সর্বজনীন পেনশন কী
সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরের পর পেনশন পান, কিন্তু কৃষক, দোকানদার, বেসরকারি চাকরিজীবী বা প্রবাসীদের বেশিরভাগের তা নেই। সর্বজনীন পেনশন স্কিম এই ফাঁকটা পূরণের জন্য সরকারের চালু করা ব্যবস্থা।
ব্যাপারটা সহজ: কাজের বছরগুলোতে প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক জমা দেন, সেই টাকা বিনিয়োগ হয়ে বাড়ে, আর বুড়ো বয়সে আপনি প্রতি মাসে পেনশন পান। অর্থাৎ আজকের নিজের কাছ থেকে টাকা সরিয়ে ভবিষ্যতের নিজের জন্য রাখা।
ধরা যাক ৩০ বছর বয়সী দোকানদার কামরুল প্রতি মাসে ১,০০০ টাকা করে জমা দিতে শুরু করলেন। ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত ৩০ বছরে তিনি নিজের পকেট থেকে দেন মোট ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা, আর তার ওপর প্রতি বছর মুনাফা যোগ হয়। ৬০-এর পর থেকে তিনি আজীবন মাসিক পেনশন পাবেন; কত পাবেন, তা নির্ভর করবে জমার অঙ্ক আর মুনাফার ওপর।
কীভাবে কাজ করে
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩-এর অধীনে আগস্ট ২০২৩-এ স্কিমটি চালু হয়। চালায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। জাতীয় পরিচয়পত্র আছে এমন ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী নাগরিক অনলাইনে নিবন্ধন করতে পারেন। ৫০-এর বেশি বয়সীরাও যোগ দিতে পারেন, তবে টানা ১০ বছর চাঁদা দেওয়ার পর পেনশন পান।
আপনি একটা স্কিম ও মাসিক চাঁদার অঙ্ক বেছে নেন, তারপর প্রতি মাসে (বা আগাম কয়েক মাসের) চাঁদা দেন। কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দিতে হয়। জমা টাকা মূলত সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ হয় এবং প্রতি বছর কর্তৃপক্ষ একটা মুনাফার হার ঘোষণা করে আপনার হিসাবে যোগ করে।
৬০ বছর বয়স থেকে আজীবন মাসিক পেনশন পান। পেনশনের অঙ্ক নির্ভর করে কত টাকা, কত বছর জমা দিয়েছেন আর কত মুনাফা যোগ হয়েছে তার ওপর। চাঁদা যত আগে শুরু, পেনশন তত বড়।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটের সম্ভাব্য হিসাব অনুযায়ী, কেউ মাসে ৳ ১,০০০ করে ৪২ বছর জমা দিলে সম্ভাব্য মাসিক পেনশন প্রায় ৳ ৩৪,৪৬৫; একই অঙ্ক মাত্র ১০ বছর জমা দিলে প্রায় ৳ ১,৫৩০। এগুলো ধরে নেওয়া মুনাফার হারের ওপর ভিত্তি করে অনুমান, নিশ্চয়তা নয়; আর ৪২ বছর পর টাকার মূল্যও অনেক কমে যাবে।
চারটি স্কিম
- প্রবাস
- বিদেশে থাকা বা কাজ করা বাংলাদেশিদের জন্য। মাসিক চাঁদা ৳ ১,০০০ থেকে ৳ ১০,০০০-এর কয়েকটা ধাপে, বৈদেশিক মুদ্রায় দেওয়া যায়; পেনশন টাকায়। দেশে ফিরলে টাকায় চাঁদা দিয়ে চালু রাখা বা স্কিম বদলানো যায়।
- প্রগতি
- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও মালিকদের জন্য। চাঁদা ৳ ১,০০০ থেকে ৳ ১৫,০০০ (আউটসোর্সিং কর্মীদের জন্য ৳ ৫০০)। প্রতিষ্ঠান অংশ নিলে চাঁদার অর্ধেক কর্মী, অর্ধেক প্রতিষ্ঠান দেয়; না নিলে কর্মী একাই যোগ দিতে পারেন।
- সুরক্ষা
- স্বকর্মে নিয়োজিত ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের জন্য, যেমন কৃষক, রিকশাচালক, শ্রমিক, জেলে, তাঁতি। চাঁদা ৳ ১,০০০, ২,০০০, ৩,০০০ বা ৫,০০০।
- সমতা
- স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য; বর্তমান নিয়মে বছরে আয় ৳ ৬০,০০০-এর বেশি নয়। মাসিক ৳ ১,০০০-এর মধ্যে ৳ ৫০০ দেন সদস্য, ৳ ৫০০ দেয় সরকার।
- প্রত্যয় (বাতিল)
- স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য ২০২৪-এ চালু হয়েছিল; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের পর আগস্ট ২০২৪-এ সরকার এটি বাতিল করে।
নমিনি, ঋণ ও টাকা তোলা
