রিস্ক কী
ইনভেস্টমেন্টে রিস্ক মানে, যা আশা করছেন তা না-ও হতে পারে। রিটার্ন কম হতে পারে, শূন্য হতে পারে, এমনকি মূল টাকার একটা অংশ বা পুরোটাই হারাতে পারেন। কোনো ইনভেস্টমেন্টই পুরোপুরি রিস্কমুক্ত নয়; পার্থক্য হলো কোন ধরনের রিস্ক, আর কতটা।
রিস্ক চিনতে পারলে দুটো সুবিধা। এক, কোন ইনভেস্টমেন্টে কী ভুল হতে পারে তা আগে থেকে জানেন, তাই হঠাৎ অবাক হন না। দুই, বুঝতে পারেন বেশি রিটার্নের প্রতিশ্রুতির পেছনে কোন রিস্কটা লুকিয়ে আছে।
ধরা যাক রহিম আর করিম দুজনেই ১,০০,০০০ টাকা রাখলেন। রহিম রাখলেন ঘরের আলমারিতে নগদ, করিম কিনলেন একটা কোম্পানির শেয়ার। রহিমের টাকা কখনো কমবে না, কিন্তু ইনফ্লেশনে প্রতি বছর তার কেনার ক্ষমতা কমবে। করিমের শেয়ারের দাম বাড়তেও পারে, পড়তেও পারে। দুজনেই রিস্ক নিচ্ছেন, শুধু ধরন আলাদা। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- "নিরাপদ" কথাটার মানে বুঝতে: একটা রিস্ক কম মানেই সব রিস্ক কম নয়। যেটায় দাম পড়ার ভয় নেই, তাতে হয়তো ইনফ্লেশন বা লিকুইডিটি রিস্ক বেশি।
- বেশি রিটার্নের প্রতিশ্রুতি যাচাই করতে: সাধারণভাবে বেশি রিটার্নের পেছনে বেশি রিস্ক থাকে। রিস্ক ছাড়া অস্বাভাবিক বেশি রিটার্নের কথা শুনলে সেটা সতর্ক হওয়ার সংকেত।
- সময়ের সঙ্গে মেলাতে: কিছু রিস্ক অল্প সময়ে বেশি ভোগায় (দাম ওঠানামা), কিছু রিস্ক লম্বা সময়ে (ইনফ্লেশন)।
- ডাইভারসিফিকেশন কাজে লাগাতে: কোন রিস্ক কমানো যায় আর কোনটা যায় না, তা জানলেই টাকা ভাগ করে রাখার মানে বোঝা যায়।
দাম আর বাজারের রিস্ক
- মার্কেট রিস্ক: পুরো বাজার পড়লে ভালো কোম্পানির শেয়ারও সাধারণত পড়ে। অর্থনীতি, সুদের হার বা মানুষের মনোভাব বদলালে এটা হয়।
- ইনফ্লেশন রিস্ক: রিটার্ন ইনফ্লেশনের চেয়ে কম হলে টাকার অঙ্ক বাড়লেও কেনার ক্ষমতা কমে। নগদ, সেভিংস অ্যাকাউন্ট আর কম সুদের আমানতে এটা সবচেয়ে বড় রিস্ক।
- ইন্টারেস্ট রেট রিস্ক: সুদের হার বাড়লে আগে কেনা বন্ডের বাজারদাম কমে, কারণ নতুন বন্ডে বেশি সুদ পাওয়া যায়। সুদের হার বাড়লে শেয়ারবাজারও প্রায়ই চাপে পড়ে।
- কারেন্সি রিস্ক: টাকার মান কমলে বিদেশি মুদ্রায় খরচ (বিদেশে পড়াশোনা, আমদানি) বেড়ে যায়; বিদেশি মুদ্রায় রাখা সম্পদের হিসাব উল্টো দিকে বদলায়।
কার কাছে টাকা রাখছেন, আর কীভাবে
- ক্রেডিট বা ডিফল্ট রিস্ক: যাকে টাকা ধার দিচ্ছেন (আমানতের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান, বন্ডের ক্ষেত্রে ইস্যুকারী), সে সময়মতো সুদ বা আসল ফেরত দিতে না-ও পারে।
- লিকুইডিটি রিস্ক: দরকারের সময় ন্যায্য দামে দ্রুত বিক্রি করতে না পারা। জমি, ফ্ল্যাট, কম লেনদেন হওয়া শেয়ার বা মেয়াদের আগে ভাঙলে জরিমানা আছে এমন স্কিমে এটা বেশি।
- কনসেনট্রেশন রিস্ক: সব টাকা এক জায়গায়, এক কোম্পানি বা এক খাতে থাকলে, সেটার একটা খারাপ খবরই পুরো সঞ্চয়ে আঘাত করে।
- প্রতারণা ও রেগুলেটরি রিস্ক: অনুমোদনহীন স্কিম বা অ্যাপে টাকা হারানো, অথবা নিয়ম বদলে (কর, সীমা, লেনদেনের নিয়ম) রিটার্ন বদলে যাওয়া।
বাংলাদেশের দুটো বাস্তব শিক্ষা
মার্কেট রিস্ক: ১৯ ডিসেম্বর ২০১০ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাধারণ সূচক (ডিজেন) এক দিনেই প্রায় ৬.৭২% পড়ে যায়, যা তখন পর্যন্ত এক দিনে সবচেয়ে বড় পতন। পরের কয়েক মাসে বাজার আরও অনেকটা নামে। এমন পতনে সবচেয়ে বেশি ভোগেন তাঁরা, যাঁরা ধার করে বা সব সঞ্চয় দিয়ে শেয়ার কেনেন।
লিকুইডিটি রিস্ক: শেয়ারের দাম বেশি পড়া ঠেকাতে বিএসইসি ২৮ জুলাই ২০২২ থেকে "ফ্লোর প্রাইস" (দামের নিম্নসীমা) চালু করে। দাম কাগজে আর নামছিল না, কিন্তু ওই দামে ক্রেতা না থাকায় অনেক শেয়ার মাসের পর মাস বিক্রিই করা যায়নি। জানুয়ারি ২০২৪-এ ৩৫টি কোম্পানি বাদে বাকিগুলো থেকে ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়া হয়। শিক্ষা: দাম না পড়া মানেই টাকা হাতে পাওয়া নয়।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু দাম ওঠানামাকে রিস্ক ভাবা, আর ইনফ্লেশন বা লিকুইডিটি রিস্ক ভুলে যাওয়া।
- "নিশ্চিত বেশি লাভ" শুনে রিস্ক নেই ধরে নেওয়া। বেশি রিটার্নের পেছনে কোন রিস্ক আছে, তা না খোঁজা।
- অল্প সময় পরে যে টাকা লাগবে, তা দাম ওঠানামা করা বা সহজে বিক্রি করা যায় না এমন জায়গায় রাখা।
- ধার করে ইনভেস্ট করা, যাতে দাম পড়লে ক্ষতি আরও বড় হয়।
প্রতিটি ইনভেস্টমেন্টের আগে জিজ্ঞেস করুন: এখানে কী কী ভুল হতে পারে, আর তখন আমার কী হবে?