BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

বাবল ও ক্র্যাশ

বাবল হলো যখন কোনো কিছুর দাম তার আসল মূল্যের চেয়ে অনেক ওপরে উঠে যায়, শুধু এই আশায় যে কেউ আরও বেশি দামে কিনবে। ক্র্যাশ হলো সেই বাবল ফেটে দাম হঠাৎ অনেকটা পড়ে যাওয়া।

ভিডিও আসছে
বাবল ও ক্র্যাশ: দাম যখন বাস্তব ছেড়ে আকাশে ওঠে

বাবল ও ক্র্যাশ কী

স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো শেয়ার, জমি বা অন্য সম্পদের দাম মোটামুটি তার আয় বা ব্যবহারের মূল্যের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলে। বাবলে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। মানুষ আর জিজ্ঞেস করে না "এটা থেকে কত আয় হবে", জিজ্ঞেস করে "কাল কত দামে বেচতে পারব"। দাম বাড়ে কারণ দাম বাড়ছে।

এই চক্র চিরকাল চলতে পারে না, কারণ একসময় নতুন ক্রেতা ফুরিয়ে আসে। তখন কিছু মানুষ বেচতে শুরু করে, দাম পড়ে, ভয় ছড়ায়, আর সবাই একসঙ্গে বেরোতে চায়। এটাই ক্র্যাশ। বাবল সাধারণত ধীরে ধীরে, মাস বা বছর ধরে ফোলে, কিন্তু ফাটে অনেক দ্রুত।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক এক এলাকায় নতুন রাস্তা হবে শুনে জমির দাম বাড়তে শুরু করল। প্রথমে কারণটা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু এরপর মানুষ শুধু এই জন্য জমি কিনতে লাগল যে পরের মাসে আরও দামে বেচবে। কেউ বাড়ি বানাচ্ছে না, শুধু হাতবদল হচ্ছে, আর দাম তিন বছরে চার গুণ। তারপর একদিন শোনা গেল রাস্তার কাজ পিছিয়েছে, ক্রেতারা উধাও, আর যিনি সবশেষে কিনেছিলেন তিনি বেচতেই পারছেন না। ঘটনাটা কাল্পনিক।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শেষে যাঁরা ঢোকেন: বাবলের শেষ দিকে দাম সবচেয়ে বেশি, আর তখনই নতুন ইনভেস্টর সবচেয়ে বেশি আসে।
  • বড় পতন থেকে ফেরা খুব কঠিন: দাম অর্ধেক হলে আগের জায়গায় ফিরতে দ্বিগুণ হতে হয়।
  • ধার করে কিনলে ক্ষতি বহুগুণ: পতনের সময় ঋণের টাকা ফেরত দিতে হয়, দাম যাই হোক।
  • ইতিহাস বারবার ফেরে: প্রযুক্তি, জমি, শেয়ার, কয়েন, পণ্য বদলায়, কিন্তু মানুষের আচরণের ধরন প্রায় একই থাকে।

বাবল সাধারণত কোন ধাপে চলে

অর্থনীতিবিদ হাইম্যান মিনস্কির ধারণা থেকে ইতিহাসবিদ চার্লস কিন্ডলবার্গার তাঁর বই "Manias, Panics, and Crashes"-এ বাবলের কয়েকটা সাধারণ ধাপ বর্ণনা করেছেন। প্রতিটা বাবল হুবহু এক নয়, তবে ধরনটা প্রায়ই মেলে।

  • শুরুর গল্প: নতুন প্রযুক্তি, নতুন নীতি বা নতুন সুযোগ, যা নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সত্যিকারের কারণ থাকে।
  • উত্থান: দাম বাড়ে, ধার সহজ হয়, খবরে-আলোচনায় বিষয়টা জায়গা পায়।
  • উন্মাদনা: "এবার সব আলাদা" কথাটা শোনা যায়, আগে কখনো ইনভেস্ট করেননি এমন মানুষও ঢোকেন, দামের সঙ্গে আয়ের সম্পর্ক কেউ দেখে না।
  • অস্বস্তি ও আতঙ্ক: অভিজ্ঞরা চুপচাপ বেচতে শুরু করেন, দাম থমকে যায়, তারপর হঠাৎ পতন আর সবাই একসঙ্গে বেরোতে চায়।

