ইপিএস ও পি/ই কী
ইপিএস (আর্নিংস পার শেয়ার) = সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের নিট প্রফিট ÷ শেয়ার সংখ্যা। বছরের মাঝখানে নতুন শেয়ার এলে বছরজুড়ে গড় শেয়ার সংখ্যা (ওয়েটেড অ্যাভারেজ) ধরা হয়। আন্তর্জাতিক মান আইএএস ৩৩ অনুযায়ী তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে ইনকাম স্টেটমেন্টেই ইপিএস দেখাতে হয়।
পি/ই (প্রাইস-টু-আর্নিংস) = শেয়ারের বাজারদর ÷ ইপিএস। পি/ই ১৫ মানে, এখনকার লাভ একই থাকলে শেয়ারের দামের সমান লাভ জমতে ১৫ বছর লাগবে। উল্টো করে দেখলে, ইপিএস ÷ দাম হলো আর্নিংস ইল্ড: পি/ই ১৫ হলে আর্নিংস ইল্ড প্রায় ৬.৭%।
ধরা যাক পাড়ার একটা ফার্মেসি বিক্রি হচ্ছে ২০ লাখ টাকায়, আর বছরে খরচ বাদে লাভ হয় ২ লাখ টাকা। দাম লাভের ১০ গুণ, মানে পি/ই ১০। পাশের আরেকটা ফার্মেসির দাম ৩০ লাখ, লাভ একই ২ লাখ: পি/ই ১৫। দ্বিতীয়টা কি "দামি"? হয়তো, অথবা হয়তো তার পাশে নতুন হাসপাতাল হচ্ছে আর লাভ বাড়বে বলে ক্রেতারা আশা করছেন। পি/ই একা উত্তর দেয় না, প্রশ্ন তোলে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- ভিন্ন দামের শেয়ার তুলনা করতে: ৫০০ টাকার শেয়ার ৫০ টাকার শেয়ারের চেয়ে "দামি" নয়; দেখতে হয় প্রতি টাকা লাভের জন্য কত দিচ্ছেন।
- বাজারের প্রত্যাশা বুঝতে: বেশি পি/ই সাধারণত মানে বাজার ভবিষ্যতে বেশি লাভ আশা করছে; কম পি/ই মানে বাজার সন্দেহ করছে, বা শেয়ারটা উপেক্ষিত।
- ইপিএস কয়েক বছর ধরে বাড়ছে কি না, সেটা কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মূল্য তৈরির একটা সহজ মাপকাঠি।
- নিয়মেও ব্যবহার হয়: বিএসইসির মার্জিন রুলস ২০২৫ অনুযায়ী, শেষ চার কোয়ার্টারের ইপিএস দিয়ে হিসাব করা পি/ই ৪০-এর বেশি হলে সেই শেয়ার কিনতে মার্জিন লোন পাওয়া যায় না। নিয়মটা বদলাতে পারে।
কোন ইপিএস দেখছেন?
- বার্ষিক বনাম কোয়ার্টারলি: তিন মাসের ইপিএস দিয়ে পি/ই করলে তা চার গুণ বড় দেখাবে। সাধারণত শেষ ১২ মাসের (চার কোয়ার্টার) বা সর্বশেষ নিরীক্ষিত বছরের ইপিএস ব্যবহার হয়। কোন ইপিএস ধরা হয়েছে, আগে দেখুন।
- বেসিক বনাম ডাইলুটেড: কনভার্টিবল বন্ড বা অপশন থেকে ভবিষ্যতে নতুন শেয়ার আসতে পারলে, সেগুলো ধরে হিসাব করা ইপিএস হলো ডাইলুটেড ইপিএস, যা বেসিকের সমান বা কম।
- বোনাস শেয়ারের পর রিস্টেটেড ইপিএস: বাংলাদেশে বোনাস (স্টক ডিভিডেন্ড) খুব প্রচলিত। বোনাসে শেয়ার বাড়লে আগের বছরগুলোর ইপিএসও নতুন শেয়ার সংখ্যায় আবার হিসাব করা হয়, যাতে তুলনা ঠিক থাকে। পুরোনো আর নতুন ইপিএস মিশিয়ে ফেললে মনে হতে পারে লাভ কমে গেছে।
পি/ই কী বলতে পারে না
পি/ই একটা সংক্ষিপ্ত রূপ, পুরো গল্প নয়। এতে দেনা ধরা নেই: একই পি/ই-র দুটো কোম্পানির একটার বিশাল লোন থাকতে পারে। এতে লাভের মান ধরা নেই: একবারের জমি বিক্রির লাভে ইপিএস ফুলে উঠলে পি/ই কৃত্রিমভাবে কম দেখাবে। আর লোকসানি কোম্পানির পি/ই অর্থহীন (নেগেটিভ), আবার লাভ খুব সামান্য হলে পি/ই কয়েকশো বা কয়েক হাজার হয়ে যেতে পারে।
তাই "পি/ই এত-র নিচে মানে সস্তা" বলে কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই। খাতভেদে পি/ই স্বাভাবিকভাবেই আলাদা হয়, আর একই কোম্পানির পি/ই সময়ের সঙ্গে সুদের হার আর বাজারের মেজাজে ওঠানামা করে। তুলনা সবচেয়ে অর্থবহ হয় একই খাতের কোম্পানির সঙ্গে, আর একই কোম্পানির নিজের অতীতের সঙ্গে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক কাল্পনিক "রূপসা ফুডস লিমিটেড"-এর নিট প্রফিট ৪৫ কোটি টাকা, শেয়ার ১০ কোটিটি। ইপিএস = ৪.৫০ টাকা।
- শেয়ারের দাম ৫৪ টাকা হলে পি/ই = ৫৪ ÷ ৪.৫০ = ১২। আর্নিংস ইল্ড = ৪.৫০ ÷ ৫৪ ≈ ৮.৩%।
- কিন্তু নোটে দেখা গেল, ৪৫ কোটির মধ্যে ১৫ কোটি এসেছে একবারের জমি বিক্রি থেকে। মূল ব্যবসার লাভ ৩০ কোটি, মূল ইপিএস ৩.০০ টাকা।
ফল: মূল ব্যবসার হিসাবে পি/ই = ৫৪ ÷ ৩ = ১৮, প্রথম দেখার ১২ নয়। একই দাম, একই কোম্পানি, অথচ লাভ কোথা থেকে এল তা দেখার পর ছবিটা আলাদা। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- কম পি/ই দেখলেই সস্তা আর বেশি পি/ই দেখলেই দামি ভাবা।
- এক কোয়ার্টারের ইপিএস দিয়ে পি/ই হিসাব করা, বা কোন ইপিএস ব্যবহার হয়েছে তা না দেখা।
- বোনাস শেয়ারের পর রিস্টেটেড না করা পুরোনো ইপিএসের সঙ্গে নতুন ইপিএস তুলনা করা।
- ভিন্ন খাতের কোম্পানির পি/ই সরাসরি তুলনা করা।
পি/ই বলে আপনি প্রতি টাকা লাভের জন্য কত দিচ্ছেন; সেটা ন্যায্য কি না বোঝার জন্য দেখতে হবে লাভটা কতটা টেকসই আর কতটা বাড়তে পারে।