ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কী
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) হলো নতুন কোম্পানিতে, বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপে, টাকা দেওয়া, যারা এখনও লাভ করে না কিন্তু খুব দ্রুত বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। বিনিময়ে বিনিয়োগকারী পান কোম্পানির মালিকানার একটা অংশ, অর্থাৎ শেয়ার। এখানে কোনো সুদ বা নির্দিষ্ট ফেরত নেই।
ভিসি বিনিয়োগকারী জানেন, বেশিরভাগ স্টার্টআপ টিকবে না। তবু তাঁরা বিনিয়োগ করেন, কারণ একটা কোম্পানি যদি সত্যিই বড় হয়, তার লাভ বাকি সব লোকসান পুষিয়ে আরও অনেক বেশি দিতে পারে। লাভ হাতে আসে সাধারণত অনেক বছর পরে, যখন কোম্পানি বিক্রি হয় বা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।
ধরা যাক ঢাকার তিন তরুণ মিলে কৃষকদের সরাসরি দোকানে পণ্য বেচার একটা অ্যাপ বানালেন। ব্যবহারকারী বাড়ছে, কিন্তু আয় এখনও খরচের চেয়ে কম। একটা ভিসি ফান্ড তাঁদের ৫ কোটি টাকা দিল কোম্পানির ২০% মালিকানার বিনিময়ে। ব্যবসা দাঁড়ালে এই ২০%-এর মূল্য বহু গুণ হতে পারে; না দাঁড়ালে পুরো ৫ কোটি টাকাই হারিয়ে যেতে পারে। সংখ্যা ও ঘটনা উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- রিস্কের আসল চেহারা বুঝতে: এখানে "গড়" ফল প্রায় কেউ পায় না; বেশিরভাগ বিনিয়োগ লোকসান, অল্প কয়েকটা বিশাল লাভ।
- তারল্য বুঝতে: প্রাইভেট ফান্ডে টাকা প্রায়ই ১০ বছর বা তারও বেশি আটকে থাকে, মাঝপথে বিক্রির বাজার নেই বললেই চলে।
- "স্টার্টআপে ইনভেস্ট" প্রস্তাব বিচার করতে: বন্ধু বা পরিচিতের স্টার্টআপে টাকা দেওয়ার আগে জানা দরকার, পেশাদার ভিসিরাও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে টাকা হারান।
- অর্থনীতি বুঝতে: নতুন প্রযুক্তি, চাকরি আর ব্যবসার বড় একটা অংশ ভিসির টাকায় শুরু হয়।
ভিসি ফান্ড কীভাবে চলে
সাধারণত একটা ভিসি ফান্ড বড় প্রতিষ্ঠান আর ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা তোলে; এই বিনিয়োগকারীদের বলে লিমিটেড পার্টনার (এলপি)। ফান্ড চালান পেশাদার ব্যবস্থাপকেরা, যাঁরা কোন স্টার্টআপে টাকা যাবে তা বাছাই করেন। স্টার্টআপ ধাপে ধাপে টাকা তোলে: শুরুতে "সিড", তারপর "সিরিজ এ", "সিরিজ বি" ইত্যাদি। প্রতিবার নতুন শেয়ার ছাড়া হয়, তাই আগের মালিকদের ভাগ কমে আসে (ডাইলিউশন)।
ব্যবস্থাপকেরা দুই রকম টাকা নেন: প্রতি বছর একটা ব্যবস্থাপনা ফি, আর লাভ হলে তার একটা ভাগ। বাংলাদেশে বিএসইসির অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুলস ২০১৫-তে ভিসি ফান্ডের বার্ষিক ব্যবস্থাপনা ফি নিট সম্পদমূল্যের সর্বোচ্চ ৩% আর লাভের ভাগ নিট বার্ষিক মুনাফার সর্বোচ্চ ২০% রাখা হয়। নিয়ম পরে সংশোধিত হয়েছে, আরও হতে পারে।
লাভ আসে অল্প কয়েকটা থেকে
ভিসির ফলাফল খুবই একপেশে। যুক্তরাষ্ট্রের এক ভিসি প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় ২০০৪–২০১৩ সালের ২১ হাজারের বেশি বিনিয়োগ দেখা হয়: প্রায় ৬৫% বিনিয়োগ মূল টাকাও ফেরত দেয়নি, আর মাত্র প্রায় ৪% দিয়েছে ১০ গুণ বা তার বেশি। ফান্ডের প্রায় সব লাভ আসে এই অল্প কয়েকটা থেকে।