বাংলাদেশে দুটো বড় উদাহরণ

১৯৯৬: দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তখনকার শেয়ার প্রাইস ইনডেক্স ৫ নভেম্বর ১৯৯৬ তারিখে ৩,৬৪৮.৭৫ পয়েন্টে ওঠে। পরের দিন থেকেই পতন শুরু হয়, আর মে ১৯৯৯-এ সূচক নামে ৪৬২ পয়েন্টে, অর্থাৎ চূড়া থেকে প্রায় ৮৭% নিচে।

২০১০: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ সূচক (ডিজেন) ৫ ডিসেম্বর ২০১০ তারিখে ৮,৯১৮.৫১ পয়েন্টের রেকর্ডে ওঠে। ১৯ ডিসেম্বর এক দিনেই সূচক প্রায় ৬.৭২% পড়ে, আর ফেব্রুয়ারি ২০১১-এর শুরুর মধ্যে চূড়া থেকে ২৪%-এর বেশি নেমে যায়। শুধু ২০১০ সালেই প্রায় ১৫ লাখ নতুন ইনভেস্টর বাজারে ঢুকেছিলেন, অনেকে ধার করে।

বিশ্বে: ডট-কম বাবল

১৯৯০-এর দশকের শেষে ইন্টারনেট কোম্পানিগুলো নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রচণ্ড উত্তেজনা ছিল। অনেক কোম্পানির লাভ তো দূরের কথা, ঠিকমতো আয়ও ছিল না, তবু নামের সঙ্গে ".com" থাকলেই দাম বাড়ত। আমেরিকার প্রযুক্তি-প্রধান সূচক ন্যাসড্যাক ১০ মার্চ ২০০০ তারিখে প্রায় ৫,০৪৯ পয়েন্টে বন্ধ হয়, তারপর ৯ অক্টোবর ২০০২-এ নামে প্রায় ১,১১৪ পয়েন্টে, প্রায় ৭৮% পতন।

মজার ব্যাপার হলো, ইন্টারনেট নিয়ে আশাটা ভুল ছিল না; ইন্টারনেট সত্যিই পৃথিবী বদলে দিয়েছে। ভুল ছিল দামে। একটা প্রযুক্তি ভালো হওয়া আর তার শেয়ার যেকোনো দামে কেনার মতো হওয়া, এক কথা নয়।

চূড়া থেকে কতটা পড়েছিলইনডেক্সের পতন, চূড়া থেকে নিচ পর্যন্ত
ডিএসই, নভেম্বর ১৯৯৬ – মে ১৯৯৯
৮৭%
ন্যাসড্যাক, মার্চ ২০০০ – অক্টোবর ২০০২
৭৮%
ডিএসই, ডিসেম্বর ২০১০ – ফেব্রুয়ারি ২০১১ (প্রথম দুই মাস)
২৪%

সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার (২০১৫), আল জাজিরা (ফেব্রুয়ারি ২০১১), উইকিপিডিয়া (ন্যাসড্যাক); বিস্তারিত নিচের সূত্রে

সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
পতন
ডিএসই, নভেম্বর ১৯৯৬ – মে ১৯৯৯৮৭%
ন্যাসড্যাক, মার্চ ২০০০ – অক্টোবর ২০০২৭৮%
ডিএসই, ডিসেম্বর ২০১০ – ফেব্রুয়ারি ২০১১ (প্রথম দুই মাস)২৪%

