চার্ট আর ট্রেন্ড কী
টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস মানে অতীতের দাম আর লেনদেনের পরিমাণ (ভলিউম) দেখে বাজারের আচরণ বোঝার চেষ্টা। ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিস যেখানে কোম্পানির আয়, লাভ, দেনা দেখে, টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস সেখানে মূলত দেখে চার্ট। চার্টের আড়াআড়ি দিকে থাকে সময় (দিন, সপ্তাহ, মাস), খাড়া দিকে দাম।
ট্রেন্ড মানে দামের সাধারণ দিক। আপট্রেন্ডে প্রতিটি ওঠা আগেরটার চেয়ে উঁচুতে যায়, আর প্রতিটি নামা আগেরটার চেয়ে উঁচুতে থামে। ডাউনট্রেন্ডে উল্টো: প্রতিটি চূড়া আর প্রতিটি তলা আগেরটার চেয়ে নিচে। কোনো স্পষ্ট দিক না থাকলে তাকে বলে সাইডওয়েজ বা পাশাপাশি চলা।
ধরা যাক দুই সপ্তাহে একটা শেয়ারের দাম এভাবে চলল: ৫০ টাকা থেকে উঠে ৫৩, নেমে ৫১, উঠে ৫৬, নেমে ৫৪, উঠে ৫৯। চূড়াগুলো (৫৩, ৫৬, ৫৯) প্রতিবার উঁচু, তলাগুলোও (৫১, ৫৪) প্রতিবার উঁচু। চার্ট দেখা মানুষ একে বলবেন আপট্রেন্ড। কিন্তু এটা শুধু এই দুই সপ্তাহের বর্ণনা; পরের সপ্তাহে কী হবে, তার নিশ্চয়তা নয়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- বাজারের ভাষা বুঝতে: খবরে, ব্রোকারেজ হাউসে আর সোশ্যাল মিডিয়ায় "ট্রেন্ড", "চার্ট", "ক্যান্ডেল" শব্দগুলো খুব চলে। মানে জানলে কেউ কী দাবি করছেন তা যাচাই করতে পারবেন।
- আজকের দামকে প্রেক্ষাপটে দেখতে: এক দিনের দাম একা প্রায় কিছুই বলে না। চার্টে দেখা যায় দামটা গত কয়েক মাস বা বছরে কোথায় ছিল।
- ওঠানামা চোখে দেখতে: কোন শেয়ার শান্তভাবে চলে আর কোনটা খুব লাফায়, চার্টে এক নজরেই বোঝা যায়।
- বর্ণনা আর ভবিষ্যদ্বাণী আলাদা করতে: চার্ট অতীত ভালোভাবে বর্ণনা করে। ভবিষ্যৎ বলতে পারে কি না, সেটা আলাদা প্রশ্ন, আর তার প্রমাণ মিশ্র।
চার্টের ধরন
- লাইন চার্ট: প্রতিদিনের শেষ দাম (ক্লোজিং প্রাইস) একটা রেখায় জোড়া। সবচেয়ে সহজ, লম্বা সময়ের ছবি দেখতে সুবিধা।
- বার চার্ট: প্রতিদিনের জন্য একটা খাড়া দাগ, যার মাথা দিনের সর্বোচ্চ দাম আর নিচ সর্বনিম্ন দাম; পাশে ছোট দাগে দিনের শুরুর (ওপেন) আর শেষের (ক্লোজ) দাম।
- ক্যান্ডেলস্টিক চার্ট: একই চারটা দাম, কিন্তু ওপেন আর ক্লোজের মাঝখানটা মোটা "বডি" হিসেবে আঁকা। ক্লোজ ওপেনের চেয়ে বেশি হলে সাধারণত সবুজ বা ফাঁপা, কম হলে লাল বা ভরাট। ওপরে-নিচে সরু "শলতে" দেখায় দিনের সর্বোচ্চ আর সর্বনিম্ন দাম।
- ভলিউম: অনেক চার্টের নিচে ছোট ছোট খাড়া দাগে দেখানো হয় সেদিন কত শেয়ার লেনদেন হলো। অনেক লেনদেনসহ দাম বদলানোকে চার্ট বিশ্লেষকেরা বেশি গুরুত্ব দেন।
