কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ কী
যে ব্যবসা ভালো লাভ করে, প্রতিযোগীরা সেখানে ভিড় করে। নতুন দোকান খোলে, দাম কমায়, ক্রেতা টানে, আর ধীরে ধীরে সবার লাভ কমে আসে। কম্পিটিটিভ অ্যাডভান্টেজ হলো সেই টেকসই সুবিধা, যা এই ভিড় ঠেকিয়ে একটা কোম্পানিকে বছরের পর বছর ভালো লাভ ধরে রাখতে দেয়।
ওয়ারেন বাফেট একে বলেন "মোট", মানে দুর্গের চারপাশের পরিখা। তাঁর ভাষায়, সত্যিকারের বড় ব্যবসার এমন টেকসই পরিখা থাকা দরকার যা তার ভালো রিটার্নকে রক্ষা করে, কারণ প্রতিযোগীরা বারবার সেই "দুর্গ" আক্রমণ করবে।
ধরা যাক মোড়ের একটা দোকান মোবাইল রিচার্জ আর ফটোকপি করে ভালো লাভ করছে। কয়েক মাসের মধ্যে পাশে আরও তিনটা একই রকম দোকান খুলল, আর সবার লাভ কমে গেল, কারণ কাজটা যে কেউ করতে পারে। অন্যদিকে, পুরোনো একটা মিষ্টির দোকানের নাম আর স্বাদের জন্য মানুষ দূর থেকে আসে, একটু বেশি দামও দেয়। পাশে নতুন দোকান খুললেও সেই বিশ্বাস রাতারাতি নকল করা যায় না। প্রথমটার পরিখা নেই, দ্বিতীয়টার আছে। দোকানগুলো কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- লাভ টিকবে কি না বুঝতে: এ বছরের ভালো লাভের চেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, ১০ বছর পরেও কি এমন লাভ থাকবে।
- ইনট্রিনসিক ভ্যালু আন্দাজ করতে: একটা কোম্পানির মূল্য তার ভবিষ্যতের আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে, আর পরিখা যত মজবুত, সেই আয় তত বেশি দিন টেকার সম্ভাবনা।
- বেশি রিটার্ন অন ইকুইটি (ROE) কেন টিকছে, বা কেন টিকবে না, বুঝতে।
- "জনপ্রিয়" আর "সুরক্ষিত" যে এক জিনিস নয়, তা ধরতে।
পরিখার পাঁচটি সাধারণ উৎস
রিসার্চ প্রতিষ্ঠান মর্নিংস্টার পরিখার উৎসকে পাঁচ ভাগে ভাগ করে। একটা কোম্পানির একাধিক উৎস থাকতে পারে, আবার একটাও না থাকতে পারে।
- নেটওয়ার্ক ইফেক্ট: যত বেশি মানুষ ব্যবহার করে, প্রত্যেকের কাছে সেবাটা তত দামি হয়। যেমন, কোনো পেমেন্ট নেটওয়ার্কে যত বেশি গ্রাহক, তত বেশি দোকান সেটা নেয়, আর তত বেশি নতুন গ্রাহক আসে।
- সুইচিং কস্ট: অন্য কোম্পানিতে যেতে টাকা, সময় বা ঝামেলা লাগে। যেমন, একটা অফিস যে অ্যাকাউন্টিং সফটওয়্যারে বছরের পর বছর হিসাব রেখেছে, সেটা বদলানো কঠিন।
- ইনট্যানজিবল অ্যাসেট: ব্র্যান্ড, পেটেন্ট বা সরকারি লাইসেন্স, যা প্রতিযোগীদের আটকায় বা বেশি দাম নিতে দেয়।
- কস্ট অ্যাডভান্টেজ: একই মানের জিনিস অন্যদের চেয়ে কম খরচে বানানো, যেমন বড় পরিসরে কাঁচামাল কেনা বা ভালো জায়গায় কারখানা।
- এফিশিয়েন্ট স্কেল: বাজার এত ছোট যে একটা বা দুটো কোম্পানিই যথেষ্ট; নতুন কেউ এলে সবার লোকসান। যেমন, একটা ছোট শহরে একটার বেশি গ্যাস পাইপলাইন বসানো লাভজনক নয়।
সংখ্যায় পরিখার চিহ্ন
পরিখা সরাসরি ব্যালান্স শিটে লেখা থাকে না, তবে এর ছাপ পড়ে। মর্নিংস্টারের মতে, আসল পরীক্ষা হলো কোম্পানি তার মূলধনের খরচের চেয়ে বেশি রিটার্ন কত বছর ধরে রাখতে পারছে; এক-দুই বছরের ঝলক নয়, দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকাটাই আসল।
- অনেক বছর ধরে স্থিরভাবে ভালো ROE, খারাপ বছরেও খুব বেশি না পড়া।
- স্থির বা বাড়তে থাকা গ্রস মার্জিন, অর্থাৎ খরচ বাড়লেও দাম বাড়িয়ে লাভ ধরে রাখতে পারা (প্রাইসিং পাওয়ার)।
- প্রতিযোগীরা দাম কমালেও বাজারের ভাগ খুব বেশি না হারানো।
- মনে রাখবেন, এসব সংখ্যা অতীতের কথা বলে। পরিখা ভবিষ্যতেও থাকবে কি না, সেটা ব্যবসা বুঝে বিচার করতে হয়।
পরিখা যেভাবে ভাঙে
কোনো পরিখাই চিরস্থায়ী নয়। নতুন প্রযুক্তি পুরোনো সুবিধা অচল করে দিতে পারে, যেমন মোবাইল ফোনের ক্যামেরা আসার পর ফিল্ম রোলের ব্যবসা। আইন বা লাইসেন্সের নিয়ম বদলালে লাইসেন্সের সুরক্ষা হারাতে পারে। আর ম্যানেজমেন্ট আত্মতুষ্ট হয়ে পড়লে ব্র্যান্ডও দুর্বল হয়।
বাফেট সতর্ক করেছেন, ব্যবসার ইতিহাস এমন অনেক কোম্পানিতে ভরা যাদের পরিখা ছিল আসলে মরীচিকা, আর যে পরিখা প্রতিনিয়ত নতুন করে গড়তে হয়, শেষ পর্যন্ত সেটা আর পরিখাই থাকে না। তাঁর উদাহরণ ছিল এয়ারলাইন শিল্প: দ্রুত বাড়ে, প্রচুর পুঁজি লাগে, কিন্তু টেকসই সুবিধা প্রায় কারও থাকেনি।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- জনপ্রিয় পণ্য বা বিখ্যাত নামকেই পরিখা ভাবা। প্রশ্ন হলো, প্রতিযোগীরা কেন এটা নকল করতে পারবে না।
- বড় কোম্পানি মানেই সুরক্ষিত কোম্পানি ধরে নেওয়া। আকার আর পরিখা আলাদা জিনিস।
- এক বছরের ভালো লাভ দেখে পরিখা আছে ধরে নেওয়া।
- পরিখা আছে বলে যেকোনো দামে শেয়ার ঠিক আছে ভাবা। দারুণ ব্যবসাও বেশি দামে কিনলে রিটার্ন খারাপ হতে পারে।
ভালো লাভ সবাই চায়, তাই প্রশ্ন একটাই: প্রতিযোগীরা কেন এই লাভ কেড়ে নিতে পারবে না? উত্তর না পেলে পরিখাও নেই।