রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানিং কী
রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানিং মানে হিসাব করা যে অবসরের পরে মাসে কত টাকা লাগবে, কত বছর ধরে লাগবে, আর সেই টাকা কোথা থেকে আসবে; তারপর কাজের বছরগুলোতে নিয়মিত সেই অনুযায়ী জমানো ও ইনভেস্ট করা। সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন থাকলেও বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা বা স্বনিযুক্ত পেশার অনেক মানুষের জন্য অবসরের আয়ের কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা নেই।
বাংলাদেশে অনেক পরিবারে বয়স্ক মা-বাবার দেখাশোনা সন্তানেরা করেন, আর এটা আমাদের সংস্কৃতির সুন্দর দিক। তবে সন্তানদেরও নিজেদের সংসার, সন্তান আর খরচ থাকে। নিজের অবসরের টাকা নিজে জোগাড় রাখলে আপনি স্বাধীন থাকেন, আর পরের প্রজন্মের ওপর চাপও কমে।
ধরা যাক আজ ৩০ বছর বয়সী জামিলের পরিবারের মাসিক খরচ ৩০,০০০ টাকা। দাম যদি বছরে গড়ে ৭% করে বাড়ে, ৩০ বছর পরে, তাঁর ৬০ বছর বয়সে, একই জীবনযাত্রার জন্য মাসে লাগবে প্রায় ২,২৮,০০০ টাকা। অবসরের হিসাব আজকের ৩০,০০০ টাকা ধরে করলে তিনি প্রয়োজনের অনেক কম জমাবেন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- সময়ের শক্তি কাজে লাগাতে: অবসর ২০–৩৫ বছর দূরে থাকলে কম্পাউন্ডিং কাজ করার সময় পায়। দেরিতে শুরু করলে একই লক্ষ্যে পৌঁছাতে মাসে অনেক বেশি জমাতে হয়।
- ইনফ্লেশনের হিসাব মাথায় রাখতে: অবসরের খরচ আজকের দামে নয়, ভবিষ্যতের দামে লাগবে; আর অবসরের বছরগুলোতেও দাম বাড়তে থাকবে।
- ঝুঁকি ধাপে ধাপে বদলাতে: অবসর দূরে থাকলে মাঝপথের ওঠানামা সামলানোর সময় থাকে; অবসর কাছে এলে টাকা সাধারণত বেশি স্থিতিশীল জায়গায় সরানোর কথা ভাবা হয়।
- অন্য গোলের সঙ্গে ভারসাম্য রাখতে: সন্তানের পড়াশোনা বা বাড়ির জন্য লোন পাওয়া যায়, অবসরের জন্য কোনো লোন নেই।
অবসর এখন আগের চেয়ে লম্বা
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশে জন্মের সময় গড় প্রত্যাশিত আয়ু ২০০০ সালে ছিল প্রায় ৬২ বছর, আর ২০২৪ সালে প্রায় ৭৫ বছর। যাঁরা ৬০ বছর পর্যন্ত বাঁচেন, তাঁরা সাধারণত এই গড়ের চেয়েও বেশি দিন বাঁচেন, কারণ জন্মের সময়ের গড়ে শিশুমৃত্যুর হিসাবও ঢোকে।
মানে, ৬০ বছরে কাজ থামালে ২০ বছর বা তার বেশি সময়ের খরচ চালানোর পরিকল্পনা করা বুদ্ধিমানের কাজ। এর মধ্যে বয়সের সঙ্গে চিকিৎসার খরচও সাধারণত বাড়ে।
সূত্র: বিশ্বব্যাংক
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| গড় আয়ু | |
|---|---|
| ২০০০ | ৬২ বছর |
| ২০২৪ | ৭৫ বছর |
অবসরের আয় কোথা থেকে আসতে পারে
- চাকরির সুবিধা: সরকারি পেনশন (সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য), আর অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি। এগুলো কতটা আছে, চাকরির শর্তে দেখে নিন।
- সর্বজনীন পেনশন স্কিম: আগস্ট ২০২৩-এ চালু হওয়া এই সরকারি ব্যবস্থায় কাজের বয়সে চাঁদা দিলে ৬০ বছর বয়স থেকে আজীবন মাসিক পেনশন পাওয়া যায়।
- নিজের সঞ্চয় ও ইনভেস্টমেন্ট: কাজের বছরগুলোতে নিয়মিত জমানো আর ইনভেস্ট করা টাকা, যা অবসরে ধীরে ধীরে খরচ করা হয়।
- অন্যান্য উৎস: বাড়ি ভাড়া, ছোট ব্যবসা বা খণ্ডকালীন কাজ, আর পরিবারের সহায়তা। এগুলোর ওপর পুরোপুরি ভরসা না করাই নিরাপদ।
