প্রবাসী বন্ড কী
প্রবাসী বন্ড হলো শুধু বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য সরকারের সঞ্চয় বন্ড। বন্ড কেনা মানে সরকারকে নির্দিষ্ট কয়েক বছরের জন্য টাকা ধার দেওয়া; বিনিময়ে সরকার মুনাফা দেয় আর মেয়াদ শেষে মূল টাকা ফেরত দেয়।
কেনার টাকা আসতে হয় বিদেশের আয় থেকে। একটা বন্ড টাকায়, দুটো ডলারে; তাই প্রবাসীরা চাইলে আয়ের একটা অংশ দেশে টাকায় জমাতে পারেন, আবার ডলারেও রাখতে পারেন।
ধরা যাক দুবাইয়ে কাজ করা শফিক প্রতি মাসে পরিবারের খরচের টাকা দেশে পাঠান। কয়েক বছরে তিনি বাড়তি ৳ ৩,০০,০০০ জমিয়েছেন এবং চান, দেশে ফিরলে এটা কাজে লাগুক। তিনি সেই টাকায় ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড কিনলেন, যাতে মেয়াদ শেষে মূল টাকা আর মুনাফা দুটোই দেশে তাঁর জন্য অপেক্ষা করে।
কীভাবে কাজ করে
বিদেশে আয় করা টাকা দেশে পাঠিয়ে বা বৈদেশিক মুদ্রায় সরাসরি এই বন্ডগুলো কেনা যায়। এগুলো জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের অংশ, তাই টাকা ফেরতের দায় সরকারের। বিক্রি হয় দেশের ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার শাখা, বিদেশে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা আর এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে।
ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড ৫ বছর মেয়াদি, টাকায় কেনা হয়, মুনাফাও টাকায়। ডলার বন্ড দুটি ৩ বছর মেয়াদি, ডলারে কেনা হয়; মূল টাকা ডলারে ফেরত পাওয়া যায় এবং বিদেশে নেওয়া যায়।
কেনার দিনের হার পুরো মেয়াদে বহাল থাকে। হার নির্ভর করে মোট বিনিয়োগের অঙ্কের ওপর: অঙ্ক যত বড়, হার তত কম। মেয়াদ শেষে পুনঃবিনিয়োগ করা যায়, তবে তখনকার হারে।
ওয়েজ আর্নার বন্ডে ৳ ৫,০০,০০০ বছরে ১২% হারে রাখলে বছরে মুনাফা ৳ ৬০,০০০, পাঁচ বছরে ৳ ৩,০০,০০০। এই বন্ডের মুনাফা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করমুক্ত ছিল। হারটা উদাহরণ মাত্র; আসল হার অঙ্ক আর কেনার সময়ভেদে আলাদা।
তিনটি বন্ড
- ওয়েজ আর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড
- ৫ বছর মেয়াদি, টাকায়। কিনতে পারেন বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা, আর তাঁদের মনোনীত ব্যক্তি দেশে বসে তাঁদের পাঠানো টাকায়। জাতীয় পরিচয়পত্র লাগে।
- ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড
- ৩ বছর মেয়াদি, ডলারে কেনা; মুনাফা ছয় মাস পরপর টাকায়, মূল টাকা ডলারে।
- ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড
- ৩ বছর মেয়াদি, ডলারে কেনা; মূল টাকা ও মুনাফা ডলারে নেওয়া যায়। হার প্রিমিয়াম বন্ডের চেয়ে সাধারণত ১ শতাংশ পয়েন্ট কম।
সীমা আর নিয়মের বদল
এই বন্ডগুলোর নিয়ম বারবার বদলেছে। ডলার বন্ডে ২০২০ সালে বিনিয়োগ-সীমা বসানো হয়, এপ্রিল ২০২২-এ তুলে দেওয়া হয়। ওয়েজ আর্নার বন্ডে ২০২১ থেকে সঞ্চয়পত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ১ কোটি টাকার সীমা ছিল; ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে প্রবাসীদের জন্য সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া হয়।
