ট্যাক্স রিবেট কী
ট্যাক্স রিবেট বা কর রেয়াত মানে আপনার হিসাব করা মোট কর থেকে সরাসরি কিছু টাকা কমিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশে আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৭৮ আর ষষ্ঠ তফসিলের তৃতীয় অংশে বলা কিছু খাতে, যেমন ডিপিএস, সঞ্চয়পত্রসহ সরকারি সিকিউরিটিজ, লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম, প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা বা অনুমোদিত দানে টাকা দিলে এই সুবিধা মেলে।
রিবেট পুরো ইনভেস্টমেন্টের সমান নয়, তার একটা ছোট শতাংশ। আর এর তিনটা সীমা আছে: আপনার করযোগ্য আয়ের একটা শতাংশ, যোগ্য ইনভেস্টমেন্টের একটা শতাংশ, আর টাকার অঙ্কে একটা সর্বোচ্চ সীমা। এই তিনটার মধ্যে যেটা সবচেয়ে কম, রিবেট সেটাই।
ধরা যাক মিতু বছরে ১,০০,০০০ টাকা একটা যোগ্য খাতে রাখলেন। তিনি ভাবলেন, "আমার করযোগ্য আয় থেকে ১ লাখ টাকা বাদ যাবে।" আসলে আয় থেকে কিছু বাদ যায় না; বরং ইনভেস্টমেন্টের একটা শতাংশ, ধরুন ১০,০০০ টাকা, তাঁর প্রদেয় কর থেকে কমবে, যদি অন্য দুই সীমা এর চেয়ে কম না হয়। ঘটনা আর সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- মোট লাভ বুঝতে: যোগ্য খাতে রাখা টাকার আসল লাভ শুধু সুদ বা মুনাফা নয়, এর সঙ্গে প্রথম বছরের কর ছাড়ও যোগ হয়।
- ভুল প্রত্যাশা এড়াতে: রিবেটের সীমা না জানলে মনে হতে পারে যত বেশি ইনভেস্ট, তত বেশি ছাড়। আসলে একটা পর্যায়ের পরে বাড়তি ইনভেস্টমেন্টে আর কোনো ছাড় নেই।
- পরিকল্পনার সময় ঠিক করতে: বছরের শেষে তাড়াহুড়া না করে সারা বছর ধরে যোগ্য খাতে টাকা রাখলে বাজেট আর কর দুটোই সহজ হয়।
- ইনভেস্টমেন্ট আর কর আলাদা করে ভাবতে: কোনো খাত নিজে আপনার লক্ষ্যের সঙ্গে মেলে কি না, সেটা আগে; রিবেট পরে।
তিন সীমার নিয়ম
আয়কর আইন ২০২৩ চালু হওয়ার পর রিবেট ছিল এই তিনের মধ্যে সবচেয়ে কমটা: করযোগ্য আয়ের ৩%, যোগ্য ইনভেস্টমেন্টের ১৫%, অথবা ১০ লাখ টাকা। অর্থ বিল ২০২৬-এ ইনভেস্টমেন্টের অংশ ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% আর সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ থেকে কমিয়ে ৭.৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব আসে; পিডব্লিউসির জুলাই ২০২৬-এর সারাংশে এই নতুন হারই (৩%, ১০%, ৭.৫ লাখ) দেখানো হয়েছে।
এই শতাংশ আর সীমা প্রায় প্রতি বাজেটে বদলাতে পারে, আর "করযোগ্য আয়" হিসাবের সময় কিছু আয় (যেমন করমুক্ত আয় বা চূড়ান্ত কর হিসেবে কাটা আয়) বাদ যায়। রিটার্ন জমার আগে সংশ্লিষ্ট বছরের অর্থ আইন বা এনবিআরের নির্দেশনা দেখে নিন।
কোন খাত গণ্য হয়, আর তাদের আলাদা সীমা
ষষ্ঠ তফসিলে মোট ১৪টির মতো খাত আছে, আর অনেক খাতের নিজস্ব সীমাও আছে। এপ্রিল ২০২৬-এর হিসাবে এর কয়েকটা:
- ডিপিএস: বছরে সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত জমা গণ্য।
- সঞ্চয়পত্রসহ সরকারি সিকিউরিটিজ: সর্বোচ্চ ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত।
- লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম: নিজের, স্বামী/স্ত্রীর বা নাবালক সন্তানের পলিসিতে, বিমা অঙ্কের ১০% পর্যন্ত।
- স্বীকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা, সর্বজনীন পেনশন স্কিমে চাঁদা, তালিকাভুক্ত শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড, আর অনুমোদিত দান (যেমন যাকাত ফান্ড বা নির্দিষ্ট হাসপাতাল)।
- অর্থ বিল ২০২৬-এ মেয়াদের আগে যোগ্য ইনভেস্টমেন্ট তুলে নিলে আনুপাতিক হারে বাড়তি কর বসানোর প্রস্তাবও ছিল।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক করযোগ্য আয় ৯,০০,০০০ টাকা, হিসাব করা কর ৬০,০০০ টাকা। বছরে যোগ্য খাতে রাখা হয়েছে: ডিপিএস ৬০,০০০ + লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম ২০,০০০ + সঞ্চয়পত্র ১,০০,০০০ = ১,৮০,০০০ টাকা।
- সীমা ১: করযোগ্য আয়ের ৩% = ২৭,০০০ টাকা। সীমা ২: ইনভেস্টমেন্টের ১০% = ১৮,০০০ টাকা। সীমা ৩: ৭,৫০,০০০ টাকা।
- সবচেয়ে কম সীমা ১৮,০০০ টাকা, তাই রিবেট ১৮,০০০ টাকা। প্রদেয় কর দাঁড়ায় ৬০,০০০ − ১৮,০০০ = ৪২,০০০ টাকা।
ফল: ১,৮০,০০০ টাকা ইনভেস্ট করে কর কমল ১৮,০০০ টাকা। এখানে ইনভেস্টমেন্ট আরও বাড়ালে রিবেট বাড়বে সর্বোচ্চ ২৭,০০০ টাকা পর্যন্ত (আয়ের ৩%), তার বেশি নয়। হার ও সীমা উদাহরণের জন্য ধরা; প্রতি বছর বদলাতে পারে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ভাবা যে ইনভেস্ট করা পুরো টাকাটা আয় বা কর থেকে বাদ যায়। বাদ যায় শুধু তার একটা ছোট শতাংশ, সেটাও সীমার মধ্যে।
- শুধু রিবেটের জন্য এমন কিছুতে টাকা রাখা যা নিজের লক্ষ্য, মেয়াদ বা ঝুঁকির সঙ্গে মেলে না।
- আগের বছরের হার আর সীমা ধরে নিয়ে হিসাব করা। এগুলো বাজেটে প্রায়ই বদলায়।
- ইনভেস্টমেন্টের প্রমাণপত্র (সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, প্রিমিয়ামের রসিদ) না রাখা।
রিবেট হলো তিন সীমার মধ্যে সবচেয়ে ছোটটা, আর তা আসে প্রদেয় কর থেকে: আগে দেখুন ইনভেস্টমেন্টটা আপনার লক্ষ্যের সঙ্গে মেলে কি না, রিবেট তারপর।