ইমার্জেন্সি ফান্ড কী
ইমার্জেন্সি ফান্ড হলো এমন টাকা, যা শুধু বিপদের জন্য আলাদা করে রাখা। এটা ঈদের কেনাকাটা, নতুন ফোন বা বেড়াতে যাওয়ার টাকা নয়। এর কাজ একটাই: হঠাৎ আয় বন্ধ হলে বা বড় খরচ এসে পড়লে যেন ধার করতে, সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে বা লোকসানে শেয়ার বেচতে না হয়।
সাধারণ নিয়ম হলো, অন্তত ৩ থেকে ৬ মাসের জরুরি খরচের সমান টাকা রাখা। এটা কোনো আইন নয়, একটা শুরু করার মাপকাঠি। কারো জন্য ৩ মাসই যথেষ্ট, কারো আবার ৬ মাসেরও বেশি লাগতে পারে।
ধরা যাক রাকিব একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করেন। হঠাৎ অফিস বন্ধ হয়ে গেল, নতুন চাকরি পেতে লাগল চার মাস। তাঁর আলাদা করে রাখা টাকা থেকে এই চার মাস বাসা ভাড়া, বাজার আর বাবার ওষুধের খরচ চলেছে; কারো কাছে হাত পাততে হয়নি, চড়া সুদে ধারও নিতে হয়নি। ঘটনাটা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- ইনভেস্টমেন্টকে সময় দিতে: শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডের দাম পড়ে থাকা অবস্থায় টাকা তুলতে হলে লোকসান পাকা হয়ে যায়। ইমার্জেন্সি ফান্ড থাকলে সেই চাপ থাকে না।
- মেয়াদি সঞ্চয় না ভাঙাতে: এফডিআর বা সঞ্চয়পত্র মেয়াদের আগে ভাঙালে মুনাফা অনেক কমে যায়।
- চড়া সুদের ধার এড়াতে: হাতে টাকা না থাকলে মানুষ ক্রেডিট কার্ড বা অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে চড়া সুদে ধার করে, আর সেই ধার পরে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
- ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে: পেছনে একটা নিরাপত্তা থাকলে বাজার পড়লে ভয়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঝোঁক কমে।
কোন খরচগুলো গুনবেন
হিসাবটা আপনার পুরো খরচ দিয়ে নয়, জরুরি খরচ দিয়ে। মানে যে খরচগুলো আয় বন্ধ হলেও থামানো যায় না: বাসা ভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির বিল, যাতায়াত, ওষুধ, সন্তানের স্কুলের বেতন, আর চলমান লোনের কিস্তি (EMI)। রেস্টুরেন্ট, শপিং বা বেড়ানোর খরচ বিপদের সময় কমিয়ে ফেলা যায়, তাই এগুলো বাদ।
এই হিসাবের জন্য দু-তিন মাস নিজের খরচ লিখে রাখাটা সবচেয়ে কাজে দেয়। অনুমানে বসালে জরুরি খরচ সাধারণত কম ধরা হয়।
কার বেশি লাগে, কার কম
- বেশি লাগতে পারে: যাঁদের আয় অনিয়মিত (ব্যবসায়ী, ফ্রিল্যান্সার, কমিশনভিত্তিক কাজ), যাঁরা পুরো পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, যাঁদের ওপর বাবা-মা বা সন্তান নির্ভরশীল, আর যাঁদের পরিবারে নিয়মিত চিকিৎসার খরচ আছে।
- কম হলেও চলতে পারে: যাঁদের চাকরি তুলনামূলক নিশ্চিত, পরিবারে একাধিক উপার্জনকারী আছেন, বা নির্ভরশীল কেউ নেই।
- বাংলাদেশে বাড়তি কারণ: এখানে সাধারণ বেকার বীমা নেই; চাকরি গেলে শ্রম আইনের ক্ষতিপূরণ ছাড়া সরকারি কোনো নিয়মিত সহায়তা পাওয়া যায় না। বিবিএস ও আইএলওর তথ্যে, কর্মজীবীদের ৮০%-এর বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে সেই ক্ষতিপূরণও প্রায়ই মেলে না।
একবারে নয়, ধাপে ধাপে
৬ মাসের খরচ একসঙ্গে জমানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়, আর সেটা জরুরিও নয়। প্রথমে ছোট একটা লক্ষ্য ঠিক করা যায়, যেমন এক মাসের খরচ। তারপর তিন মাস, তারপর ছয় মাস। প্রতি মাসে বেতন আসার দিনই একটা নির্দিষ্ট অঙ্ক আলাদা করে ফেললে ফান্ডটা নিজে থেকেই বাড়তে থাকে।
ফান্ড থেকে টাকা খরচ হলে সেটা আবার পূরণ করাই পরের কাজ। আর আয়, পরিবার বা খরচ বদলালে লক্ষ্যটাও নতুন করে হিসাব করা দরকার; বিয়ে, সন্তান বা বাসা বদল এগুলোর মধ্যে পড়ে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক মাসের জরুরি খরচ: বাসা ভাড়া ১৫,০০০, বাজার ১২,০০০, বিল ৩,০০০, যাতায়াত ৩,০০০, ওষুধ ২,০০০ আর লোনের কিস্তি ৫,০০০ টাকা। মোট ৪০,০০০ টাকা।
- ৩ মাসের লক্ষ্য: ৪০,০০০ × ৩ = ১,২০,০০০ টাকা। ৬ মাসের লক্ষ্য: ৪০,০০০ × ৬ = ২,৪০,০০০ টাকা।
- প্রতি মাসে ৮,০০০ টাকা আলাদা করলে ৩ মাসের লক্ষ্যে পৌঁছাতে লাগবে ১৫ মাস (১,২০,০০০ ÷ ৮,০০০), ৬ মাসের লক্ষ্যে ৩০ মাস।
ফল: লক্ষ্যটা বড় দেখালেও মাসে মাসে ভাগ করলে সেটা হাতের নাগালে আসে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র; নিজের জরুরি খরচ দিয়ে হিসাবটা করুন।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- পুরো খরচ না গুনে আন্দাজে একটা অঙ্ক ধরা, ফলে ফান্ড প্রয়োজনের চেয়ে ছোট হওয়া।
- ইমার্জেন্সি ফান্ডকে কেনাকাটা বা বেড়ানোর টাকা হিসেবে ব্যবহার করা, তারপর আর পূরণ না করা।
- "৬ মাস জমাতে পারব না" ভেবে একেবারেই শুরু না করা। এক মাসের খরচও কিছু না থাকার চেয়ে অনেক ভালো।
- আয় বা পরিবারের দায়িত্ব বাড়লেও বছরের পর বছর একই লক্ষ্য রেখে দেওয়া।
ইমার্জেন্সি ফান্ডের লক্ষ্য: জরুরি মাসিক খরচ × ৩ থেকে ৬ মাস। আয় যত অনিশ্চিত, আর আপনার ওপর যত মানুষ নির্ভরশীল, লক্ষ্য তত বড়।