BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

নিজের দক্ষতায় ইনভেস্ট

পড়াশোনা, প্রশিক্ষণ বা কোনো কাজ শেখায় টাকা আর সময় দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে বেশি আয় করা যায়। এখানে রিটার্ন আসে সুদ হিসেবে নয়, আপনার বাড়তি আয় হিসেবে।

ভিডিও আসছে
নিজের দক্ষতায় ইনভেস্ট: পড়াশোনা আর কোর্সের হিসাব

নিজের দক্ষতায় ইনভেস্ট মানে কী

দক্ষতায় ইনভেস্ট মানে নতুন কিছু শেখার জন্য টাকা আর সময় খরচ করা, যেমন কোনো কোর্স, ডিগ্রি, ভাষা বা হাতের কাজ শেখা। এখানে আপনি কোনো জিনিস কেনেন না; যা পান তা থাকে আপনার জ্ঞান আর দক্ষতায়, আর সেটা আপনার সঙ্গেই থাকে।

এর লাভ আসে পরে: ভালো চাকরি, বেশি বেতন বা নিজের কাজ বেশি দামে করার সুযোগ হিসেবে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান সেই লাভের কথা দেয় না; শেখাটা কতটা কাজে লাগাতে পারেন আর বাজারে তার চাহিদা কেমন, তার ওপরই সব নির্ভর করে।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক তানিয়া কলেজ শেষ করে ৳ ১৫,০০০ ফি দিয়ে একটা গ্রাফিক ডিজাইন কোর্সে ভর্তি হলেন, আর তিন মাস প্রতি সন্ধ্যায় ক্লাস আর অনুশীলন করলেন। কোর্সের পর তিনি ছোট দোকান আর অনলাইন পেজের জন্য লোগো ও পোস্টার বানিয়ে আয় শুরু করলেন। কাজ নিয়মিত পেলে খরচ কয়েক মাসেই উঠে আসতে পারে; না পেলে টাকা আর সময় খরচ হলো, যদিও শেখাটা থেকে যায়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

কীভাবে কাজ করে

অন্য ইনভেস্টমেন্টে আপনি টাকা দেন, বিনিময়ে সুদ, মুনাফা বা দাম বৃদ্ধি পান। দক্ষতায় ইনভেস্ট করলে টাকা আর সময় দেন, বিনিময়ে পান বেশি বেতনের চাকরি, পদোন্নতি, বেশি দামের কাজ বা নিজের ব্যবসা চালানোর সক্ষমতা।

খরচের দুটো ভাগ আছে। একটা চোখে পড়ে: কোর্স ফি, বই, যাতায়াত, যন্ত্রপাতি। আরেকটা চোখে পড়ে না: পড়ার সময়ে যে আয় করতে পারতেন কিন্তু করছেন না। পূর্ণকালীন পড়াশোনায় এই দ্বিতীয় খরচটাই প্রায়ই বড়।

রিটার্ন আসে অনেক বছর ধরে, অল্প অল্প করে, আর নিশ্চিত নয়। একই ডিগ্রি বা কোর্স করেও কারও আয় অনেক বাড়ে, কারও তেমন বাড়ে না। কী শিখছেন, কোথায় শিখছেন, আর চাকরির বাজারে সেটার চাহিদা কেমন, এগুলোই বড় পার্থক্য গড়ে।

উদাহরণ (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)

ধরুন ছয় মাসের একটা সন্ধ্যাকালীন কোর্সে ফি আর অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৳ ৩০,০০০ লাগে, চাকরি ছাড়তে হয় না। কোর্সের পর যদি মাসে ৳ ৩,০০০ বেশি আয় হয়, তাহলে ১০ মাসে খরচ উঠে আসে, এরপর যা আসে তা বাড়তি। আয় না বাড়লে ৳ ৩০,০০০ আর সময়টাই খরচ। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

