আইপিও কী
আইপিও মানে কোনো কোম্পানির প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করা। এর আগে কোম্পানিটার মালিক থাকেন অল্প কয়েকজন; আইপিওর পর যে কেউ তার শেয়ার কিনতে পারেন, আর শেয়ারবাজারে সেই শেয়ারের কেনাবেচা শুরু হয়।
কোম্পানি এভাবে নতুন টাকা তোলে, আর আপনি শুরুতেই তার অংশীদার হওয়ার সুযোগ পান। তবে চাহিদা বেশি হলে আবেদন করলেই শেয়ার মেলে না, আর লেনদেন শুরুর পর দাম বাড়বে না কমবে, তা কেউ আগে থেকে বলতে পারে না।
ধরা যাক একটা ওষুধ কোম্পানি আইপিওতে শেয়ার ছাড়ছে, দাম ধরা যাক প্রতিটা ১০ টাকা। মারুফ ১০,০০০ টাকার শেয়ারের জন্য আবেদন করল। কিন্তু শেয়ারের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ আবেদন করায় মারুফ শেয়ার পেল না, তার টাকা ফেরত এলো। তার বন্ধু সাদিয়া শেয়ার পেল; লেনদেন শুরুর পর কিছুদিন দাম বাড়ল, তারপর কমতে শুরু করল। কখন বেচবে, সেই সিদ্ধান্ত এখন সাদিয়ার।
কীভাবে কাজ করে
টাকা তুলতে চাওয়া কোম্পানি একটা ইস্যু ম্যানেজারের সাহায্যে প্রসপেক্টাস তৈরি করে বিএসইসির অনুমোদন নেয়। অনুমোদনের পর একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে আবেদন (সাবস্ক্রিপশন) নেওয়া হয়। শেয়ার বণ্টনের পর কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় এবং তখন থেকে শেয়ারটি বাজারে কেনাবেচা হয়।
দাম ঠিক করার দুটো পদ্ধতি আছে। ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে দাম আগে থেকে নির্ধারিত, সাধারণত অভিহিত মূল্য ৳ ১০। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে প্রাতিষ্ঠানিক ও যোগ্য বিনিয়োগকারীরা নিলামে দর দেন, তার ভিত্তিতে একটা কাট-অফ দাম ঠিক হয়; সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সেই দামে বা নিয়মে বলা ছাড়ে আবেদন করেন।
প্রস্তাবিত শেয়ারের একটা অংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য, একটা অংশ প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য, বাকিটা যোগ্য বিনিয়োগকারী, মিউচুয়াল ফান্ড ইত্যাদির জন্য। আবেদন শেয়ারের চেয়ে বেশি হলে (ওভারসাবস্ক্রিপশন) সবাই শেয়ার পান না; যাঁরা পান না, তাঁদের টাকা ফেরত আসে।
ফিক্সড প্রাইসে ৳ ১০ দামে কেউ ৳ ১০,০০০-এর আবেদন করে ১,০০০টা শেয়ার পেলেন। তালিকাভুক্তির পর দাম ৳ ১৫ হলে কাগজে লাভ ৳ ৫,০০০; ৳ ৮ হলে কাগজে লোকসান ৳ ২,০০০। শেয়ার না পেলে টাকা ফেরত আসে, কিন্তু আবেদনের সময় সেটা আটকে থাকে। অঙ্কগুলো উদাহরণ মাত্র।
শেয়ার বণ্টন: লটারি না আনুপাতিক
চাহিদা বেশি হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শেয়ার ভাগ করার নিয়ম বেশ কয়েকবার বদলেছে। দীর্ঘদিন লটারি ছিল: ভাগ্যবানরা পুরো লট পেতেন, বাকিরা কিছুই না। ২০২০–২০২১ সময় থেকে আনুপাতিক (প্রো-রাটা) বণ্টন চালু হয়, যাতে প্রত্যেক আবেদনকারী অল্প কিছু শেয়ার পান। জানুয়ারি ২০২৬-এ বিএসইসি আবার লটারি ফিরিয়ে এনেছে।
আবেদনের যোগ্যতাও বদলায়। কয়েক বছর আবেদন করতে হলে নির্দিষ্ট তারিখে সেকেন্ডারি বাজারে ন্যূনতম একটা অঙ্কের তালিকাভুক্ত শেয়ার ধরে রাখতে হতো (২০২২-এ এটা ৳ ২০,০০০ থেকে বেড়ে ৳ ৫০,০০০ হয়েছিল)। ২০২৫-এর শেষে কার্যকর নতুন পাবলিক ইস্যু বিধিমালায় এই শর্ত তুলে দেওয়া হয়েছে বলে খবর। প্রতিটা আইপিওর আগে সেই সময়ের নিয়ম মিলিয়ে নিন।
প্রসপেক্টাসে যা দেখবেন
- টাকা কোথায় যাবে
- নতুন কারখানা বা ব্যবসা বাড়ানো, না শুধু পুরোনো ঋণ শোধ?