একই সময়ে নাবিক, পাইলট ও কেবিন ক্রুর মতো বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রবাসীদেরও কেনার সুযোগ দেওয়া হয়, আর মেয়াদ শেষে কয়েকবার পুনঃবিনিয়োগ করে মোট ১৫ বছর পর্যন্ত রাখার নিয়ম আসে। কেনার আগে সর্বশেষ নিয়ম ব্যাংক থেকে জেনে নিন।
কত লাভ আশা করা যায়
ওয়েজ আর্নার বন্ডে আগে সবার জন্য ১২% ছিল। ২০২১ সাল থেকে অঙ্কভেদে হার: ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ১২%, তারপর ধাপে ধাপে কমে ৫০ লাখের বেশিতে ৯%। জুলাই ২০২৫-এর পর্যালোচনায় এই হার অপরিবর্তিত রাখা হয়।
ডলার বন্ডের হার বিশ্ববাজারের সঙ্গে ওঠানামা করেছে। ২০২২-এর আগে প্রিমিয়াম বন্ড ৭.৫% আর ইনভেস্টমেন্ট বন্ড ৬.৫% দিত। এপ্রিল ২০২২-এ অঙ্কভিত্তিক স্তর করে হার নামানো হয়, বড় অঙ্কে ২–৩.৫% পর্যন্ত। জানুয়ারি ২০২৪-এ আবার বাড়ানো হয়: ১ লাখ ডলার পর্যন্ত প্রিমিয়াম বন্ডে মেয়াদপূর্তিতে ৭.৫%, ইনভেস্টমেন্ট বন্ডে ৬.৫%।
মেয়াদের আগে ভাঙালে কম হারে মুনাফা হিসাব হয়; ওয়েজ আর্নার বন্ড ছয় মাসের মধ্যে ভাঙালে কোনো মুনাফা মেলে না। টাকার বন্ডে টাকার মূল্য কমলে ডলারের হিসাবে প্রকৃত লাভ কমে যায়।
যে কারণে মানুষ বেছে নেয়
- টাকা ফেরতের দায় সরকারের।
- সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুনাফা করমুক্ত ছিল।
- ডলার বন্ডে মূল টাকা ডলারে থাকে, তাই টাকার মূল্য কমার ঝুঁকি কম।
- প্রবাসে থেকেও দেশে সরকারি সঞ্চয় করা যায়।
যা ভেবে দেখার
- হার আর সীমার নিয়ম বারবার বদলেছে।
- বড় অঙ্কে হার কম।
- মেয়াদের আগে ভাঙালে মুনাফা কমে।
- কেনা ও ভাঙানোর প্রক্রিয়া কাগজপত্রনির্ভর; বিদেশ থেকে সামলানো ঝামেলার হতে পারে।
কর
আয়কর আইন অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই তিন বন্ডের মুনাফা করমুক্ত ছিল, তাই উৎসে কর কাটা হয় না। আইন বদলালে এটাও বদলাতে পারে।
দেশে করদাতা হলে বা দেশে ফিরে এলে বন্ডের তথ্য আপনার সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হতে পারে।
করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কীভাবে শুরু করবেন
- কোন বন্ড আপনার কাজে আসে ভাবুন: টাকায় নাকি ডলারে মুনাফা ও মূল টাকা চান।
- দেশের কোনো ব্যাংকের অনুমোদিত ডিলার শাখা, বিদেশে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা বা এক্সচেঞ্জ হাউসে যোগাযোগ করুন।
- কাগজপত্র নিন: পাসপোর্ট, প্রয়োজনে জাতীয় পরিচয়পত্র, কাজের ভিসা বা বসবাসের প্রমাণ, রেমিট্যান্সের প্রমাণ, নমিনির তথ্য।
- হার, মুনাফা কখন ও কোন মুদ্রায় আসবে, আর আগে ভাঙানোর নিয়ম লিখিতভাবে জেনে নিন।
শুরুর আগে যাচাই করুন
- মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কি এই টাকা লাগতে পারে?
- আমার মোট বিনিয়োগে কোন হারের স্তর খাটবে?
- মুনাফা টাকায় না ডলারে আসবে, আর বিদেশে নেওয়া যাবে কি না জানি?
- যে ব্যাংকের মাধ্যমে কিনছি, তারা মুনাফা কোন হিসাবে দেবে জেনেছি?
- নমিনি ঠিকমতো দেওয়া আছে?