BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

লস অ্যাভারশন

সমান অঙ্কের লাভের আনন্দের চেয়ে লোকসানের কষ্ট আমাদের কাছে অনেক বেশি ভারী লাগে। এই ঝোঁক ইনভেস্টরকে কখনো অতিরিক্ত ভীতু, কখনো অদ্ভুতভাবে জেদি করে তোলে।

ভিডিও আসছে
লস অ্যাভারশন: ১০০ টাকা হারানোর কষ্ট কেন ১০০ টাকা পাওয়ার আনন্দের চেয়ে বেশি

লস অ্যাভারশন কী

লস অ্যাভারশন মানে লোকসানকে সমান মাপের লাভের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। পকেট থেকে ৫০০ টাকার নোট হারালে যতটা খারাপ লাগে, রাস্তায় ৫০০ টাকা কুড়িয়ে পেলে ততটা ভালো লাগে না। টাকার অঙ্ক এক, অনুভূতি এক নয়।

ধারণাটা এসেছে মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেম্যান আর আমোস টভারস্কির "প্রসপেক্ট থিওরি" থেকে, যা ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হয়। তাঁরা দেখান, মানুষ মোট সম্পদ দিয়ে নয়, একটা রেফারেন্স পয়েন্ট (যেমন কেনা দাম) থেকে লাভ বা লোকসান হিসেবে ফলাফল বিচার করে, আর লোকসানের দিকটা বেশি তীব্রভাবে অনুভব করে।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক করিম সাহেবের দুটো শেয়ার আছে: একটায় ২০% লাভ, আরেকটায় ২০% লোকসান। মেয়ের ভর্তির জন্য টাকা দরকার। বেশিরভাগ মানুষের মতো তিনি লাভের শেয়ারটাই বেচলেন, কারণ লাভ "তুলে নিতে" ভালো লাগে, আর লোকসানেরটা বেচলে লোকসান "সত্যি" হয়ে যায়। কোন কোম্পানির ভবিষ্যৎ ভালো, সেই প্রশ্নটা তিনি করেনইনি। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • লোকসানের শেয়ার আঁকড়ে থাকা: লোকসান মেনে নেওয়ার কষ্ট এড়াতে মানুষ দুর্বল হয়ে পড়া কোম্পানিতেও বছরের পর বছর আটকে থাকে।
  • লাভের শেয়ার তাড়াতাড়ি বেচে দেওয়া: সামান্য লাভ "হাতছাড়া হওয়ার" ভয়ে ভালো ব্যবসাও আগেভাগে ছেড়ে দেওয়া।
  • পতনের সময় আতঙ্কে বেচা: বাজার পড়লে লোকসানের কষ্ট এত তীব্র হয় যে, পরিকল্পনা ভুলে সব বেচে দেওয়ার ইচ্ছা হয়।
  • লোকসান পোষাতে বড় ঝুঁকি নেওয়া: "যেভাবেই হোক টাকা ফেরত আনতে হবে" ভাবনায় মানুষ এমন ঝুঁকি নেয়, যা স্বাভাবিক অবস্থায় নিত না।

লোকসান কতটা ভারী

গবেষকেরা লোকসান আর লাভের এই অসমতাকে একটা সংখ্যা দিয়ে মাপেন, যাকে বলে লস অ্যাভারশন কোএফিশিয়েন্ট। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটা বড় মেটা-অ্যানালাইসিস ১৫০টা গবেষণাপত্রের ৬০৭টা হিসাব একসঙ্গে দেখে গড় মান পেয়েছে প্রায় ১.৯৬। সহজ ভাষায়, গড়ে একটা লোকসান সমান অঙ্কের লাভের প্রায় দ্বিগুণ ভারী লাগে।

এটা গড়; মানুষভেদে আর পরিস্থিতিভেদে কম-বেশি হয়। আর লোকসানকে ভয় পাওয়া সবসময় খারাপ নয়। সমস্যা হয় যখন এই ভয় ঠান্ডা মাথার হিসাবকে ছাপিয়ে যায়।

