EMI কী
EMI মানে ইকুয়েটেড মান্থলি ইনস্টলমেন্ট, অর্থাৎ সমান মাসিক কিস্তি। লোনের অঙ্ক, সুদের হার আর মেয়াদ থেকে একটা নির্দিষ্ট মাসিক অঙ্ক বের করা হয়, যা প্রতি মাসে দিলে মেয়াদ শেষে সুদসহ পুরো লোন শোধ হয়ে যায়। বাড়ি, গাড়ি, পার্সোনাল লোন, এমনকি কার্ডে কেনা ফ্রিজ বা ফোন, সবখানেই এই পদ্ধতি।
কিস্তি সমান থাকলেও ভেতরের ভাগ বদলায়। শুরুর দিকে কিস্তির বড় অংশ যায় সুদে, কারণ তখন বাকি লোন বেশি। সময়ের সঙ্গে বাকি কমে, সুদের অংশ কমে, আর আসল শোধের অংশ বাড়ে।
ধরা যাক জামিল একটা মোটরসাইকেলের জন্য লোন নিলেন। দোকানে বলা হলো "মাত্র ৫,০০০ টাকা মাসে"। তিনি শুধু এই অঙ্কটাই দেখলেন। পরে হিসাব করে দেখলেন, ৩৬ মাসে মোট দিচ্ছেন ১,৮০,০০০ টাকা, যেখানে মোটরসাইকেলের নগদ দাম ছিল ১,৪০,০০০ টাকা। পার্থক্যের ৪০,০০০ টাকাই লোনের আসল খরচ। ঘটনা ও সংখ্যা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- আসল খরচ মাপতে: মাসিক কিস্তি নয়, মোট ফেরত দেওয়া টাকা থেকে লোনের অঙ্ক বাদ দিলে যা থাকে, সেটাই লোনের খরচ।
- দুটো অফার ঠিকভাবে তুলনা করতে: একই "১২%" ফ্ল্যাট রেটে না রিডিউসিং ব্যালান্সে, তার ওপর মোট খরচ প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
- মেয়াদের ফাঁদ বুঝতে: মেয়াদ বাড়ালে কিস্তি কমে, কিন্তু মোট সুদ বাড়ে।
- ভবিষ্যতের আয় বাঁধা পড়ার মাপ বুঝতে: প্রতিটি EMI কয়েক বছরের জন্য মাসিক আয়ের একটা অংশ আটকে দেয়, যা সঞ্চয় বা ইনভেস্টমেন্টে যেতে পারত।
ফ্ল্যাট রেট বনাম রিডিউসিং ব্যালান্স
রিডিউসিং ব্যালান্স পদ্ধতিতে প্রতি মাসে সুদ গোনা হয় শুধু তখনো বাকি থাকা টাকার ওপর। কিস্তি দিতে দিতে বাকি কমে, তাই সুদও কমে। ব্যাংক লোনে সাধারণত এই পদ্ধতিই ব্যবহার হয়।
ফ্ল্যাট রেট পদ্ধতিতে পুরো মেয়াদের সুদ গোনা হয় শুরুর লোনের পুরো অঙ্কের ওপর, যদিও আপনি প্রতি মাসে আসল ফেরত দিচ্ছেন। তাই একই সংখ্যার হার হলেও ফ্ল্যাট রেটে আসল খরচ অনেক বেশি। দোকানের কিস্তি বা অনানুষ্ঠানিক ধারে প্রায়ই এভাবে হিসাব হয়; হারটা কোন পদ্ধতিতে, তা লিখিতভাবে জেনে নেওয়া জরুরি।
সুদের বাইরের খরচ
লোনের মোট খরচে সুদ ছাড়াও থাকে প্রসেসিং ফি, ডকুমেন্টেশন বা স্ট্যাম্প চার্জ, কখনো বাধ্যতামূলক ইন্স্যুরেন্স, আর ফির ওপর ভ্যাট। কিস্তি দেরি হলে লেট ফি, আর মেয়াদের আগে পুরো লোন শোধ করলে আগাম শোধের ফি লাগতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালে ব্যাংকের কিছু চার্জে সীমা দেয়: ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত লোনে প্রসেসিং ফি সর্বোচ্চ ০.৫% (সর্বোচ্চ ১৫,০০০ টাকা), আর আগাম শোধের ফি বাকি অঙ্কের সর্বোচ্চ ০.৫%। এই সীমাগুলো বদলাতে পারে, আর ব্যাংকের বাইরের ঋণদাতাদের নিয়ম আলাদা।
সুদের হার বদলালে
অনেক লোনের সুদের হার পরিবর্তনশীল: বাজারে সুদ বাড়লে লোনের হারও বাড়ে। জুলাই ২০২৩-এ ৯%-এর সীমা উঠে যাওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে লেন্ডিং রেট বাজারভিত্তিক, আর সেই সময় থেকে হার বেড়েছে। হার বাড়লে হয় EMI বাড়ে, নয়তো মেয়াদ লম্বা হয়; দুই ক্ষেত্রেই মোট খরচ বাড়ে।
- লোন নেওয়ার আগে জানা দরকার: হার স্থির না পরিবর্তনশীল, কত দিন পরপর বদলাতে পারে, আর বদলালে EMI বাড়বে না মেয়াদ।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ২,০০,০০০ টাকা লোন, মেয়াদ ২৪ মাস, হার বছরে ১২%।
- রিডিউসিং ব্যালান্সে: মাসিক হার ১%। EMI প্রায় ৯,৪১৫ টাকা; ২৪ মাসে মোট প্রায় ২,২৫,৯৫০ টাকা। সুদ প্রায় ২৫,৯৫০ টাকা।
- ফ্ল্যাট রেটে: সুদ = ২,০০,০০০ × ১২% × ২ বছর = ৪৮,০০০ টাকা। মোট ২,৪৮,০০০ টাকা, EMI প্রায় ১০,৩৩৩ টাকা।
- ফ্ল্যাট রেটের এই কিস্তিকে রিডিউসিং ব্যালান্সের ভাষায় আনলে হার দাঁড়ায় বছরে প্রায় ২১.৬%। এর ওপর ১,০০০ টাকা প্রসেসিং ফি থাকলে রিডিউসিং লোনের খরচও প্রায় ১২.৫%-এ ওঠে।
ফল: দুটোতেই লেখা "১২%", কিন্তু ফ্ল্যাট রেটে সুদ প্রায় ২২,০০০ টাকা বেশি। হারের সংখ্যা নয়, মোট ফেরত দেওয়া টাকা তুলনা করুন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র; নিজের হিসাব করতে টাকার সময়-মূল্য ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা যায়।
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| মোট সুদ | |
|---|---|
| রিডিউসিং ব্যালান্স | ২৫,৯৫০ টাকা |
| ফ্ল্যাট রেট | ৪৮,০০০ টাকা |
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু মাসিক কিস্তি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া, মোট ফেরত দেওয়া টাকা না দেখা।
- ফ্ল্যাট রেট আর রিডিউসিং ব্যালান্সের হারকে একই মনে করা।
- কিস্তি কমাতে মেয়াদ বাড়ানো, মোট সুদ কতটা বাড়ল তা না দেখে।
- প্রসেসিং ফি, ইন্স্যুরেন্স, আগাম শোধের ফি আর হার বদলানোর শর্ত না পড়ে সই করা।
লোনের আসল খরচ = মোট যা ফেরত দেবেন (সব কিস্তি ও ফি) − যা ধার নিয়েছেন। কিস্তি নয়, এই সংখ্যাটাই তুলনা করুন।