হাতে-কলমে হিসাব

পতন থেকে ফেরার অঙ্ক (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক আপনার ইনভেস্টমেন্টের মূল্য ১,০০,০০০ টাকা। ২০% পড়লে থাকে ৮০,০০০ টাকা। আগের জায়গায় ফিরতে ৮০,০০০ থেকে ২০,০০০ বাড়তে হবে: ২৫% বৃদ্ধি।
  2. ৫০% পড়লে থাকে ৫০,০০০ টাকা। ফিরতে দ্বিগুণ হতে হবে: ১০০% বৃদ্ধি।
  3. ১৯৯৬-এর মতো প্রায় ৮৭% পড়লে থাকে মাত্র প্রায় ১৩,০০০ টাকা। ফিরতে প্রায় ৭.৭ গুণ হতে হবে: প্রায় ৬৭০% বৃদ্ধি।

ফল: পতন যত বড়, ফিরে আসতে তার চেয়ে অনেক বেশি শতাংশ বৃদ্ধি লাগে, আর অনেক বছরও লাগতে পারে। এজন্যই বাবলের চূড়ায় সব টাকা এক জায়গায় রাখা এত ঝুঁকির। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যত পড়ে, ফিরতে তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়তে হয়পতনের পর আগের জায়গায় ফিরতে যত শতাংশ বাড়তে হবে
২০% পতন
২০%
২৫%
৫০% পতন
৫০%
১০০%
৮৭% পতন
৮৭%
৬৭০%
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
পতনফিরতে যত বাড়তে হবে
২০% পতন২০%২৫%
৫০% পতন৫০%১০০%
৮৭% পতন৮৭%৬৭০%

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • "এবার সব আলাদা" কথাটা যাচাই না করেই বিশ্বাস করা।
  • শুধু দাম বাড়ছে বলে কেনা, আয় বা আসল মূল্যের সঙ্গে দাম মিলিয়ে না দেখা।
  • বাবলের সময় ধার করে বা সব সঞ্চয় এক জায়গায় দিয়ে ইনভেস্ট করা।
  • ধরে নেওয়া যে "পড়া শুরু হলেই আমি সময়মতো বেরিয়ে যাব"। ক্র্যাশে সবাই একসঙ্গে বেরোতে চায়, আর ক্রেতা পাওয়া কঠিন হয়।
মনে রাখুন

দাম বাড়ছে বলেই কিনবেন না। বাবল ধীরে ফোলে, দ্রুত ফাটে, আর বড় পতন থেকে ফিরতে পতনের চেয়ে অনেক বড় বৃদ্ধি লাগে।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
১৯৯৬: সূচক ৫ নভেম্বর ১৯৯৬-এ ৩,৬৪৮.৭৫ পয়েন্ট, মে ১৯৯৯-এ ৪৬২ পয়েন্ট: দ্য ডেইলি স্টার, "Tribunal moves on 1996 stock scam", ৫ আগস্ট ২০১৫, দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
২০১০: ডিজেন ৫ ডিসেম্বর ২০১০-এ ৮,৯১৮.৫১ পয়েন্ট, ফেব্রুয়ারি ২০১১-এর শুরুতে চূড়া থেকে ২৪%-এর বেশি নিচে: আল জাজিরা, "Bangladeshis angry over stock slump", ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১১, দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
১৯ ডিসেম্বর ২০১০-এ ডিজেন ৬.৭২% পতন ও ২০১০ সালে প্রায় ১৫ লাখ নতুন ইনভেস্টর: দ্য ডেইলি স্টার (স্টার উইকেন্ড ম্যাগাজিন), কভার স্টোরি, ৩ জানুয়ারি ২০১১, দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
ন্যাসড্যাক ১০ মার্চ ২০০০-এ ৫,০৪৮.৬২ (ক্লোজিং), ৯ অক্টোবর ২০০২-এ ১,১১৪.১১; পতন প্রায় ৭৮% (আমাদের হিসাব): উইকিপিডিয়া, "Stock market downturn of 2002", দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
বাবলের ধাপ: Charles P. Kindleberger, "Manias, Panics, and Crashes: A History of Financial Crises" (প্রথম প্রকাশ ১৯৭৮), হাইম্যান মিনস্কির ধারণার ভিত্তিতে
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।