ব্যাংকের ধরন বলতে কী বোঝায়
সব ব্যাংকের মূল কাজ মোটামুটি এক: মানুষের কাছ থেকে আমানত নেওয়া আর সেই টাকা থেকে লোন দেওয়া। কিন্তু মালিকানা, পরিচালনার নিয়ম আর উদ্দেশ্য আলাদা হতে পারে। কোনোটার মালিক সরকার, কোনোটার মালিক দেশের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, কোনোটা বিদেশি ব্যাংকের শাখা, কোনোটা ইন্টারেস্টের বদলে শরিয়াহর নিয়মে চলে, আর কোনোটা বানানো হয়েছে কৃষি বা প্রবাসীদের মতো নির্দিষ্ট খাতের জন্য।
বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক বাংলাদেশ ব্যাংক। যেসব ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২-এর তফসিলে (শিডিউলে) তালিকাভুক্ত, তাদের বলে শিডিউলড ব্যাংক। এরা ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ মেনে চলে এবং সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা দিতে পারে। আমরা সাধারণত যে ব্যাংকগুলোতে অ্যাকাউন্ট খুলি, সেগুলো শিডিউলড ব্যাংক।
ধরা যাক রাকিবের গ্রামের বাড়িতে একটা সরকারি ব্যাংকের শাখা আছে, যেখানে তাঁর বাবা কৃষিঋণ নেন। ঢাকায় অফিসের পাশে একটা বেসরকারি ব্যাংকে তাঁর বেতন আসে। তাঁর বোন একটা শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকে মুদারাবা সঞ্চয় হিসাব রেখেছেন। তিনটাই "ব্যাংক", কিন্তু মালিকানা আর চলার নিয়ম আলাদা। নামগুলো এখানে কাল্পনিক উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- খবর বুঝতে: ব্যাংক খাতের খবরে প্রায়ই "রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের খেলাপি ঋণ" বা "বিদেশি ব্যাংকের আমানত" এমন ভাগ করে সংখ্যা দেওয়া হয়। ভাগগুলো জানলে খবরটা পরিষ্কার হয়।
- নিজের পছন্দ বুঝতে: ইন্টারেস্টভিত্তিক নাকি শরিয়াহভিত্তিক হিসাব চান, সেটা অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দুই রকমের হিসাবের লাভ কীভাবে হিসাব হয়, তা আলাদা।
- একটা ভুল ধারণা এড়াতে: কোন ধরনের ব্যাংক, শুধু সেটা দেখে কোনো একটা ব্যাংকের অবস্থা ভালো না খারাপ বলা যায় না। প্রতিটি দলের ভেতরেই নানা রকম ব্যাংক আছে।
- আমানত সুরক্ষা বুঝতে: শিডিউলড ব্যাংকের আমানত আইনের অধীনে একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সুরক্ষিত, ব্যাংক যে ধরনেরই হোক।
শিডিউলড ব্যাংকের প্রধান ভাগগুলো
- রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক: পুরোপুরি বা বেশিরভাগ মালিকানা সরকারের। সারা দেশে, বিশেষ করে গ্রামে, অনেক শাখা থাকে; সরকারি লেনদেনের বড় অংশ এদের মাধ্যমে হয়।
- বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক: বেশিরভাগ মালিকানা দেশের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের। সংখ্যায় এরাই সবচেয়ে বেশি। এদের একটা অংশ প্রচলিত বা ইন্টারেস্টভিত্তিক, আরেকটা অংশ ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক।
- ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক: ইন্টারেস্ট নেয় বা দেয় না; লাভ-লোকসান ভাগাভাগি (মুদারাবা, মুশারাকা) বা কেনাবেচাভিত্তিক (মুরাবাহা) চুক্তিতে চলে। অনেক প্রচলিত ব্যাংকও আলাদা "ইসলামি উইন্ডো" বা শাখায় এই সেবা দেয়।
- বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক: বিদেশে নিবন্ধিত ব্যাংকের বাংলাদেশ শাখা। সাধারণত শাখা কম, বড় কোম্পানি আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেনে এদের ভূমিকা বেশি।
- বিশেষায়িত ব্যাংক: নির্দিষ্ট খাতের জন্য সরকার এগুলো গড়েছে, যেমন কৃষি উন্নয়ন বা প্রবাসীদের সেবা।
বাংলাদেশে সংখ্যার হিসাবে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের তালিকা অনুযায়ী (অক্টোবর ২০২৬-এ দেখা), দেশে শিডিউলড ব্যাংক ৬৩টি: ৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক, ৩টি বিশেষায়িত, ৪৩টি বেসরকারি (এর মধ্যে ৩৩টি প্রচলিত আর ১০টি ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক), ৯টি বিদেশি, আর ১টি ডিজিটাল ব্যাংক, যার পূর্ণ কার্যক্রমের অনুমতি তখনও মেলেনি।
এর বাইরে ৫টি নন-শিডিউলড ব্যাংক আছে। এগুলো নিজস্ব আলাদা আইনে বিশেষ উদ্দেশ্যে গড়া, যেমন ক্ষুদ্রঋণ বা কর্মসংস্থান, আর শিডিউলড ব্যাংকের সব কাজ করতে পারে না। ব্যাংক একীভূত হওয়া বা নতুন লাইসেন্সের কারণে এই সংখ্যা সময়ের সঙ্গে বদলায়; সর্বশেষ তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশ করে।
ব্যাংক আর "ব্যাংকের মতো" প্রতিষ্ঠান
- ফাইন্যান্স কোম্পানি (এনবিএফআই) মেয়াদি আমানত নেয় আর লোন দেয়, কিন্তু ব্যাংক নয়। এরা চেক বই বা চলতি হিসাব দিতে পারে না, আর চলে আলাদা আইনে, ফাইন্যান্স কোম্পানি আইন ২০২৩-এ।
- সমবায় সমিতি, এনজিও বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যাংক নয়। "ব্যাংকের মতো বেশি লাভ দেব" বললেই কেউ ব্যাংক হয়ে যায় না; লাইসেন্স আছে কিনা সেটাই আসল প্রশ্ন।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "সরকারি মানেই সবচেয়ে নিরাপদ" বা "বিদেশি মানেই ভালো" ধরে নেওয়া। ধরন দেখে কোনো একটা ব্যাংকের অবস্থা বিচার করা যায় না।
- শরিয়াহভিত্তিক হিসাবের "মুনাফা"কে নির্দিষ্ট ইন্টারেস্টের মতো ধরে নেওয়া। এটা লাভ-লোকসান ভাগাভাগির হিসাব, তাই হার বদলাতে পারে।
- ফাইন্যান্স কোম্পানি বা সমবায়কে ব্যাংক ভেবে নেওয়া, আর ধরে নেওয়া সেখানকার আমানতও ব্যাংকের মতো একই নিয়মে সুরক্ষিত।
- লাইসেন্স না দেখে নামের মধ্যে "ব্যাংক" বা "ফাইন্যান্স" শব্দ দেখেই ভরসা করা।
ব্যাংকের ধরন বলে কে মালিক আর কোন নিয়মে চলে, কিন্তু কোনো একটা ব্যাংক কতটা শক্ত, তা বলে না।