প্রাইভেট ইকুইটি কী
প্রাইভেট ইকুইটি (পিই) মানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির মালিকানায় বিনিয়োগ। সাধারণত পিই ফান্ড এমন কোম্পানি বেছে নেয়, যেটা ইতিমধ্যে চালু আছে, আয় আছে, কিন্তু আরও ভালো চলতে পারে। ফান্ড প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মতো বড় অংশ কেনে, পরিচালনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখে, আর কয়েক বছর পরে কোম্পানিটা অন্য কারও কাছে বা শেয়ারবাজারে বেচে দেয়।
ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সঙ্গে মূল পার্থক্য হলো কোম্পানির বয়স আর পদ্ধতিতে। ভিসি টাকা দেয় নতুন, লাভহীন স্টার্টআপে, ছোট ভাগ কিনে। পিই টাকা দেয় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে, প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, আর কেনার টাকার একটা বড় অংশ ধার করে। এই ধরনের কেনাকে বলে লিভারেজড বাইআউট।
ধরা যাক গাজীপুরে দুই প্রজন্ম ধরে চলা একটা পারিবারিক কারখানা পোশাকের বোতাম আর জিপার বানায়। প্রতিষ্ঠাতা অবসর নিতে চান, সন্তানেরা ব্যবসায় আগ্রহী নয়। একটা পিই ফান্ড কারখানার ৭০% কিনে নিল, নতুন যন্ত্র বসাল, হিসাবপত্র আধুনিক করল, নতুন ক্রেতা আনল। পাঁচ বছর পর ফান্ড তার অংশ বড় কোনো কোম্পানির কাছে বেচে দিল, আশা করে কেনার চেয়ে বেশি দামে। ঘটনাটা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- লিভারেজ বুঝতে: ধার করা টাকায় কেনা হলে কোম্পানির মূল্য অল্প বদলালেও মালিকের লাভ-লোকসান অনেক বেশি বদলায়।
- তারল্য আর ফি বুঝতে: পিই ফান্ডে টাকা প্রায়ই ১০ বছর বা বেশি আটকে থাকে, আর ফি সাধারণ মিউচুয়াল ফান্ডের চেয়ে বেশি।
- খবর বুঝতে: কোনো পরিচিত কোম্পানি "প্রাইভেট ইকুইটির হাতে বিক্রি" হলে তার মানে কী, আর কর্মী, ক্রেতা বা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কী বদলাতে পারে।
- নিজের নাগাল বুঝতে: পিই সাধারণত প্রতিষ্ঠান আর ধনী বিনিয়োগকারীদের জন্য; সাধারণ মানুষ মূলত পরোক্ষভাবে এর সংস্পর্শে আসে।
পিই ফান্ড কীভাবে চলে
ভিসির মতোই, পিই ফান্ড প্রতিষ্ঠান (যেমন পেনশন ফান্ড, বিমা কোম্পানি) আর ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা তোলে, আর পেশাদার ব্যবস্থাপকেরা সেই টাকায় কয়েকটা কোম্পানি কেনেন। যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) জানায়, এসব বিনিয়োগ বেচতে অনেক সময় লাগে, প্রায়ই ১০ বছর বা তার বেশি, আর মাঝপথে টাকা তোলার সুযোগ সীমিত।
ব্যবস্থাপকেরা বার্ষিক ফি আর লাভের একটা ভাগ নেন। বাংলাদেশে বিএসইসির অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুলস ২০১৫-তে পিই ফান্ডের বার্ষিক ব্যবস্থাপনা ফি নিট সম্পদমূল্যের সর্বোচ্চ ২% আর লাভের ভাগ নিট বার্ষিক মুনাফার সর্বোচ্চ ২০% রাখা হয়। এসব ফান্ড শুধু প্রাইভেট প্লেসমেন্টে টাকা তোলে, তালিকাভুক্ত হয় না; ২০২০ সালের সংশোধনে একজন বিনিয়োগকারীর ন্যূনতম বিনিয়োগ ১০ লাখ টাকা করা হয়। নিয়ম বদলাতে পারে।
মূল্য বাড়ানোর পথ
- ব্যবসা ভালো চালানো: খরচ কমানো, উৎপাদন বাড়ানো, ভালো ব্যবস্থাপক আনা, হিসাব আর শাসনব্যবস্থা ঠিক করা।
- বড় করা: নতুন বাজার, নতুন পণ্য, বা ছোট কয়েকটা কোম্পানি কিনে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া।
- ধারের ব্যবহার: কেনার টাকার একটা অংশ ধার করা, যাতে নিজের কম টাকায় বড় কোম্পানি কেনা যায়। এটা লাভ বাড়ায়, কিন্তু ব্যবসা খারাপ গেলে দেনার চাপে কোম্পানি বিপদে পড়তে পারে।
- বেরিয়ে আসা: শেষে অন্য কোম্পানি, অন্য পিই ফান্ড বা শেয়ারবাজারে আইপিওর মাধ্যমে বিক্রি। পিচবুকের তথ্যভিত্তিক এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বে পিই-মালিকানাধীন কোম্পানির প্রায় অর্ধেক পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ফান্ডের হাতে আছে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ফান্ড ১০০ কোটি টাকায় একটা কোম্পানি কিনল: নিজের টাকা ৪০ কোটি, ধার ৬০ কোটি। সহজ রাখতে সুদ আর ফি বাদ দেওয়া হলো।
- ভালো ফল: পাঁচ বছর পর কোম্পানি বিক্রি হলো ১৩০ কোটিতে। ধার ৬০ কোটি শোধের পর ফান্ডের থাকে ৭০ কোটি। কোম্পানির মূল্য বেড়েছে ৩০%, কিন্তু ফান্ডের নিজের টাকা বেড়েছে ৭৫% (৪০ থেকে ৭০)।
- খারাপ ফল: কোম্পানি বিক্রি হলো ৮০ কোটিতে। ধার শোধের পর থাকে ২০ কোটি। কোম্পানির মূল্য কমেছে ২০%, কিন্তু ফান্ডের নিজের টাকা কমেছে ৫০% (৪০ থেকে ২০)।
ফল: ধার লাভকেও বড় করে, লোকসানকেও। আর বাস্তবে সুদ আর ফি এই হিসাব থেকে আরও কাটে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- প্রাইভেট ইকুইটিকে "নিশ্চিত বেশি রিটার্ন" ভাবা। ধার আর মেয়াদের কারণে এখানে ঝুঁকিও বড়।
- ফি না গুনে রিটার্ন তুলনা করা। ব্যবস্থাপনা ফি আর লাভের ভাগ মিলিয়ে বিনিয়োগকারীর হাতে আসে অনেক কম।
- ভাবা যে কোম্পানির মূল্য নিয়মিত জানা যায়। তালিকাভুক্ত শেয়ারের মতো প্রতিদিনের দাম নেই; মূল্য অনেকটা ব্যবস্থাপকের হিসাবের ওপর নির্ভর করে।
- কোনো ব্যক্তি বা অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের "প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড"-এ টাকা দেওয়া, বিএসইসির নিবন্ধন না দেখে।
প্রাইভেট ইকুইটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি কিনে, বদলে, বেচে লাভ খোঁজে; ধার এখানে লাভ আর লোকসান দুটোই বড় করে, আর টাকা বহু বছর আটকে থাকে।