্রিল্যান্সার বা প্রবাসীদের আয়ও বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার নিয়ম।
নীতিনির্ধারণী মহলে ক্রিপ্টো নিয়ন্ত্রণের কাঠামো নিয়ে আলোচনা আছে, আর বাংলাদেশ ব্যাংক নিজের ডিজিটাল মুদ্রা (সিবিডিসি) নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করছে বলে প্রতিবেদন এসেছে। তবে এই পাতা হালনাগাদ করার সময় (অক্টোবর ২০২৬) ২০২২ সালের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কোনো ঘোষণা আমরা পাইনি। আইন বদলাতে পারে; সর্বশেষ অবস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেখুন।
ক্রিপ্টোর নামে প্রতারণা
- “নিশ্চিত” দৈনিক লাভ
- ক্রিপ্টো ট্রেডিং, মাইনিং বা “এআই বট” দিয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট লাভের প্রতিশ্রুতি। ক্রিপ্টোর দামই যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে নিশ্চিত লাভ সম্ভব নয়।
- ভুয়া এক্সচেঞ্জ বা ওয়ালেট
- আসলের মতো দেখতে ওয়েবসাইট বা অ্যাপ, যেখানে ব্যালান্স বাড়তে দেখা যায় কিন্তু তোলা যায় না।
- সিড ফ্রেজ বা পাসওয়ার্ড চাওয়া
- “সাপোর্ট” বা “ভেরিফিকেশন”-এর নামে গোপন চাবি চাওয়া; দিলে সব টাকা চলে যায়।
- নতুন টোকেনের প্রচার
- সোশ্যাল মিডিয়ায় “পরের বিটকয়েন” প্রচার; অনেক টোকেনের দাম প্রচারকারীরা বিক্রি করে দেওয়ার পর প্রায় শূন্যে নামে।
- এক্সচেঞ্জ নিজেই ভেঙে পড়া
- বিদেশের বড় বড় এক্সচেঞ্জও ভেঙে পড়েছে, যেমন ২০২২ সালে বিশ্বের অন্যতম বড় একটি এক্সচেঞ্জ; তখন গ্রাহকদের টাকা আটকে যায়।
কত লাভ আশা করা যায়
ক্রিপ্টোর কোনো “স্বাভাবিক” রিটার্ন নেই। কিছু সময়ে দাম কয়েক মাসে কয়েক গুণ বেড়েছে, আবার কয়েক মাসে ৭০–৮০% পড়েছে। কম পরিচিত অনেক টোকেন পুরোপুরি মূল্যহীন হয়ে গেছে।
বাংলাদেশে বাড়তি ঝুঁকি হলো আইনি: বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২ সালের সার্কুলার অনুযায়ী এখানে এতে লেনদেনের অনুমতি নেই, আর প্রতারণার শিকার হলে অভিযোগ জানানোর কোনো নিয়ন্ত্রিত পথ বা সুরক্ষা নেই।
যে কারণে মানুষ বেছে নেয়
- প্রযুক্তি হিসেবে ব্লকচেইন নিয়ে জানা কাজে লাগতে পারে, টাকা না খাটিয়েও শেখা যায়।
- বিশ্বের কিছু দেশে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় ক্রিপ্টো কেনাবেচা হয়; তবে বাংলাদেশে সেই কাঠামো নেই।
যা ভেবে দেখার
- দাম খুব বেশি ওঠানামা করে; অল্প সময়ে বড় লোকসান সম্ভব।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় লেনদেনের অনুমতি নেই; বৈদেশিক মুদ্রা আইনে শাস্তির ঝুঁকি আছে।
- কোনো আমানত সুরক্ষা বা বিনিয়োগকারী সুরক্ষা নেই; চাবি হারালে বা প্রতারিত হলে টাকা ফেরত পাওয়ার পথ নেই।
- ক্রিপ্টোর নামে প্রতারণা খুব বেশি; আসল আর ভুয়া আলাদা করা কঠিন।
- কোনো সুদ, লভ্যাংশ বা ভাড়া নেই; আয় শুধু দাম বাড়ার আশায়।
কর
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোর জন্য আলাদা কোনো কর বিধান নেই, কারণ এতে লেনদেনই অনুমোদিত নয়। তাই এ থেকে আয় বা লোকসান বৈধ ইনভেস্টমেন্টের মতো রিটার্নে দেখানো বা সমন্বয় করার স্বীকৃত পথ নেই।
বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য সেই দেশের আইন আর করের নিয়ম আলাদা হতে পারে; বাংলাদেশে টাকা আনার সময় বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের নিয়ম মানতে হয়।
করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কীভাবে শুরু করবেন
- বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ভার্চুয়াল মুদ্রা নিয়ে সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি পড়ুন।
- ব্লকচেইন আর ক্রিপ্টো বুঝতে চাইলে টাকা না খাটিয়ে বই, কোর্স বা নির্ভরযোগ্য লেখা থেকে শিখুন।
- ক্রিপ্টোতে “ইনভেস্ট” করার প্রস্তাব এলে, বিশেষ করে নিশ্চিত লাভের কথা থাকলে, সেটাকে প্রতারণার সম্ভাব্য লক্ষণ হিসেবে দেখুন।
- কখনো কাউকে ওয়ালেটের সিড ফ্রেজ, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি দেবেন না।
- প্রতারণার শিকার হলে স্ক্রিনশট আর লেনদেনের তথ্য রেখে থানায় বা পুলিশের সাইবার অপরাধ ইউনিটে অভিযোগ করুন।
শুরুর আগে যাচাই করুন
- বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ অবস্থান কী, নিজে পড়ে দেখেছি?
- কেউ কি নিশ্চিত বা নির্দিষ্ট হারে লাভের কথা বলছে?
- টাকা কোথায় যাচ্ছে: কোনো ব্যক্তির নম্বরে, নাকি বিদেশে?
- দাম ৭০–৮০% পড়লে আমার কী অবস্থা হবে?
- কেউ কি আমার সিড ফ্রেজ, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চাইছে?