পরিকল্পনার তিনটা ধাপ
- খরচ আঁচ করুন: আজকের মাসিক খরচ থেকে শুরু করে ইনফ্লেশন ধরে অবসরের বছরের খরচ হিসাব করুন। বাসা নিজের হলে বা সন্তান স্বাবলম্বী হলে কিছু খরচ কমতে পারে, চিকিৎসার খরচ বাড়তে পারে।
- ঘাটতি বের করুন: পেনশন বা অন্য নিশ্চিত আয় থেকে কতটা আসবে, আর বাকিটা নিজের সঞ্চয় থেকে কত লাগবে।
- আগে শুরু করুন, নিয়মিত দেখুন: অল্প অঙ্কে হলেও শুরু করুন, আয় বাড়লে জমার অঙ্ক বাড়ান, আর কয়েক বছর পর পর পরিকল্পনা মিলিয়ে দেখুন।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক দুজন মানুষ মাসে ৩,০০০ টাকা করে জমান, আর জমানো টাকায় বছরে গড়ে ৮% রিটার্ন আসে (মাসিক কম্পাউন্ডিং)। দুজনেই থামেন ৬০ বছরে।
- প্রথমজন শুরু করেন ২৫ বছরে: ৩৫ বছরে নিজের পকেট থেকে দেন ১২,৬০,০০০ টাকা। ৬০ বছরে জমে প্রায় ৬৮,৮০,০০০ টাকা।
- দ্বিতীয়জন শুরু করেন ৩৫ বছরে: ২৫ বছরে দেন ৯,০০,০০০ টাকা। ৬০ বছরে জমে প্রায় ২৮,৫০,০০০ টাকা।
ফল: মাত্র ৩,৬০,০০০ টাকা বেশি জমা দিয়ে প্রথমজনের হাতে আসে প্রায় ৪০ লাখ টাকা বেশি; বাড়তি ১০ বছর কম্পাউন্ডিংয়ের ফল। রিটার্ন বাস্তবে ওঠানামা করে, আর ইনফ্লেশন এই টাকার কেনার ক্ষমতা কমাবে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
বয়স
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| ২৫ বছরে শুরু | ৩৫ বছরে শুরু | |
|---|---|---|
| ২৫ | ০ লাখ | ০ লাখ |
| ২৬ | ০.৪ লাখ | ০ লাখ |
| ২৭ | ০.৮ লাখ | ০ লাখ |
| ২৮ | ১.২ লাখ | ০ লাখ |
| ২৯ | ১.৭ লাখ | ০ লাখ |
| ৩০ | ২.২ লাখ | ০ লাখ |
| ৩১ | ২.৮ লাখ | ০ লাখ |
| ৩২ | ৩.৪ লাখ | ০ লাখ |
| ৩৩ | ৪ লাখ | ০ লাখ |
| ৩৪ | ৪.৭ লাখ | ০ লাখ |
| ৩৫ | ৫.৫ লাখ | ০ লাখ |
| ৩৬ | ৬.৩ লাখ | ০.৪ লাখ |
| ৩৭ | ৭.২ লাখ | ০.৮ লাখ |
| ৩৮ | ৮.২ লাখ | ১.২ লাখ |
| ৩৯ | ৯.২ লাখ | ১.৭ লাখ |
| ৪০ | ১০.৪ লাখ | ২.২ লাখ |
| ৪১ | ১১.৬ লাখ | ২.৮ লাখ |
| ৪২ | ১৩ লাখ | ৩.৪ লাখ |
| ৪৩ | ১৪.৪ লাখ | ৪ লাখ |
| ৪৪ | ১৬ লাখ | ৪.৭ লাখ |
| ৪৫ | ১৭.৭ লাখ | ৫.৫ লাখ |
| ৪৬ | ১৯.৫ লাখ | ৬.৩ লাখ |
| ৪৭ | ২১.৫ লাখ | ৭.২ লাখ |
| ৪৮ | ২৩.৭ লাখ | ৮.২ লাখ |
| ৪৯ | ২৬ লাখ | ৯.২ লাখ |
| ৫০ | ২৮.৫ লাখ | ১০.৪ লাখ |
| ৫১ | ৩১.৩ লাখ | ১১.৬ লাখ |
| ৫২ | ৩৪.২ লাখ | ১৩ লাখ |
| ৫৩ | ৩৭.৫ লাখ | ১৪.৪ লাখ |
| ৫৪ | ৪০.৯ লাখ | ১৬ লাখ |
| ৫৫ | ৪৪.৭ লাখ | ১৭.৭ লাখ |
| ৫৬ | ৪৮.৮ লাখ | ১৯.৫ লাখ |
| ৫৭ | ৫৩.২ লাখ | ২১.৫ লাখ |
| ৫৮ | ৫৮ লাখ | ২৩.৭ লাখ |
| ৫৯ | ৬৩.২ লাখ | ২৬ লাখ |
| ৬০ | ৬৮.৮ লাখ | ২৮.৫ লাখ |
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "এখনো অনেক সময় আছে" ভেবে বছরের পর বছর শুরু না করা। দেরির প্রতিটা বছর পরে মাসিক জমার অঙ্ক বাড়িয়ে দেয়।
- অবসরের খরচ আজকের দামে হিসাব করা, আর অবসরের বছরগুলোতে চিকিৎসার খরচ ভুলে যাওয়া।
- চাকরি বদলের সময় প্রভিডেন্ট ফান্ড বা অবসরের জন্য রাখা টাকা তুলে অন্য খরচে লাগিয়ে ফেলা।
- অবসরের ঠিক আগে পুরো সঞ্চয় এমন কিছুতে দেওয়া যার রিস্ক ভালো করে বোঝা হয়নি, বা যা "নিশ্চিত বড় লাভ"-এর প্রতিশ্রুতি দেয়।
অবসরের পরিকল্পনায় সবচেয়ে দামি জিনিস সময়: অল্প অঙ্কে হলেও আগে শুরু করুন, আর খরচ হিসাব করুন ভবিষ্যতের দামে।