BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসের সীমাবদ্ধতা

চার্ট অতীত সুন্দরভাবে দেখায়। কিন্তু চার্ট দেখে নিয়মিত লাভ করা যায় কি না, তা নিয়ে কয়েক দশকের গবেষণা আছে, আর তার উত্তর বেশিরভাগ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সাবধানী।

ভিডিও আসছে
চার্ট দেখে কি ভবিষ্যৎ বলা যায়? টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসের সীমা

সমস্যাটা কোথায়

টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিসের মূল ধারণা হলো, দামের অতীত প্যাটার্ন ভবিষ্যতে ফিরে আসে, তাই চার্ট দেখে পরের চাল আন্দাজ করা যায়। সমস্যা হলো, মানুষের মস্তিষ্ক এলোমেলো জিনিসেও প্যাটার্ন খুঁজে পায়। চার্টে যে ট্রেন্ড বা সাপোর্ট চোখে পড়ে, তার কতটা আসল আর কতটা কাকতালীয়, তা আলাদা করা খুব কঠিন।

তার ওপর বাজার নিজেই বদলায়। কোনো নিয়ম সত্যিই কাজ করলে অনেকে তা ব্যবহার শুরু করেন, আর তাতে সুবিধাটা কমে আসে। তাই "অতীতে কাজ করেছে" আর "সামনে কাজ করবে" এক কথা নয়।

একটা চিন্তার পরীক্ষা

একটা কয়েন ১০০ বার টস করুন। হেড এলে একটা কাল্পনিক দাম ১ টাকা বাড়ান, টেল এলে ১ টাকা কমান, আর প্রতিবারের দাম একটা গ্রাফে বসান। ফলাফল পুরোপুরি ভাগ্যের, তবুও গ্রাফে প্রায়ই "আপট্রেন্ড", "ডাউনট্রেন্ড" আর বারবার থামার "সাপোর্ট" দেখা যাবে। আসল চার্টের প্যাটার্নও তাই প্রমাণ ছাড়া অর্থবহ ধরে নেওয়া যায় না।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • দাবি যাচাই করতে: সোশ্যাল মিডিয়া বা মেসেজিং গ্রুপে "চার্ট বলছে নিশ্চিত উঠবে" ধরনের কথা প্রচুর। গবেষণা কী বলে জানলে এসব দাবি মেপে নিতে পারবেন।
  • খরচ বুঝতে: চার্ট দেখে ঘনঘন কেনা-বেচা মানে প্রতিবার ব্রোকারেজ কমিশনসহ নানা খরচ। ছোট সুবিধা থাকলেও খরচে তা মুছে যেতে পারে।
  • নিজের ভুল চিনতে: যেগুলো মিলেছে সেগুলো মনে থাকে, যেগুলো মেলেনি সেগুলো ভুলে যাই। এতে একটা পদ্ধতিকে আসলের চেয়ে ভালো মনে হয়।
  • সময় আর মনোযোগের হিসাব করতে: রোজ চার্ট দেখা অনেক সময় আর মানসিক চাপ নেয়। তার বদলে কী পাচ্ছেন, সেটা ভাবা দরকার।

গবেষণা কী বলে

১৯৭০ সালে অর্থনীতিবিদ ইউজিন ফামা "এফিশিয়েন্ট মার্কেট" ধারণা গুছিয়ে লেখেন: নতুন তথ্য দ্রুত দামে মিশে যায়, তাই অতীতের দাম দেখে নিয়মিত বাড়তি লাভ করা কঠিন। ২০১৩ সালে তিনি রবার্ট শিলার ও লার্স পিটার হ্যানসেনের সঙ্গে অর্থনীতিতে নোবেল পান। নোবেল কমিটির ভাষায়, পরের কয়েক দিন বা সপ্তাহে শেয়ার আর বন্ডের দাম আগে থেকে বলার কোনো উপায় নেই, যদিও তিন থেকে পাঁচ বছরের মতো লম্বা সময়ে দামের মোটামুটি গতিপথ আন্দাজ করা সম্ভব।

টেকনিক্যাল নিয়ম নিয়ে গবেষণার ফল মিশ্র। ২০০৭ সালের একটা বড় পর্যালোচনায় (পার্ক ও আরউইন) ৯৫টা আধুনিক গবেষণার মধ্যে ৫৬টায় লাভের পক্ষে, ২০টায় বিপক্ষে আর ১৯টায় মিশ্র ফল পাওয়া যায়। কিন্তু লেখকেরা সতর্ক করেন, অনেক গবেষণায় ডেটা স্নুপিং (অনেক নিয়ম পরীক্ষা করে যেটা ভালো দেখায় সেটা বেছে নেওয়া), ঘটনার পরে নিয়ম বাছাই, আর রিস্ক ও খরচ ঠিকমতো না ধরার সমস্যা আছে।

  • অতীতে ভালো, পরে নয়: ১৮৯৭–১৯৮৬ সালের মার্কিন ডাও জোন্স সূচকে কিছু সাধারণ চার্ট-নিয়ম ভালো ফল দেখিয়েছিল। কিন্তু সালিভান, টিমারম্যান ও হোয়াইট (১৯৯৯) দেখান, সবচেয়ে ভালো নিয়মটাই ১৯৮৭–১৯৯৬ সময়ে আর পরিসংখ্যানগতভাবে অর্থবহ লাভ দেয়নি।
  • খুব কম মানুষ টিকে থাকেন: তাইওয়ানে ১৯৯২–২০০৬ সময়ের ডে-ট্রেডারদের নিয়ে এক গবেষণায় (বারবার ও সহলেখক, ২০১৩) দেখা যায়, খরচ বাদ দিয়ে নিয়মিত ও আগে থেকে আন্দাজযোগ্যভাবে লাভ করতে পেরেছেন ১%-এরও কম ডে-ট্রেডার।
৯৫টা আধুনিক গবেষণার ফলটেকনিক্যাল ট্রেডিং রুলে লাভ পাওয়া গেছে কি না
৯৫টা গবেষণা
৫৯%২০%২১%

