সেভিংস রেট কী
সেভিংস রেট হলো আয়ের যে অংশ আপনি খরচ না করে ভবিষ্যতের জন্য রাখেন, তার শতাংশ। সূত্রটা সহজ: সেভিংস রেট = মাসের সঞ্চয় ÷ মাসের আয় × ১০০। ৪০,০০০ টাকা আয় থেকে ৬,০০০ টাকা জমালে হার ১৫%।
সঞ্চয় বলতে এখানে সব ধরনের ভবিষ্যতের জন্য রাখা টাকা: সেভিংস অ্যাকাউন্ট, ডিপিএস, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ডে নতুন টাকা, পেনশন স্কিমের চাঁদা। আয় হিসেবে সাধারণত হাতে পাওয়া আয় (কর ও কাটার পরে) ধরা হয়। যেভাবেই মাপুন, প্রতি মাসে একইভাবে মাপুন।
ধরা যাক সুমন আয় করেন ৮০,০০০ টাকা আর জমান ৮,০০০ টাকা; রুমানা আয় করেন ৩০,০০০ টাকা আর জমান ৬,০০০ টাকা। টাকার অঙ্কে সুমন বেশি জমান, কিন্তু সুমনের সেভিংস রেট ১০%, রুমানার ২০%। রুমানা তাঁর নিজের জীবনযাত্রার তুলনায় দ্বিগুণ দ্রুত কুশন তৈরি করছেন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- এটা পুরোপুরি আপনার হাতে: মার্কেটের রিটার্ন কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, কিন্তু আয়ের কত ভাগ জমাবেন তা আপনি ঠিক করেন।
- শুরুর বছরগুলোতে রিটার্নের চেয়ে বেশি প্রভাব: সঞ্চয় ছোট থাকলে ১-২% বাড়তি রিটার্নের চেয়ে প্রতি মাসে বাড়তি জমানো টাকা অনেক বেশি পার্থক্য আনে।
- দুই দিকে কাজ করে: হার বাড়ানো মানে বেশি জমানো আর একই সঙ্গে কম খরচে চলতে শেখা, তাই লক্ষ্য দুই দিক থেকেই কাছে আসে।
- কম্পাউন্ডিংয়ের জ্বালানি: কম্পাউন্ড হওয়ার জন্য আগে টাকা জমতে হবে; সেভিংস রেট সেই জ্বালানির প্রবাহ।
বাংলাদেশে পরিবারগুলো কতটা জমায়
বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ (হায়েস) ২০২২ অনুযায়ী, একটা পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২,৪২২ টাকা আর গড় খরচ ৩১,৫০০ টাকা। জরিপে গড় মাসিক সঞ্চয় এসেছে প্রায় ৯২৩ টাকা, মানে আয়ের প্রায় ৩%।
জরিপে মানুষ অনেক সময় আয় কম বলে, তাই আসল সঞ্চয় কিছুটা বেশি হতে পারে। তবু ছবিটা পরিষ্কার: খাবার আর মৌলিক খরচের পর অনেক পরিবারের হাতে খুব কম থাকে। এজন্যই ছোট হার দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে বাড়ানোটা বাস্তবসম্মত পথ।
সূত্র: বিবিএস, খানা আয়-ব্যয় জরিপ ২০২২ (প্রথম আলো ইংলিশ, ডিসেম্বর ২০২৩)
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| খরচ | সঞ্চয় | |
|---|---|---|
| প্রতি মাসে | ৩১,৫০০ | ৯২৩ |
কত হার "যথেষ্ট"?
একটা নির্দিষ্ট সঠিক হার নেই। ৫০/৩০/২০ নিয়মে ২০% সঞ্চয়ের কথা বলা হয়, কিন্তু সেটা সবার পক্ষে শুরুতেই সম্ভব নয়। কতটা দরকার, তা নির্ভর করে আপনার বয়স, লক্ষ্য, পরিবারের দায়িত্ব, আর পেনশন বা অন্য কোনো নিরাপত্তা আছে কি না তার ওপর। দেরিতে শুরু করলে বা লক্ষ্য বড় হলে বেশি হার লাগে।
- বেতন বাড়লে বাড়তি অংশের একটা ভাগ (ধরুন অর্ধেক) সরাসরি সঞ্চয়ে দিন। জীবনযাত্রা কমাতে হয় না, তবু হার বাড়ে।
- বোনাস, উৎসব ভাতা বা বড় রেমিট্যান্সের মতো এককালীন আয়ের একটা নির্দিষ্ট ভাগ সঞ্চয়ের জন্য আগে থেকে ঠিক করে রাখুন।
- বেতনের দিনই সঞ্চয় আলাদা করুন, মাস শেষে নয়। যা চোখের সামনে থাকে, তা খরচ হয়ে যায়।
হাতে-কলমে হিসাব
- আয় ৪০,০০০ টাকা। ১৫% হারে: সঞ্চয় ৬,০০০, খরচ ৩৪,০০০ টাকা। ছয় মাসের খরচ = ২,০৪,০০০ টাকা।
- ২,০৪,০০০ ÷ ৬,০০০ = ৩৪ মাস, প্রায় তিন বছর।
- ২৫% হারে: সঞ্চয় ১০,০০০, খরচ ৩০,০০০ টাকা। ছয় মাসের খরচ = ১,৮০,০০০ টাকা।
- ১,৮০,০০০ ÷ ১০,০০০ = ১৮ মাস, দেড় বছর।
ফল: হার ১৫% থেকে ২৫% করলে সময় প্রায় অর্ধেক হয়ে যায়, কারণ জমানো বাড়ে আর দরকারি কুশন ছোট হয়। ইন্টারেস্ট বা মুনাফা এখানে ধরা হয়নি; সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু টাকার অঙ্ক দেখা, হার না দেখা। আয় বাড়লে অঙ্ক বাড়লেও হার কমে যেতে পারে।
- "আগে খরচ, পরে যা থাকে জমাব" ভাবা। এভাবে সাধারণত কিছুই থাকে না।
- সঞ্চয় হিসেবে এমন টাকা ধরা যা কয়েক সপ্তাহ পরেই খরচ হবে। সেটা সঞ্চয় নয়, খরচের অপেক্ষা।
- অন্যের হার দেখে নিজেকে বিচার করা। প্রত্যেকের আয়, পরিবার আর দায়িত্ব আলাদা; নিজের হার মাস-মাস বাড়ছে কি না, সেটাই আসল মাপ।
কত টাকা জমাচ্ছেন তার চেয়ে আয়ের কত ভাগ জমাচ্ছেন সেটা বেশি জরুরি। ছোট হার দিয়ে শুরু করুন, আর প্রতিবার আয় বাড়লে হারও একটু বাড়ান।