দক্ষতায় ইনভেস্টের কয়েকটা ধরন

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা
স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা ডিপ্লোমা। খরচ আর সময় দুটোই বেশি; ফল নির্ভর করে বিষয় আর প্রতিষ্ঠানের ওপর।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ
ইলেকট্রিক্যাল, ওয়েল্ডিং, গাড়ি মেরামত, নার্সিং, রান্নার মতো হাতে-কলমে কাজ। দেশে আর বিদেশে দুই জায়গাতেই চাহিদা আছে।
পেশাগত সনদ
হিসাববিজ্ঞান, ফাইন্যান্স, আইটি বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে স্বীকৃত সনদ। অনেক সময় চাকরি করতে করতেই করা যায়।
স্বল্পমেয়াদি ও অনলাইন কোর্স
ভাষা, প্রোগ্রামিং, ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং ইত্যাদি। খরচ কম, তবে মান খুব আলাদা; সনদের চেয়ে আসলে কী শিখলেন সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণা কী বলে

বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ সাকারোপুলোস ও প্যাট্রিনোস বহু দেশের গবেষণা মিলিয়ে ২০১৮ সালে দেখিয়েছেন, গড়ে প্রতি বাড়তি এক বছর পড়াশোনায় একজন মানুষের আয় মোটামুটি ৯% বাড়ে। এটা গড়; দেশ, স্তর, লিঙ্গ আর বিষয়ভেদে অনেক কম-বেশি হয়।

বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২-এ উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ১২%, যেখানে সামগ্রিক হার ছিল প্রায় ৩.৫%। অর্থাৎ ডিগ্রি থাকলেই ভালো আয় নিশ্চিত নয়; বাজারে কোন দক্ষতার চাহিদা আছে, সেটা দেখা জরুরি।

কোর্স বেছে নেওয়ার সময়

যে কাজটা করতে চান, সেই কাজে এখন যারা আছেন তাদের জিজ্ঞেস করুন: কোন দক্ষতা আসলে লাগে, কোন সনদ নিয়োগকর্তারা গুরুত্ব দেন। চাকরির বিজ্ঞাপনে কী চাওয়া হচ্ছে, সেটাও একটা ভালো সূত্র।

প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি যাচাই করুন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি), কারিগরি শিক্ষায় বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (বিটিইবি), আর দক্ষতা প্রশিক্ষণে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) তালিকা দেখা যায়। “কোর্স শেষে নিশ্চিত চাকরি” বা “মাসে লাখ টাকা আয়” ধরনের প্রতিশ্রুতিতে সাবধান থাকুন।

কত লাভ আশা করা যায়

এই ৯% কোনো সুদের হার নয়। এর মানে হলো, অন্য সব একই থাকলে এক বছর বেশি পড়াশোনা করা মানুষ গড়ে প্রায় ৯% বেশি আয় করেন। আপনার নিজের ক্ষেত্রে এটা অনেক বেশি, অনেক কম, এমনকি শূন্যও হতে পারে।

বাংলাদেশের ওপর গবেষণাগুলোতেও দেখা যায়, শিক্ষার আয়-প্রভাব শহর ও গ্রাম, নারী ও পুরুষ, আর শিক্ষার স্তরভেদে বেশ আলাদা। আর ২০২২ সালে উচ্চশিক্ষিতদের প্রায় ১২% বেকার ছিলেন, যা মনে করিয়ে দেয় যে বিষয় আর দক্ষতার চাহিদাই আসল।

নিজের জন্য হিসাব করতে তিনটা প্রশ্ন করুন: মোট খরচ কত (হারানো আয়সহ), কোর্সের পর আয় কতটা বাড়তে পারে, আর কত বছরে খরচ উঠে আসবে।

সূত্র: সাকারোপুলোস ও প্যাট্রিনোস, “রিটার্নস টু ইনভেস্টমেন্ট ইন এডুকেশন”, এডুকেশন ইকোনমিকস, ২০১৮; বেকারত্ব: বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২

যে কারণে মানুষ বেছে নেয়

  • একবার শেখা দক্ষতা সারা জীবন কাজে লাগে; কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
  • ছোট খরচে শুরু করা যায়; অনেক কোর্স চাকরি করতে করতেই করা যায়।
  • আয় বাড়লে সেই বাড়তি আয় দিয়ে অন্য জায়গায়ও ইনভেস্ট করা যায়।
  • বাজার বা ব্যাংকের ওঠানামার সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়।