- আয় ও লাভের ইতিহাস
- আইপিওর ঠিক আগে হঠাৎ লাভ বেড়ে যাওয়া সতর্ক হওয়ার কারণ হতে পারে।
- দাম ও মূল্যায়ন
- শেয়ারপ্রতি আয় ও সম্পদের তুলনায় দাম কত, একই খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করুন।
- উদ্যোক্তাদের লক-ইন
- উদ্যোক্তা ও পরিচালকেরা কত দিন শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না; লক-ইন শেষে বড় বিক্রির চাপ আসতে পারে।
- নিরীক্ষক ও ক্রেডিট রেটিং
- নিরীক্ষকের মতামতে কোনো শর্ত বা সতর্কতা আছে কি না দেখুন।
কত লাভ আশা করা যায়
বাংলাদেশে বহু আইপিও তালিকাভুক্তির প্রথম দিকে অফার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে কেনাবেচা হয়েছে, তাই আইপিওকে অনেকে "নিশ্চিত লাভ" ভাবেন। এই প্রথম দিকের বাড়তি দাম গবেষণায় ভালোভাবে নথিভুক্ত। কিন্তু সেটা সব আইপিওতে হয় না, আর পরে অনেক শেয়ারের দাম কমে অফার মূল্যের কাছে বা নিচে নেমেছে; যেমন জানুয়ারি ২০২২-এ ৳ ১০-এ তালিকাভুক্ত একটা শেয়ার সেই বছরের আগস্টেই ৳ ১০-এর নিচে লেনদেন হচ্ছিল।
লটারির সময় শেয়ার পাওয়ার সম্ভাবনা কম, আর আনুপাতিক বণ্টনের সময় প্রত্যেকে এত কম শেয়ার পেয়েছেন যে লাভ হলেও অঙ্ক ছোট ছিল। তালিকাভুক্তির পর শেয়ারটা অন্য যেকোনো শেয়ারের মতোই ওঠানামা করে।
যে কারণে মানুষ বেছে নেয়
- ফিক্সড প্রাইসে সাধারণত অভিহিত মূল্যে, তুলনামূলক কম দামে কেনার সুযোগ।
- শেয়ার না পেলে টাকা ফেরত আসে।
- প্রসপেক্টাসে কোম্পানির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্য।
- আবেদন বিও হিসাব দিয়ে অনলাইনেই করা যায়।
যা ভেবে দেখার
- চাহিদা বেশি হলে শেয়ার পাওয়া অনিশ্চিত, পেলেও পরিমাণ কম হতে পারে।
- নতুন কোম্পানির দীর্ঘ রেকর্ড থাকে না; প্রসপেক্টাসের তথ্য যাচাই কঠিন।
- তালিকাভুক্তির পর দাম অফার মূল্যের নিচে নামতে পারে।
- আবেদনের সময় টাকা আটকে থাকে।
- নিয়ম ঘন ঘন বদলায়।
কর
আইপিওতে পাওয়া শেয়ার তালিকাভুক্তির পর সাধারণ তালিকাভুক্ত শেয়ারের মতোই। লভ্যাংশে কর আর বিক্রির লাভে মূলধনি মুনাফা কর শেয়ারের নিয়মেই হয় (বিস্তারিত শেয়ার পাতায়)।
আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যক্তির তালিকাভুক্ত শেয়ার বিক্রির লাভ বছরে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত করমুক্ত ছিল; প্রতি বছরের অর্থ আইনে এসব বদলাতে পারে।
করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কীভাবে শুরু করবেন
- একটা বিও হিসাব খুলুন, নিজের নামে ব্যাংক হিসাব যুক্ত করুন।
- বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে অনুমোদিত আইপিও আর আবেদনের তারিখ দেখুন।
- প্রসপেক্টাস পড়ুন, বিশেষ করে টাকার ব্যবহার, আয়ের ইতিহাস আর ঝুঁকির অংশ।
- সেই সময়ের যোগ্যতা ও আবেদনের অঙ্কের নিয়ম জেনে ব্রোকারের মাধ্যমে বা অনলাইনে আবেদন করুন।
- বণ্টনের ফল দেখুন; শেয়ার না পেলে টাকা ফেরত এসেছে কি না মিলিয়ে নিন।
শুরুর আগে যাচাই করুন
- প্রসপেক্টাস নিজে পড়েছি, নাকি শুধু অন্যের কথায় আবেদন করছি?
- কোম্পানি টাকাটা কী কাজে লাগাবে, বুঝেছি?
- তালিকাভুক্তির পর দাম কমলে কি শেয়ারটা রেখে দিতে পারব?
- "আইপিও মানেই লাভ" ধরে নিচ্ছি না তো?
- এই আইপিওর জন্য যোগ্যতার নিয়ম জানি?