সূত্র: পার্ক ও আরউইন, ২০০৭

সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
লাভ পেয়েছেমিশ্র ফললাভ পায়নি
৯৫টা গবেষণা৫৬১৯২০

কেন এত কঠিন

  • ডেটা স্নুপিং: যথেষ্ট নিয়ম পরীক্ষা করলে কয়েকটা শুধু ভাগ্যের জোরেই অতীতে দারুণ দেখাবে। স্ক্রিনশটে দেখানো "সফল" কৌশল প্রায়ই এমনই।
  • এক চার্ট, অনেক ব্যাখ্যা: কোথায় ট্রেন্ডলাইন টানবেন বা কোনটা সাপোর্ট, বিশ্লেষকেরা প্রায়ই একমত হন না।
  • চার্টের বাইরের খবর: হঠাৎ কোনো ঘোষণা, নীতি বদল বা বৈশ্বিক ধাক্কা চার্টে আগে থেকে দেখা যায় না।
  • ছোট বাজারের বাস্তবতা: কম লেনদেন হওয়া শেয়ারে অল্প কয়েকটা অর্ডারেই চার্টের চেহারা বদলে যায়, তাই সেখানে "প্যাটার্ন" সবসময় অনেক মানুষের মিলিত মতামত নয়।

হাতে-কলমে হিসাব

ঘনঘন লেনদেনের খরচ (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক ১,০০,০০০ টাকা নিয়ে চার্ট দেখে বছরে ২০ বার কিনে আবার বেচলেন (মোট ৪০টা লেনদেন)।
  2. ধরা যাক প্রতিবার কেনা আর বেচা মিলিয়ে কমিশনসহ সব খরচ ০.৫%। তাহলে বছরে খরচ ২০ × ০.৫% = ১০%, মানে প্রায় ১০,০০০ টাকা। আসল খরচ ব্রোকার ও নিয়মভেদে আলাদা; সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
  3. শুধু এই খরচ তুলতেই বছরে প্রায় ১০% বাড়তি লাভ দরকার, আর লাভ হলে তার ওপর করের প্রশ্নও আছে।

ফল: গবেষণায় পাওয়া চার্ট-নিয়মের সুবিধা থাকলেও তা সাধারণত ছোট। ঘনঘন লেনদেনের খরচ সহজেই সেই সুবিধার চেয়ে বড় হয়ে যেতে পারে।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • অতীতের পরীক্ষা (ব্যাকটেস্ট) বা লাভের স্ক্রিনশটকে প্রমাণ ভাবা। কয়টা নিয়ম পরীক্ষা করে এটা বাছা হয়েছে, আর হারের হিসাব কোথায়, তা না জিজ্ঞেস করা।
  • লেনদেনের খরচ আর কর বাদ দিয়ে লাভের হিসাব করা।
  • মিলে যাওয়া ভবিষ্যদ্বাণী মনে রাখা আর না-মেলাগুলো ভুলে যাওয়া।
  • "চার্ট বলছে নিশ্চিত লাভ" শুনে বিশ্বাস করা। শেয়ারবাজারে নিশ্চিত লাভের প্রতিশ্রুতি নিজেই একটা সতর্কসংকেত।
মনে রাখুন

চার্ট অতীত বর্ণনা করতে ভালো; কেউ এ দিয়ে ভবিষ্যৎ বলার দাবি করলে প্রমাণ, খরচ আর রিস্ক তিনটাই জিজ্ঞেস করুন।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
ফামা ১৯৭০ ("Efficient Capital Markets: A Review of Theory and Empirical Work") ও ২০১৩ সালের নোবেল: শিকাগো বুথ, "Eugene F. Fama", দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
কয়েক দিন বা সপ্তাহে দাম আগে বলা যায় না, তিন থেকে পাঁচ বছরে মোটামুটি গতিপথ আন্দাজ করা যায়: রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস, ২০১৩ সালের অর্থনীতির নোবেল প্রেস রিলিজ, ১৪ অক্টোবর ২০১৩ ↗
৯৫টা গবেষণার মধ্যে ৫৬টা পক্ষে, ২০টা বিপক্ষে, ১৯টা মিশ্র; ডেটা স্নুপিংয়ের সতর্কতা: পার্ক ও আরউইন, "What Do We Know About the Profitability of Technical Analysis?", জার্নাল অব ইকোনমিক সার্ভেজ ২১(৪), ২০০৭ ↗
১৮৯৭–১৯৮৬ সময়ে ভালো ফল, ১৯৮৭–১৯৯৬ সময়ে সবচেয়ে ভালো নিয়মও অর্থবহ নয়: সালিভান, টিমারম্যান ও হোয়াইট, "Data-Snooping, Technical Trading Rule Performance, and the Bootstrap" (ওয়ার্কিং পেপার সংস্করণ; জার্নাল অব ফাইন্যান্স, ১৯৯৯) ↗
তাইওয়ানের ডে-ট্রেডার ১৯৯২–২০০৬, খরচ বাদে ১%-এরও কম নিয়মিত লাভবান: বারবার, লি, লিউ ও অডিন, "The cross-section of speculator skill: Evidence from day trading", জার্নাল অব ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেটস, ২০১৩ ↗
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।