ইনকাম ট্যাক্স কী
ইনকাম ট্যাক্স বা আয়কর হলো আপনার বছরের আয়ের ওপর সরকারকে দেওয়া কর। বাংলাদেশে এর মূল আইন আয়কর আইন ২০২৩, আর তা দেখাশোনা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আয়ের বছর ধরা হয় জুলাই থেকে পরের বছরের জুন পর্যন্ত। বেতন, ব্যবসা, বাড়ি ভাড়া, ব্যাংকের সুদ, শেয়ারের ডিভিডেন্ড, সব মিলিয়েই আপনার মোট আয়।
বাংলাদেশের আয়কর "ধাপে ধাপে" বা স্ল্যাব অনুযায়ী বাড়ে। একটা অঙ্ক পর্যন্ত আয়ে কোনো কর নেই (করমুক্ত সীমা)। এর ওপরের প্রথম ধাপে কম হার, পরের ধাপে একটু বেশি, এভাবে চলে। গুরুত্বপূর্ণ কথা: বেশি হারটা শুধু ওপরের ধাপের টাকার ওপর বসে, পুরো আয়ের ওপর নয়।
ধরা যাক তানভীরের বেতন বাড়ায় তাঁর আয় নতুন একটা স্ল্যাবে ঢুকল। তিনি ভয় পেলেন, "এখন তো পুরো বেতনেই বেশি হারে ট্যাক্স দিতে হবে, হাতে কম আসবে!" আসলে বাড়তি হারটা বসে শুধু নতুন স্ল্যাবে পড়া অংশের ওপর। তাই বেতন বাড়লে করের পরেও হাতে আগের চেয়ে বেশিই আসে। ঘটনাটা কাল্পনিক, শুধু বোঝার জন্য।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- আসল রিটার্ন মাপতে: সুদ, মুনাফা বা ডিভিডেন্ডের ওপর কর কাটার পর যা থাকে, সেটাই আপনার হাতে আসে। দুটো ইনভেস্টমেন্ট তুলনা করতে হবে করের পরের রিটার্ন দিয়ে।
- রিবেট কাজে লাগাতে: কিছু নির্দিষ্ট ইনভেস্টমেন্টে কর রেয়াত পাওয়া যায়, যা মোট করের বোঝা কমায়। এটা বুঝতে আগে কর কীভাবে হিসাব হয় তা জানা দরকার।
- উৎসে কাটা কর বুঝতে: ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আগেই কর কেটে রাখা হয়। এটা আপনার মোট করের সঙ্গে সমন্বয় হয়, আলাদা কোনো "জরিমানা" নয়।
- কাগজপত্র ঠিক রাখতে: কিছু সেবা আর লেনদেনে টিআইএন বা রিটার্ন জমার প্রমাণ চাওয়া হয়; কোন কোন ক্ষেত্রে, তা আইনে সময়ের সঙ্গে বদলায়।
করমুক্ত সীমা ও স্ল্যাব
অর্থ আইন ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ আয়বর্ষে সাধারণ করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা, আর পরের বছরগুলোতে তা ধাপে ধাপে বাড়ানোর কথা আইনে রাখা হয়েছে। নারী, ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, তৃতীয় লিঙ্গের এবং গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা করদাতাদের সীমা আরও বেশি।
করমুক্ত সীমার পরে হার বাড়ে এভাবে: পরের ৩ লাখ টাকায় ১০%, তার পরের ৪ লাখে ১৫%, পরের ৫ লাখে ২০%, পরের ২০ লাখে ২৫%, আর বাকি আয়ে ৩০%। আয় করমুক্ত সীমা ছাড়ালে একটা ন্যূনতম কর দিতে হয় (সাধারণভাবে ৫,০০০ টাকা, নতুন করদাতার জন্য কম)। এই সীমা আর হার প্রায় প্রতি বছরের বাজেটে বদলাতে পারে; সর্বশেষ নিয়ম এনবিআর ও অর্থ আইনে দেখে নিন।
উৎসে কর: আগেই কেটে রাখা ট্যাক্স
অনেক আয়ের ক্ষেত্রে টাকা আপনার হাতে আসার আগেই কর কেটে রাখা হয়। একে বলে উৎসে কর কর্তন। যেমন, বেতন থেকে অফিস, এফডিআর বা সেভিংস অ্যাকাউন্টের সুদ থেকে ব্যাংক, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কর্তৃপক্ষ, আর ডিভিডেন্ড থেকে কোম্পানি কর কেটে সরকারকে জমা দেয়।
- বছর শেষে রিটার্নে মোট কর হিসাব করে, আগে কাটা কর সেখান থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রে উৎসে কাটা করই চূড়ান্ত কর, তার ওপর আর কিছু দিতে হয় না।
রিটার্ন জমা
রিটার্ন হলো বছরে আপনার আয়, কর আর সম্পদের হিসাব এনবিআরকে জানানো। ২০২৬–২৭ করবর্ষ থেকে সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য অনলাইনে (ই-রিটার্ন) জমা বাধ্যতামূলক; বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও প্রবাসী করদাতাসহ কয়েকটি শ্রেণি চাইলে কাগজে জমা দিতে পারেন। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে জমা দিলে প্রদেয় করের সর্বোচ্চ ৫% (অনধিক ২৫,০০০ টাকা) ছাড়, আর ডিসেম্বরের পরে জমা দিলে বাড়তি কর দিতে হয়। সময়সীমার নিয়ম বদলায়, তাই প্রতি বছর এনবিআরের ঘোষণা দেখুন।
জুন ২০২৬-এর হিসাবে দেশে প্রায় ১.২৮ কোটি মানুষের টিআইএন আছে, কিন্তু প্রতি বছর রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৪০–৪২ লাখের মতো।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ২০২৬–২৭ আয়বর্ষে একজন সাধারণ করদাতার করযোগ্য আয় ৯,০০,০০০ টাকা। প্রথম ৪,০০,০০০ টাকা করমুক্ত: কর ০।
- পরের ৩,০০,০০০ টাকায় ১০%: কর ৩০,০০০ টাকা।
- বাকি ২,০০,০০০ টাকা পড়ে ১৫%-এর স্ল্যাবে: কর ৩০,০০০ টাকা।
ফল: মোট কর ৬০,০০০ টাকা, যা আয়ের প্রায় ৬.৭%। সর্বোচ্চ (প্রান্তিক) হার ১৫% হলেও গড় হার অনেক কম। এরপর রিবেট আর উৎসে কাটা কর বাদ দিলে বাকি অঙ্কটাই দিতে হবে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ভাবা যে নতুন স্ল্যাবে ঢুকলে পুরো আয়ে বেশি হারে কর বসে। বাড়তি হার বসে শুধু ওপরের অংশে।
- উৎসে কর কাটা হয়েছে বলে রিটার্নের দরকার নেই ভাবা।
- ইনভেস্টমেন্টের রিটার্ন তুলনা করার সময় কর বাদ না দিয়ে শুধু ঘোষিত হার দেখা।
- আয়, ইনভেস্টমেন্ট আর কর কাটার সনদ সারা বছর গুছিয়ে না রাখা, তারপর শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়া।
বাড়তি করহার বসে শুধু ওপরের স্ল্যাবের টাকায়; আর ইনভেস্টমেন্ট সবসময় তুলনা করুন করের পরের রিটার্ন দিয়ে।