মূল ধারণা
বেশিরভাগ কমোডিটি এমন জিনিস, যা ছাড়া চলে না: রান্নার তেল, জ্বালানি, গম, পেঁয়াজ। দাম বাড়লেও মানুষ এগুলো খুব বেশি কম কেনে না। আবার উৎপাদনও হঠাৎ বাড়ানো যায় না: নতুন ফসলের জন্য মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, নতুন তেলকূপ বা খনি চালু করতে বছর লাগে।
চাহিদা আর জোগান দুটোই যখন এমন অনমনীয়, তখন জোগানে সামান্য ঘাটতিও দামে বিরাট লাফ দেয়, কারণ দাম অনেক না বাড়া পর্যন্ত চাহিদা কমে না। উল্টোটাও সত্য: অল্প বাড়তি জোগানে দাম ধপাস করে পড়ে।
৮ ডিসেম্বর ২০২৩ বিকেলে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ ঘণ্টার মধ্যে দিনাজপুরে দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৯০–১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০–২০০ টাকা হয়, প্রায় দ্বিগুণ। মানুষ পেঁয়াজ খাওয়া হঠাৎ বন্ধ করেনি, আর নতুন ফসলও রাতারাতি আসেনি; তাই আমদানির একটা পথ বন্ধ হতেই দাম লাফ দিল।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- ঝুঁকি মাপতে: কমোডিটি বা কমোডিটি-নির্ভর কোম্পানিতে টাকা রাখলে বড় ও হঠাৎ ওঠানামার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।
- ইনফ্লেশনের ধাক্কা আগে বুঝতে: বিশ্ববাজারে জ্বালানি বা খাদ্যের দাম বাড়লে কয়েক মাসের মধ্যে দেশের ইনফ্লেশন আর সুদের হারে তার ছাপ পড়ে।
- "রেকর্ড দাম" নিয়ে সতর্ক থাকতে: চূড়ার পরে বড় পতন কমোডিটিতে খুব সাধারণ ঘটনা।
- কোম্পানির আয় বুঝতে: কাঁচামালের দামের ওঠানামা কোম্পানির লাভকেও ওঠানামা করায়।
দাম নড়ার প্রধান কারণ
- আবহাওয়া আর মৌসুম: খরা, বন্যা বা অতিবৃষ্টিতে ফসল কম হলে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ে।
- যুদ্ধ ও সরবরাহে বাধা: বড় উৎপাদক অঞ্চলে যুদ্ধ বা জাহাজ চলাচলে বাধা হলে জ্বালানি আর খাদ্যের জোগান হঠাৎ কমে।
- বাণিজ্য নীতি: কোনো দেশ রপ্তানি বন্ধ বা শুল্ক বাড়ালে আমদানিকারক দেশে দাম লাফ দেয়, যেমন ২০২৩ সালের পেঁয়াজ।
- বিশ্ব অর্থনীতি: উত্থানের সময় কারখানা আর যানবাহনে চাহিদা বাড়ে; মন্দায় কমে।
- ডলার আর টাকা: কমোডিটির দাম ডলারে, তাই টাকা দুর্বল হলে বিশ্ববাজারে দাম না বাড়লেও দেশে দাম বাড়ে।
- মজুত আর জল্পনা: মজুত কম থাকলে ছোট খবরেও দাম নড়ে; ফিউচার্স বাজারে কেনাবেচাকারীদের মনোভাবও ওঠানামা বাড়াতে পারে।
ইতিহাসের কয়েকটা বড় ঝাঁকুনি
জুলাই ২০০৮-এ ব্রেন্ট তেল ব্যারেলে প্রায় ১৪৭.৫০ ডলারের রেকর্ডে ওঠে; বিশ্ব আর্থিক সংকটে ডিসেম্বরের মধ্যে তা নামে প্রায় ৩৬ ডলারে। ২০২০ সালে কোভিডের সময় চাহিদা এত কমে যে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই-এর দাম এক দিনের জন্য মাইনাস ৪০.৩২ ডলারে নামে: উৎপাদকেরা তেল নিয়ে যাওয়ার জন্য উল্টো টাকা দিচ্ছিল, কারণ রাখার জায়গা ছিল না।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর মার্চে ব্রেন্ট উঠে যায় ১৩৯ ডলারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্য মূল্যসূচক মার্চ ২০২২-এ ১৯৯০ সাল থেকে শুরু হওয়া সূচকের সর্বোচ্চে পৌঁছায়; ভোজ্যতেলের সূচক এক মাসেই বাড়ে ২৩%। আর ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাংক এপ্রিল ২০২৬-এ পূর্বাভাস দেয়, বছরজুড়ে জ্বালানির দাম প্রায় ২৪% আর ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ৬০% বাড়তে পারে।
- উঁচু দাম নিজেই পরের পতনের বীজ বোনে: দাম বেশি থাকলে নতুন উৎপাদনে টাকা ঢালা হয়, আর সেই জোগান বাজারে আসতেই দাম পড়ে। যেমন ২০১৪ পর্যন্ত তেল ১০০ ডলারের ওপরে ছিল; যুক্তরাষ্ট্রের শেল তেলের জোগান বাড়ায় ২০১৫ সালের শুরুতে তা ৫০ ডলারের নিচে নামে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক কোনো কমোডিটির বিশ্ববাজারে দাম ১০০ ডলার, আর ১ ডলার = ১১০ টাকা। টাকায় দাম ১১,০০০ টাকা।
- বিশ্ববাজারে দাম ২০% বেড়ে হলো ১২০ ডলার। একই সময়ে টাকা ১০% দুর্বল হয়ে ১ ডলার = ১২১ টাকা।
- টাকায় নতুন দাম: ১২০ × ১২১ = ১৪,৫২০ টাকা। বৃদ্ধি ৩,৫২০ টাকা, অর্থাৎ ৩২%।
ফল: ২০% আর ১০% যোগ করে ৩০% নয়, গুণ হয়ে ৩২% (১.২০ × ১.১০ = ১.৩২)। আমদানিনির্ভর দেশে দুই ধাক্কা একসঙ্গে এলে দেশি দাম অনেক বেশি বাড়ে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- সাম্প্রতিক দাম বৃদ্ধি দেখে ধরে নেওয়া যে বাড়তেই থাকবে। কমোডিটিতে চূড়ার পর বড় পতন খুবই সাধারণ।
- শুধু ডলারের দাম দেখা, টাকার মান ভুলে যাওয়া। দেশে আপনার খরচ নির্ভর করে দুটোর ওপরই।
- দাম বাড়ার খবরে আতঙ্কে অতিরিক্ত কিনে মজুত করা, যা নিজেই দাম আরও বাড়ায়।
- ভাবা যে দাম সবসময় "আগের স্বাভাবিকে" ফিরে আসবে। কখনো নতুন জোগান বা চাহিদার কারণে স্বাভাবিকটাই বদলে যায়।
চাহিদা আর জোগান দুটোই হঠাৎ বদলাতে পারে না বলে কমোডিটিতে ছোট ধাক্কাও বড় দামের ঝাঁকুনি হয়ে আসে, আর বাংলাদেশে টাকার মান সেই ধাক্কা আরও বাড়াতে পারে।