ক্যাপিটাল মার্কেট কী
ক্যাপিটাল মার্কেট বা পুঁজিবাজার হলো দীর্ঘমেয়াদি টাকার বাজার, সাধারণত এক বছরের বেশি সময়ের জন্য। একটা কোম্পানি নতুন কারখানা বানাতে চায়, বা সরকার একটা সেতু বানাতে চায়; এর জন্য বহু বছরের টাকা লাগে। তারা এই টাকা তোলে শেয়ার বা বন্ড বিক্রি করে, আর ইনভেস্টররা সেগুলো কেনেন লাভ বা সুদের আশায়।
শেয়ার কিনলে আপনি কোম্পানির আংশিক মালিক হন; লাভ হলে ডিভিডেন্ড আর শেয়ারের দাম বাড়ার সুযোগ থাকে, লোকসানের রিস্কও থাকে। বন্ড কিনলে আপনি কোম্পানি বা সরকারকে ধার দেন; নির্দিষ্ট সুদ আর মেয়াদ শেষে আসল ফেরত পাওয়ার কথা। দুই ক্ষেত্রেই টাকা ব্যাংকের মধ্যস্থতা ছাড়াই সঞ্চয়কারী থেকে সরাসরি ব্যবহারকারীর কাছে যায়।
ধরা যাক চট্টগ্রামের একটা পোশাক কারখানা নতুন লাইন বসাতে চায়। ব্যাংক থেকে লোন নিলে নির্দিষ্ট সময়ে কিস্তি দিতে হবে। এর বদলে কোম্পানিটা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়ে আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করল। ঢাকা, খুলনা, সিলেটের হাজারো মানুষ অল্প অল্প করে শেয়ার কিনলেন। কোম্পানি পেল দীর্ঘমেয়াদি টাকা, আর ইনভেস্টররা পেলেন কোম্পানির লাভের ভাগীদার হওয়ার সুযোগ, রিস্কসহ। ঘটনাটা কাল্পনিক উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড, কর্পোরেট বন্ড, ট্রেজারি বন্ড, সুকুক: এগুলো সবই ক্যাপিটাল মার্কেটের পণ্য। বাজারটা কীভাবে চলে জানলে প্রতিটা পণ্য বোঝা সহজ হয়।
- রিস্ক আর রিটার্নের সম্পর্ক বুঝতে: লম্বা মেয়াদের টাকায় সম্ভাব্য রিটার্ন সাধারণত বেশি, কিন্তু দামের ওঠানামাও বেশি।
- কোম্পানি কখন টাকা পায় বুঝতে: আইপিওতে টাকা যায় কোম্পানির কাছে; পরে স্টক এক্সচেঞ্জে কেনাবেচায় টাকা যায় এক ইনভেস্টর থেকে আরেক ইনভেস্টরের কাছে।
- কোথায় অভিযোগ করবেন জানতে: ক্যাপিটাল মার্কেটের রেগুলেটর বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক নয়।
প্রাইমারি আর সেকেন্ডারি মার্কেট
- প্রাইমারি মার্কেট: যেখানে নতুন শেয়ার বা বন্ড প্রথমবার বিক্রি হয়, যেমন আইপিও বা সরকারের বন্ড নিলাম। এখানকার টাকা সরাসরি কোম্পানি বা সরকারের কাছে যায়।
- সেকেন্ডারি মার্কেট: আগে ইস্যু হওয়া শেয়ার ও বন্ড ইনভেস্টরদের মধ্যে কেনাবেচা, মূলত স্টক এক্সচেঞ্জে। এতে কোম্পানি নতুন টাকা পায় না, কিন্তু ইনভেস্টররা দরকার হলে বিক্রি করতে পারেন বলেই প্রথমবার কিনতে আগ্রহী হন।
বাংলাদেশে কে কী করে