এ কারণেই একজন ভিসি অনেকগুলো কোম্পানিতে অল্প অল্প করে টাকা দেন। একজন সাধারণ মানুষ যদি একটা-দুটো স্টার্টআপে টাকা দেন, তাঁর "বড় বিজয়ী" পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম, আর সব টাকা হারানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি।
সূত্র: করিলেশন ভেঞ্চারসের তথ্য, একটি ব্লগ পোস্টের মাধ্যমে (২০১৪)
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| লাগানো টাকার চেয়ে কম ফেরত | ১ থেকে ১০ গুণ | ১০ গুণ বা বেশি | |
|---|---|---|---|
| সব ডিল | ৬৫ | ৩১ | ৪ |
বাংলাদেশে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল
বাংলাদেশে ভিসি, প্রাইভেট ইকুইটি আর ইমপ্যাক্ট ফান্ড চলে বিএসইসির অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুলস ২০১৫-এর অধীনে। এসব ফান্ড শুধু প্রাইভেট প্লেসমেন্টে টাকা তোলে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় না, আর বিনিয়োগ করতে পারে মূলত প্রতিষ্ঠান ও ধনী ব্যক্তিরা। ২০২০ সালের সংশোধনে একজন বিনিয়োগকারীর ন্যূনতম বিনিয়োগ ৫০ লাখ থেকে কমিয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়।
দেশের স্টার্টআপে বিনিয়োগ খুব ওঠানামা করে, আর প্রায় সবটাই আসে বিদেশ থেকে। এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ২০২১ সালে রেকর্ড প্রায় ৪১.৫ কোটি ডলার এসেছিল (যার বড় অংশ ছিল একটিমাত্র বিশাল বিনিয়োগ); ২০২৪ সালে তা নামে প্রায় ৪.১ কোটি ডলারে, যার ৯৮% বিদেশি। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে এসেছে মাত্র প্রায় ৬০ লাখ ডলার, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৫% কম।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা ফান্ড ১০টা স্টার্টআপে ১ কোটি টাকা করে মোট ১০ কোটি টাকা দিল।
- ৬টা বন্ধ হয়ে গেল: ফেরত শূন্য। ৩টা কোনোমতে টিকে থেকে বিক্রি হলো, প্রতিটি থেকে ফেরত ১ কোটি টাকা: মোট ৩ কোটি।
- ১টা বিশাল সফল হলো, ফেরত দিল ২০ গুণ: ২০ কোটি টাকা। মোট ফেরত ২৩ কোটি, অর্থাৎ ফি-র আগে ২.৩ গুণ।
ফল: সেই একটা বিজয়ী না থাকলে ১০ কোটি টাকা থেকে ফেরত আসত মাত্র ৩ কোটি। ভিসির পুরো খেলাটাই এই অল্প কয়েকটা বিজয়ীর ওপর নির্ভর করে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- একটা-দুটো স্টার্টআপে বড় অঙ্ক দিয়ে ভাবা যে "পরের বড় কোম্পানি" ধরে ফেলেছি।
- স্টার্টআপের "ভ্যালুয়েশন"কে নিশ্চিত মূল্য ভাবা। এটা শেষ রাউন্ডের দাম, বিক্রির নিশ্চয়তা নয়।
- দ্রুত টাকা ফেরতের আশা করা। ভিসির টাকা সাধারণত বহু বছর আটকে থাকে।
- "স্টার্টআপে ইনভেস্ট করে মাসে নির্দিষ্ট লাভ" জাতীয় প্রস্তাবে বিশ্বাস করা। আসল ভিসিতে মাসিক বা নিশ্চিত লাভ থাকে না।
ভেঞ্চার ক্যাপিটালে বেশিরভাগ বিনিয়োগ ব্যর্থ হয়, আর লাভ আসে অল্প কয়েকটা বিশাল সাফল্য থেকে, তাও বহু বছর পরে।