ইনফ্লেশন কী
ইনফ্লেশন মানে দেশের পণ্য ও সেবার দামের সাধারণ স্তর সময়ের সঙ্গে বেড়ে যাওয়া। একটা-দুটো জিনিসের দাম বাড়া নয়, বরং চাল, ডাল, তেল, বাসা ভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা, সব মিলিয়ে গড়ে দাম বাড়া। ইনফ্লেশন বছরে ৮% মানে, গত বছর যে জিনিসগুলো কিনতে ১০০ টাকা লাগত, এখন গড়ে প্রায় ১০৮ টাকা লাগে।
উল্টো দিক থেকে দেখলে, ইনফ্লেশন হলো টাকার কেনার ক্ষমতা কমে যাওয়া। নোটের গায়ে লেখা সংখ্যা একই থাকে, কিন্তু তা দিয়ে কেনা যায় কম। তাই সঞ্চয় কাগজে-কলমে না কমলেও আসলে "ছোট" হয়ে যেতে পারে।
ধরা যাক ২০২০ সালে সালমা প্রতি মাসের বাজারে খরচ করতেন ১০,০০০ টাকা। প্রতি বছর গড়ে ৮% করে দাম বাড়লে পাঁচ বছর পরে একই বাজার কিনতে লাগবে প্রায় ১৪,৭০০ টাকা। তাঁর হাতে যদি এখনও ১০,০০০ টাকাই থাকে, তিনি কাগজে কিছু হারাননি, কিন্তু আগের বাজারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম কিনতে পারবেন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- আসল লাভ মাপতে: সুদ বা মুনাফার হার থেকে ইনফ্লেশন বাদ দিলে যা থাকে, সেটাই আপনার টাকার আসল বৃদ্ধি। একে বলে রিয়েল রিটার্ন।
- ঘরে রাখা নগদ টাকার "চুপচাপ ক্ষতি" বুঝতে: ইনফ্লেশন ৮% হলে, ঘরে রাখা টাকার কেনার ক্ষমতা বছরে প্রায় ৮% করে কমে।
- সুদের হার কেন বদলায় বুঝতে: ইনফ্লেশন বেশি হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত পলিসি রেট বাড়ায়। তখন আমানতের সুদ বাড়ে, আর আগে কেনা বন্ডের দাম কমতে পারে।
- লক্ষ্যের হিসাব ঠিক করতে: ১০ বছর পরের কোনো খরচ (পড়াশোনা, বাড়ি, অবসর) আজকের দামে হিসাব করলে অনেক কম ধরা হয়ে যায়।
কীভাবে মাপা হয়
বাংলাদেশে ইনফ্লেশন মাপে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), ভোক্তা মূল্যসূচক বা কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআই) দিয়ে। সাধারণ পরিবার যেসব জিনিস ও সেবা কেনে, তার একটা "ঝুড়ি" ঠিক করা হয়, আর প্রতি মাসে সেগুলোর দাম সংগ্রহ করা হয়। ঝুড়ির মোট দাম কতটা বাড়ল, সেটাই ইনফ্লেশন।
খবরে সাধারণত দুই রকম সংখ্যা আসে। "পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট" মানে এই মাসের দাম গত বছরের একই মাসের তুলনায় কতটা বেশি। "বারো মাসের গড়" মানে গত ১২ মাসের গড় ইনফ্লেশন। খাদ্য আর খাদ্যবহির্ভূত জিনিসের ইনফ্লেশনও আলাদা করে প্রকাশ করা হয়।