দেশে দুটি স্টক এক্সচেঞ্জ: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), যার যাত্রা শুরু ১৯৫৪ সালে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান স্টক এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে, আর ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। পুরো বাজারের রেগুলেটর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), প্রতিষ্ঠিত ১৯৯৩ সালে বিএসইসি আইনের অধীনে। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) শেয়ার ইলেকট্রনিকভাবে সংরক্ষণ করে; শেয়ার কেনাবেচা করতে তাই একটা বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার) অ্যাকাউন্ট লাগে।
বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা মূলত ব্যাংকনির্ভর। সিএফএ ইনস্টিটিউট রিসার্চ ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০১৯ সালে ব্যাংক খাতের সম্পদ ছিল জিডিপির প্রায় ৬৪%, আর জুন ২০২০-এ কর্পোরেট বন্ডের বাজার ছিল জিডিপির মাত্র ০.০১% এর মতো, যেখানে সরকারি বন্ড প্রায় ৭.৯%। মানে কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি টাকার জন্যও এখনও বেশিরভাগ ব্যাংক লোনের ওপর নির্ভর করে।
মানি মার্কেট বনাম ক্যাপিটাল মার্কেট
- মেয়াদ: মানি মার্কেট এক বছর বা কম; ক্যাপিটাল মার্কেট এক বছরের বেশি, শেয়ারের ক্ষেত্রে কোনো মেয়াদই নেই।
- উদ্দেশ্য: মানি মার্কেট দৈনন্দিন নগদ চাহিদা মেটায়; ক্যাপিটাল মার্কেট কারখানা, অবকাঠামো আর ব্যবসা বাড়ানোর টাকা জোগায়।
- রিস্ক: ক্যাপিটাল মার্কেটের পণ্যের দাম সাধারণত অনেক বেশি ওঠানামা করে, বিশেষ করে শেয়ারের।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা কোম্পানি আইপিওতে ১০ টাকা দামে ২ কোটি নতুন শেয়ার বিক্রি করল। কোম্পানি পেল ২০ কোটি টাকা (খরচ বাদ না দিয়ে)।
- তালিকাভুক্তির পরে ডিএসইতে শেয়ারের দাম উঠল ১৫ টাকায়। করিম তাঁর ১,০০০ শেয়ার রহিমার কাছে ১৫,০০০ টাকায় বেচলেন।
- এই ১৫,০০০ টাকা গেল রহিমা থেকে করিমের কাছে (ব্রোকারেজ কমিশন বাদে)। কোম্পানির হাতে নতুন কোনো টাকা এল না।
ফল: কোম্পানি টাকা পায় শুধু প্রাইমারি মার্কেটে। পরে শেয়ারের দাম বাড়া-কমা মূলত ইনভেস্টরদের নিজেদের মধ্যে লাভ-লোকসান। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ক্যাপিটাল মার্কেট মানে শুধু শেয়ারবাজার ভাবা। বন্ড, সুকুক আর মিউচুয়াল ফান্ডও এর অংশ।
- শেয়ারের দাম বাড়লে কোম্পানি সরাসরি টাকা পায় ভাবা। সেকেন্ডারি মার্কেটের লেনদেন ইনভেস্টরদের মধ্যে।
- দীর্ঘমেয়াদি বাজারে স্বল্পমেয়াদে দরকার হবে এমন টাকা রাখা, যেমন আগামী মাসের ভাড়া বা জরুরি তহবিল।
- তালিকাভুক্ত বা "বিএসইসির অনুমোদিত" মানেই লাভ নিশ্চিত ভাবা। অনুমোদন মানে নিয়ম মানা, লাভের গ্যারান্টি নয়।
ক্যাপিটাল মার্কেট লম্বা মেয়াদের টাকার বাজার: কোম্পানি টাকা পায় আইপিওতে, আর পরের কেনাবেচায় ইনভেস্টররা একে অন্যের সঙ্গে রিস্ক আর রিটার্ন হাতবদল করেন।