সঞ্চয়ী হিসাব কী
সঞ্চয়ী হিসাব হলো ব্যাংকে আপনার নামে খোলা একটা হিসাব, যেখানে টাকা রাখা যায় আর দরকার হলে তোলা যায়। টাকাটা ব্যাংকের কাছে থাকে, তবে মালিক আপনি; চাইলে ব্যাংক তা ফেরত দিতে বাধ্য। রাখার বিনিময়ে ব্যাংক অল্প কিছু সুদ বা মুনাফা দেয়।
এটা মূলত টাকা গুছিয়ে রাখার জায়গা: বেতন আসে, বিল যায়, জরুরি তহবিল হাতের কাছে থাকে। এখানে সুদ কম, তাই টাকা বাড়ানোর জন্য মানুষ সাধারণত অন্য পণ্যের দিকে তাকান।
ধরা যাক তানভীর সবে প্রথম চাকরি শুরু করেছেন। তিনি একটা সঞ্চয়ী হিসাব খুললেন; বেতন সেখানে আসে, কার্ড দিয়ে খরচ করেন, আর প্রতি মাসে ৳ ২,০০০ জরুরি দরকারের জন্য রেখে দেন। মা হঠাৎ অসুস্থ হলে সেই টাকা সেদিনই তুলতে পারলেন; কোনো মেয়াদ শেষের অপেক্ষা করতে হয়নি।
কীভাবে কাজ করে
সঞ্চয়ী হিসাবে টাকা জমা রাখলে ব্যাংক সেই স্থিতির ওপর সুদ দেয়। সুদ সাধারণত দৈনিক বা মাসিক স্থিতির ভিত্তিতে হিসাব হয় এবং তিন বা ছয় মাস পরপর হিসাবে যোগ হয়। কোন পদ্ধতিতে হিসাব হবে, তা ব্যাংকভেদে আলাদা।
এফডিআরের মতো হার আগে থেকে বাঁধা থাকে না; ব্যাংক যেকোনো সময় হার বদলাতে পারে। অনেক ব্যাংক সপ্তাহে বা মাসে কয়বার টাকা তোলা যাবে, তার একটা সীমা রাখে; সীমা ছাড়ালে ওই মাসের সুদ কমতে বা না-ও মিলতে পারে।
চলতি হিসাব (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) সাধারণত ব্যবসা ও ঘন ঘন লেনদেনের জন্য, তাতে সুদ খুব কম বা নেই। সঞ্চয়ী হিসাব ব্যক্তির জন্য, যেখানে টাকা হাতের কাছেও থাকে আবার সামান্য সুদও আসে।
সারা বছর ৳ ৫০,০০০ স্থিতি রেখে বছরে ৩% হারে সুদ পেলে আয় হয় ৳ ১,৫০০। ১০% উৎসে কর কাটার পর হাতে আসে ৳ ১,৩৫০। একই বছরে মূল্যস্ফীতি ৯% হলে ওই টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে প্রায় ৳ ৪,৫০০-এর সমান। হারগুলো উদাহরণ মাত্র।
যেসব রূপে পাওয়া যায়
- সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাব
- বেশির ভাগ মানুষের প্রথম ব্যাংক হিসাব; ন্যূনতম স্থিতি আর চার্জ ব্যাংকভেদে আলাদা।
- ১০/৫০/১০০ টাকার হিসাব
- কৃষক, অতিদরিদ্র, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতাভোগী, পোশাকশ্রমিকসহ প্রান্তিক মানুষের জন্য ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে চালু হওয়া হিসাব। খুব অল্প টাকায় খোলা যায়, সাধারণত ন্যূনতম স্থিতি বা রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ লাগে না।
- স্কুল ব্যাংকিং ও শিক্ষার্থী হিসাব
- ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা অভিভাবকের সঙ্গে খুব কম টাকায় (প্রায় ১০০ টাকা) হিসাব খুলতে পারে। অনেক ব্যাংক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য কম ন্যূনতম স্থিতির আলাদা হিসাবও দেয়।
- মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব
- ইসলামি ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব; সুদের বদলে লাভ ভাগাভাগি, হার আগে আনুমানিক ও পরে চূড়ান্ত হয়।
- বেশি স্থিতির বিশেষ হিসাব
- স্থিতি বেশি হলে ধাপে ধাপে বেশি হার দেয় এমন হিসাব; নারী, প্রবীণ বা বেতনভোগীদের জন্য আলাদা নামেও বিক্রি হয়।
মোবাইল ব্যাংকিংয়ে রাখা টাকা কি সঞ্চয়?
মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) ওয়ালেটে থাকা টাকা আইনগতভাবে ই-মানি; ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব নয়। প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের সমপরিমাণ টাকা ব্যাংকে আলাদা ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্টে রাখে, তবে ওয়ালেটের স্থিতির ওপর সাধারণত গ্রাহক সুদ পান না।
অনেক অ্যাপে এখন ডিপিএস বা সঞ্চয়ের অপশন থাকে। এগুলো আসলে কোনো অংশীদার ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির পণ্য, অ্যাপ শুধু মাধ্যম। তাই টাকা কোন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, তা জেনে নিন; সুরক্ষা ও ঝুঁকি নির্ভর করে সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর।
আপনার টাকা কতটা সুরক্ষিত
সঞ্চয়ী হিসাবের টাকাও ব্যাংকের কাছে আমানত। ব্যাংক বন্ধ হলে আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ (যা ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের জায়গা নিয়েছে) অনুযায়ী প্রতি আমানতকারী এক ব্যাংকে তাঁর সব হিসাব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাওয়ার কথা। সীমাটি প্রতি তিন বছরে পর্যালোচনা হয়।
কত লাভ আশা করা যায়
সঞ্চয়ী হিসাবের হার সাধারণত এফডিআর বা ডিপিএসের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক হিসাবে ২০২২–২০২৩ সালে গড় সঞ্চয়ী হার ছিল ৩%-এর সামান্য নিচে। ২০২৪-এ সুদহার বাজারভিত্তিক হওয়ার পর কিছু ব্যাংক হার বাড়িয়েছে, বিশেষ করে বেশি স্থিতির হিসাবে।
ছোট স্থিতিতে হার সবচেয়ে কম, অনেক সময় চার্জ কাটার পর লাভ প্রায় থাকে না। বছরের পর বছর বড় অঙ্ক সঞ্চয়ী হিসাবে ফেলে রাখলে মূল্যস্ফীতিতে তার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
যে কারণে মানুষ বেছে নেয়
- টাকা যেকোনো সময় তোলা যায়, জরুরি তহবিলের জন্য উপযুক্ত।
- খুব অল্প টাকায় খোলা যায়; প্রান্তিক মানুষের জন্য ১০ টাকার হিসাবও আছে।
- বেতন, ভাতা, রেমিট্যান্স আর অন্য সঞ্চয়ের সুদ জমা হওয়ার কেন্দ্র।
- আমানত সুরক্ষার আওতায় পড়ে।
যা ভেবে দেখার
- হার কম, প্রায়ই মূল্যস্ফীতির চেয়ে অনেক কম।
- ব্যাংক যেকোনো সময় হার কমাতে পারে।
- রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ, কার্ড ফি আর আবগারি শুল্ক ছোট লাভ খেয়ে ফেলতে পারে।
- টাকা হাতের কাছে থাকায় খরচ হয়ে যাওয়ার প্রলোভনও বেশি।
কর
সুদ বা মুনাফা দেওয়ার সময় ব্যাংক উৎসে কর কেটে রাখে। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার ছিল টিআইএন থাকলে ১০% আর না থাকলে ১৫%; প্রতি বছরের অর্থ আইনে হার বদলাতে পারে।
বছরের কোনো সময় হিসাবের স্থিতি একটা সীমা ছাড়ালে আবগারি শুল্ক কাটা হয়। সাম্প্রতিক বাজেটগুলোতে শুল্কমুক্ত সীমা কয়েক লাখ টাকায় তোলা হয়েছে; সীমা ও হার অর্থ আইনে নির্ধারিত হয় এবং বদলায়।
এ ছাড়া ব্যাংক বছরে এক-দুইবার হিসাব রক্ষণাবেক্ষণ চার্জ কাটতে পারে। ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় গড় স্থিতি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত হলে এই চার্জ নেওয়া হয় না; নিয়ম পরে বদলাতে পারে।
করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কীভাবে শুরু করবেন
- বাড়ি বা কর্মস্থলের কাছের ব্যাংক বা এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট বেছে নিন; অনেক ব্যাংকে অ্যাপেও হিসাব খোলা যায় (ই-কেওয়াইসি)।
- কাগজপত্র: জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, নমিনির পরিচয়পত্র ও ছবি; শিক্ষার্থী হলে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র ও অভিভাবকের তথ্য।
- ন্যূনতম স্থিতি, চার্জ, কার্ড ফি আর মাসে কয়বার টাকা তোলা যাবে, তা লিখিতভাবে জেনে নিন।
- সুদ কোন স্থিতির ওপর এবং কত দিন পরপর জমা হয়, জিজ্ঞেস করুন।
- এসএমএস অ্যালার্ট চালু রাখুন, যাতে প্রতিটি লেনদেন জানতে পারেন।
শুরুর আগে যাচাই করুন
- এই টাকা কি সত্যিই হাতের কাছে রাখা দরকার, নাকি মেয়াদি সঞ্চয়ে রাখা যায়?
- চার্জ বাদ দিলে আমার স্থিতিতে আসলে কত সুদ পাব?
- মাসে কয়বার টাকা তোলা যায়, আর তার বেশি তুললে কী হয়?
- মোবাইল অ্যাপে সঞ্চয় করলে টাকা কোন ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে, জানি?
- এক ব্যাংকে আমার মোট আমানত কি সুরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে?
- নমিনি ঠিকমতো দেওয়া আছে?