যা ভেবে দেখার

  • ফল নিশ্চিত নয়; ভুল বিষয় বা নিম্নমানের কোর্সে টাকা আর সময় দুটোই যেতে পারে।
  • পূর্ণকালীন পড়াশোনায় হারানো আয় বড় খরচ।
  • রিটার্ন আসতে কয়েক বছর লাগতে পারে।
  • বাজারের চাহিদা বদলায়; আজকের চাহিদার দক্ষতা কয়েক বছর পরে কম লাগতে পারে।

কর

দক্ষতায় খরচের ওপর কর নেই, আর এর আলাদা কোনো “রিটার্ন” কর হয় না। তবে বাড়তি যে আয় হয়, সেটা বেতন, ব্যবসা বা ফ্রিল্যান্সিং যে পথেই আসুক, আপনার মোট আয়ের অংশ এবং আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী করযোগ্য হতে পারে।

বিদেশ থেকে বৈধ পথে আসা কিছু আয়, যেমন নির্দিষ্ট ধরনের আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং আয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর-সুবিধা পেয়েছে। শর্ত আর মেয়াদ অর্থ আইনে বদলায়, তাই সর্বশেষ নিয়ম দেখুন।

করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।

কীভাবে শুরু করবেন

  1. কোন কাজ বা পেশার দিকে যেতে চান, তা ঠিক করুন; তারপর সেই কাজের জন্য কোন দক্ষতা লাগে খুঁজুন।
  2. ওই পেশার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলুন আর চাকরির বিজ্ঞাপন দেখুন।
  3. সম্ভব হলে প্রথমে কম খরচের বা বিনা খরচের কোর্স দিয়ে আগ্রহ আর সামর্থ্য যাচাই করুন।
  4. প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, শিক্ষক, আর আগের শিক্ষার্থীরা কোথায় কাজ করছেন তা যাচাই করুন।
  5. মোট খরচ (হারানো আয়সহ) আর সম্ভাব্য আয় বৃদ্ধির একটা সহজ হিসাব লিখে রাখুন।

শুরুর আগে যাচাই করুন

  • এই দক্ষতার চাহিদা কি সত্যিই আছে, নাকি শুধু বিজ্ঞাপনে শুনেছি?
  • প্রতিষ্ঠান কি স্বীকৃত, আর সনদের মূল্য নিয়োগকর্তারা দেন?
  • হারানো আয়সহ মোট খরচ হিসাব করেছি?
  • কোর্স শেষ না করতে পারলে কতটা টাকা ফেরত পাব?
  • “নিশ্চিত চাকরি” বা “নিশ্চিত আয়ের” প্রতিশ্রুতি কি লিখিত, আর বাস্তবসম্মত?
  • ঋণ নিয়ে পড়লে, আয় দেরিতে বাড়লেও কিস্তি দিতে পারব?

কাছাকাছি আর যা আছে

সূত্র
শিক্ষার আয়-প্রভাব: জর্জ সাকারোপুলোস ও হ্যারি প্যাট্রিনোস, “Returns to investment in education: a decennial review of the global literature”, Education Economics ২৬(৫), ২০১৮ (বিশ্বব্যাংক ওয়ার্কিং পেপার ৮৪০২), দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬।
উচ্চশিক্ষিতদের বেকারত্ব: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ (দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন, ২৬ অক্টোবর ২০২৩)।
বাংলাদেশে শিক্ষার আয়-প্রভাবে ভিন্নতা: এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ, “Returns to Education in Bangladesh”, Education Economics, ২০০৬।
কর: আয়কর আইন ২০২৩ ও সংশ্লিষ্ট অর্থ আইন।
এই পাতার সংখ্যাগুলো একটা সময়ের পরিসর, নির্দিষ্ট দিনের হার নয়। আজকের হার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন। এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়।