- সময়ের মাপ: একই শেয়ার দৈনিক চার্টে উঠতি আর মাসিক চার্টে পড়তি দেখাতে পারে। কোন সময়ের চার্ট দেখছেন, সেটা সবসময় মিলিয়ে নিতে হয়।
ট্রেন্ড কীভাবে চেনা হয়
চার্টে ট্রেন্ড পড়ার ধারণা অনেক পুরনো। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক চার্লস ডাও (১৮৫১–১৯০২) তাঁর সম্পাদকীয়তে বাজারের চলাকে তিন স্তরে ভাগ করেছিলেন: লম্বা সময়ের প্রধান ট্রেন্ড, কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাসের মাঝারি ঢেউ, আর দিনে দিনে ছোট ওঠানামা। তাঁর মৃত্যুর পর অন্যরা এগুলো গুছিয়ে যে কাঠামো দাঁড় করান, তার নাম "ডাও থিওরি"।
আজ চার্ট বিশ্লেষকেরা ট্রেন্ড চেনেন মূলত দুইভাবে। এক, ট্রেন্ডলাইন: আপট্রেন্ডে তলাগুলো, ডাউনট্রেন্ডে চূড়াগুলো একটা সরলরেখায় জোড়া। দুই, মুভিং অ্যাভারেজ: গত কয়েক দিনের গড় দাম, যা প্রতিদিন নতুন দাম যোগ করে আর সবচেয়ে পুরনোটা বাদ দিয়ে এগোয়। দাম গড়ের ওপরে থাকলে অনেকে একে উঠতি ট্রেন্ডের লক্ষণ ধরেন।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক পাঁচ দিনের ক্লোজিং প্রাইস: ১০০, ১০২, ১০১, ১০৫, ১০৭ টাকা। যোগফল ৫১৫, ভাগ ৫ = ১০৩ টাকা। এটাই আজকের ৫ দিনের মুভিং অ্যাভারেজ।
- পরের দিন দাম ১১০ টাকা। সবচেয়ে পুরনো ১০০ বাদ, নতুন ১১০ যোগ: ১০২ + ১০১ + ১০৫ + ১০৭ + ১১০ = ৫২৫, ভাগ ৫ = ১০৫ টাকা।
- দাম (১১০) গড়ের (১০৫) ওপরে, আর গড় নিজেও বাড়ছে। চার্ট বিশ্লেষকেরা একে আপট্রেন্ডের লক্ষণ বলবেন।
ফল: মুভিং অ্যাভারেজ রোজকার ছোটখাটো লাফ মসৃণ করে ট্রেন্ডটা চোখে পড়তে সাহায্য করে। কিন্তু এটা শুধু অতীতের দাম দিয়ে বানানো, তাই সবসময় একটু পিছিয়ে থাকে: দাম ঘুরে যাওয়ার পরেই গড় ঘোরে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ট্রেন্ডকে প্রতিশ্রুতি ভাবা। "এতদিন উঠেছে, তাই আরও উঠবে" অতীতের বর্ণনা, ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নয়।
- নিজের পছন্দের গল্পের সঙ্গে মেলে এমন সময়ের চার্ট বেছে নেওয়া, আর অন্য সময়ের ছবি না দেখা।
- বোনাস শেয়ার বা রাইট শেয়ারের পর দামের হঠাৎ "পতন" দেখে ভয় পাওয়া। শেয়ার সংখ্যা বাড়ায় দাম সমন্বয় হয়; কিছু চার্ট এটা ঠিক করে দেখায়, কিছু দেখায় না।
- কম লেনদেন হওয়া শেয়ারের চার্টকে অনেক মানুষের মিলিত মতামত ভাবা। সেখানে অল্প কয়েকটা লেনদেনেই চার্টের চেহারা বদলে যেতে পারে।
চার্ট বলে দাম কোথায় ছিল আর কীভাবে চলেছে; কোথায় যাবে, তা নিশ্চিতভাবে বলে না।