লাভ বেচি, লোকসান রাখি

লস অ্যাভারশনের সবচেয়ে পরিচিত রূপকে বলে "ডিসপোজিশন ইফেক্ট"। অর্থনীতিবিদ টেরেন্স ওডিন একটা বড় ব্রোকারেজের ১০,০০০ অ্যাকাউন্টের লেনদেন বিশ্লেষণ করে দেখান, ইনভেস্টররা লোকসানের শেয়ারের চেয়ে লাভের শেয়ার বেচতে অনেক বেশি আগ্রহী। আর পরে শেয়ারগুলো কেমন করল, তা দিয়ে এই আচরণের যুক্তি মেলে না।

  • শেয়ারের হিসাব আলাদা করে না দেখে পুরো পোর্টফোলিও দেখুন। একটা শেয়ারে লোকসান আর পুরো পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া এক কথা নয়।
  • কেনার সময়ই লিখে রাখুন কোন অবস্থায় বেচবেন, যেমন "কোম্পানি টানা লোকসান করলে" বা "যে কারণে কিনেছিলাম তা আর না থাকলে"।
  • লম্বা সময়ের লক্ষ্যে ইনভেস্ট করলে প্রতিদিন দাম দেখা কমিয়ে দিন। যত ঘন ঘন দেখবেন, তত বেশি ছোট ছোট লোকসান চোখে পড়বে।

হাতে-কলমে হিসাব

একটা ন্যায্য বাজি (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক কেউ প্রস্তাব দিলেন: একটা কয়েন টস হবে। হেড পড়লে আপনি পাবেন ১,৫০০ টাকা, টেল পড়লে দেবেন ১,০০০ টাকা।
  2. গড় হিসাব: অর্ধেক সম্ভাবনায় +১,৫০০, অর্ধেক সম্ভাবনায় −১,০০০। প্রত্যাশিত ফল = (১,৫০০ − ১,০০০) ÷ ২ = +২৫০ টাকা।
  3. কিন্তু লোকসান যদি লাভের প্রায় দ্বিগুণ ভারী লাগে, তাহলে মনের হিসাবে ১,০০০ টাকা হারানো লাগে প্রায় ২,০০০ টাকার মতো, যা ১,৫০০ টাকা জেতার আনন্দের চেয়ে বেশি।

ফল: গড়ে লাভজনক হলেও অনেকেই বাজিটা ফিরিয়ে দেন। এটা জুয়া খেলার পরামর্শ নয়; বোঝানোর বিষয় হলো, লোকসানের ভয় আমাদের এমন সিদ্ধান্তও এড়াতে বলে, যা হিসাবে যুক্তিসঙ্গত। ইনভেস্টিংয়ে এটাই কখনো অতিরিক্ত ভীতি হয়ে দেখা দেয়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • লোকসান মেনে নিতে না পেরে শুধু "কেনা দামে ফেরার" অপেক্ষায় দুর্বল কোম্পানির শেয়ার ধরে রাখা।
  • লাভ চোখে পড়লেই বেচে দেওয়া, কোম্পানির ভবিষ্যৎ বিচার না করে।
  • আগের লোকসান তাড়াতাড়ি পোষানোর জন্য বেশি ঝুঁকি নেওয়া বা ধার করে ইনভেস্ট করা।
  • কোনো ওঠানামা সহ্য না করার ভয়ে লম্বা সময়ের লক্ষ্যের টাকাও এমনভাবে রাখা, যা ইনফ্লেশনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না।
মনে রাখুন

লোকসান স্বাভাবিকভাবেই লাভের প্রায় দ্বিগুণ ভারী লাগে: তাই বেচা বা রাখার সিদ্ধান্ত নিন কোম্পানির ভবিষ্যৎ দেখে, লাভ বা লোকসানের অনুভূতি দেখে নয়।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
লস অ্যাভারশন কোএফিশিয়েন্টের গড় ১.৯৫৫ (৬০৭টা হিসাব, ১৫০টা গবেষণাপত্র): Brown, Imai, Vieider ও Camerer, "Meta-Analysis of Empirical Estimates of Loss Aversion", Journal of Economic Literature, খণ্ড ৬২, সংখ্যা ২, জুন ২০২৪, দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
ডিসপোজিশন ইফেক্ট (১০,০০০ ব্রোকারেজ অ্যাকাউন্ট): Terrance Odean, "Are Investors Reluctant to Realize Their Losses?", Journal of Finance, ১৯৯৮; লেখকের পাতা, দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
প্রসপেক্ট থিওরি: Kahneman ও Tversky, "Prospect Theory: An Analysis of Decision under Risk", Econometrica, ১৯৭৯
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।