- আপনার নিজের ইনফ্লেশন সরকারি হারের চেয়ে কম বা বেশি হতে পারে, কারণ আপনার খরচের ঝুড়ি গড় পরিবারের মতো নয়। যেমন, যাঁর খরচের বড় অংশ বাসা ভাড়া বা সন্তানের পড়াশোনা, তাঁর অভিজ্ঞতা আলাদা হবে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বার্ষিক ইনফ্লেশন মোটামুটি ৫.৫% থেকে ৭.৫%-এর মধ্যে ছিল। এরপর তা বেড়ে ২০২২-এ প্রায় ৭.৭%, ২০২৩-এ প্রায় ৯.৯% আর ২০২৪-এ প্রায় ১০.৫% হয়; ২০২৫-এ কিছুটা কমে প্রায় ৮.৮%।
মাসিক হিসাবে, জুলাই ২০২৪-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ইনফ্লেশন উঠেছিল ১১.৬৬%-এ, যা তখনকার প্রায় ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ বিবিএসের হিসাবে এটা ছিল ৮.৩৪%। সংখ্যাগুলো সময়ের সঙ্গে বদলায়; সর্বশেষ হার বিবিএস প্রতি মাসে প্রকাশ করে।
সূত্র: বিশ্বব্যাংক, FRED-এর মাধ্যমে (দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬)
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| ইনফ্লেশন | |
|---|---|
| ২০১০ | ৮.১% |
| ২০১১ | ১১.৪% |
| ২০১২ | ৬.২% |
| ২০১৩ | ৭.৫% |
| ২০১৪ | ৭.০% |
| ২০১৫ | ৬.২% |
| ২০১৬ | ৫.৫% |
| ২০১৭ | ৫.৭% |
| ২০১৮ | ৫.৫% |
| ২০১৯ | ৫.৬% |
| ২০২০ | ৫.৭% |
| ২০২১ | ৫.৬% |
| ২০২২ | ৭.৭% |
| ২০২৩ | ৯.৯% |
| ২০২৪ | ১০.৫% |
| ২০২৫ | ৮.৮% |
ইনফ্লেশন কেন হয়
- চাহিদা বেশি, জোগান কম: মানুষের হাতে টাকা বেশি থাকলে আর জিনিসপত্র সেই হারে না বাড়লে দাম বাড়ে।
- খরচ বেড়ে যাওয়া: জ্বালানি, কাঁচামাল বা মজুরি বাড়লে উৎপাদকেরা দাম বাড়ান।
- টাকার মান কমা: টাকা দুর্বল হলে আমদানি করা জিনিসের দাম বাড়ে, আর বাংলাদেশ অনেক জিনিস আমদানি করে।
- টাকার জোগান অনেক বেড়ে যাওয়া: অর্থনীতিতে পণ্যের তুলনায় টাকা অনেক দ্রুত বাড়লে প্রতিটি টাকার দাম কমে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ১,০০,০০০ টাকা এক বছরের জন্য বছরে ১০% হারে এফডিআর করলেন। সুদ ১০,০০০ টাকা।
- ধরা যাক ১০% উৎসে কর কাটা হলো: হাতে আসে ৯,০০০ টাকা। মোট ১,০৯,০০০ টাকা।
- একই বছরে ইনফ্লেশন ৯% হলে, বছরের শুরুতে ১,০০,০০০ টাকায় যা কেনা যেত, বছরের শেষে তা কিনতে লাগে ১,০৯,০০০ টাকা।
ফল: টাকার অঙ্ক বাড়লেও কেনার ক্ষমতা প্রায় একই রইল। আসল লাভ প্রায় শূন্য। সহজ নিয়ম: আসল রিটার্ন ≈ করের পর রিটার্ন − ইনফ্লেশন।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "টাকা তো কমেনি, তাই লোকসানও নেই" ভাবা। কেনার ক্ষমতা কমলে সেটাও লোকসান।
- শুধু সুদের হার দেখা, কর আর ইনফ্লেশন বাদ দিয়ে হিসাব না করা।
- ১০–২০ বছর পরের লক্ষ্যের খরচ আজকের দামে হিসাব করা।
- ইনফ্লেশনের ভয়ে হঠাৎ সব টাকা এমন জায়গায় সরানো যার ঝুঁকি ভালো করে বোঝা হয়নি।
টাকার আসল লাভ মাপুন ইনফ্লেশন বাদ দিয়ে: করের পরের রিটার্ন থেকে ইনফ্লেশন বাদ দিলে যা থাকে, সেটাই আসল বৃদ্ধি।