আইন অনুযায়ী পেনশনভোগী ৭৫ বছর বয়সের আগে মারা গেলে নমিনি বাকি সময় (মৃত ব্যক্তির ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত) মাসিক পেনশন পান। ১০ বছর চাঁদা পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে নমিনি জমা টাকা ও মুনাফা ফেরত পান।
জমা টাকার সর্বোচ্চ ৫০% পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যায়, যা ফি সহ ফেরত দিতে হয়। ২০২৫ সালে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে পেনশনের বয়সে চাইলে মোট জমার ৩০% পর্যন্ত একবারে তোলা যাবে। পেনশন শুরুর বয়স কমানো, স্বামী বা স্ত্রীর আজীবন পেনশন আর শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণের মতো আরও কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব বিবেচনায় আছে; নিয়ম বদলাতে পারে, তাই যোগ দেওয়ার সময় সর্বশেষ নিয়ম দেখে নিন।
কত লাভ আশা করা যায়
চাঁদার ওপর মুনাফা আগে থেকে নির্দিষ্ট নয়; প্রতি বছর জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে সর্বোচ্চ হার ছিল ১১.৬১% (টাকা কত দিন বিনিয়োগে ছিল তার ওপর নির্ভর করে), আর ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১১.৭২%। এই হারগুলো সরকারি বন্ডের তখনকার উঁচু সুদের সঙ্গে সম্পর্কিত; সুদের হার কমলে মুনাফার হারও কমতে পারে।
আসল প্রশ্ন হলো অবসরের সময় পেনশনের অঙ্কের ক্রয়ক্ষমতা কত থাকবে। ৩০–৪০ বছরে মূল্যস্ফীতি টাকার মূল্য অনেক কমিয়ে দেয়, তাই আজকের হিসাবে বড় দেখানো পেনশন ভবিষ্যতে ততটা বড় না-ও হতে পারে।
যে কারণে মানুষ বেছে নেয়
- সরকার-পরিচালিত ব্যবস্থা, যা বেসরকারি খাতের মানুষকেও পেনশনের সুযোগ দেয়।
- আজীবন মাসিক পেনশন; নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নমিনির সুরক্ষা।
- সমতা স্কিমে সরকার চাঁদার অর্ধেক দেয়; প্রগতিতে প্রতিষ্ঠানও দিতে পারে।
- মাসিক কিস্তি বাধ্যতামূলক সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করে।
- চাঁদা কর রেয়াতের জন্য গণ্য, পেনশন করমুক্ত।
যা ভেবে দেখার
- টাকা দীর্ঘ সময় আটকে থাকে; প্রয়োজনে তোলার সুযোগ সীমিত।
- মুনাফার হার প্রতি বছর বদলায়, নিশ্চিত নয়।
- মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে পেনশনের প্রকৃত মূল্য কমিয়ে দেয়।
- স্কিমটি নতুন, আর নিয়ম বারবার বদলাচ্ছে।
- ১০ বছরের কম চাঁদা দিলে পেনশন মেলে না।
কর
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ অনুযায়ী চাঁদা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হয় এবং আয়কর রেয়াত পাওয়া যায়; রেয়াতের হার ও সীমা আয়কর আইন ২০২৩ ও প্রতি বছরের অর্থ আইনে ঠিক হয়।
আইন অনুযায়ী মাসিক পেনশন আয়করমুক্ত। কর-সংক্রান্ত নিয়ম আইন বা অর্থ আইন সংশোধনে বদলাতে পারে।
করের নিয়ম প্রতি বছরের অর্থ আইনে বদলাতে পারে। বড় সিদ্ধান্তের আগে সর্বশেষ নিয়ম বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
কীভাবে শুরু করবেন
- জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে (upension.gov.bd) নিজের জন্য উপযুক্ত স্কিম দেখুন।
- জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব আর নমিনির তথ্য দিয়ে অনলাইনে নিবন্ধন করুন।
- মাসিক চাঁদার অঙ্ক এমনভাবে বাছুন যাতে বহু বছর টানা দিতে পারেন।
- ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা বা অনলাইনে চাঁদা দিন; রসিদ সংরক্ষণ করুন।
- মাঝে মাঝে অনলাইনে নিজের হিসাবের জমা আর মুনাফা মিলিয়ে দেখুন।
শুরুর আগে যাচাই করুন
- এই অঙ্ক কি ১০ বছর বা তার বেশি সময় টানা দিতে পারব?
- কোন স্কিমে আমি যোগ্য, নিশ্চিত হয়েছি?
- জরুরি প্রয়োজনের টাকা আলাদা রেখেছি?
- নমিনির তথ্য ঠিকমতো দিয়েছি?
- সর্বশেষ নিয়ম (টাকা তোলা, পেনশনের বয়স) কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে দেখেছি?