রিট কী
একটা বড় শপিং মল বা অফিস ভবন কিনতে শত শত কোটি টাকা লাগে, যা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। রিট অনেক মানুষের টাকা একসঙ্গে করে এমন সম্পত্তি কেনে বা বানায়, ভাড়া দেয়, আর ভাড়া থেকে খরচ বাদে যা থাকে তার বেশিরভাগ ইউনিটধারীদের দেয়। আপনি পুরো ভবনের মালিক নন, ভবনের আয়ের একটা ছোট ভাগের মালিক।
ধারণাটা প্রথম আইনে আসে আমেরিকায়, ১৯৬০ সালে, যাতে ছোট ইনভেস্টররাও আয় দেওয়া বড় সম্পত্তিতে অংশ নিতে পারেন। এখন প্রায় ৪০টি দেশ ও অঞ্চলে রিটের আইন আছে। আমেরিকায় রিট হিসেবে গণ্য হতে করযোগ্য আয়ের অন্তত ৯০% প্রতি বছর ডিভিডেন্ড হিসেবে দিতে হয়।
ধরা যাক আপনার এলাকায় একটা বড় মার্কেট, যার শত শত দোকান প্রতি মাসে ভাড়া দেয়। আপনি পুরো মার্কেট কিনতে পারবেন না, এমনকি একটা দোকানও হয়তো না। কিন্তু হাজারো মানুষ মিলে যদি মার্কেটটা কিনে, তার দেখাশোনার জন্য একজন পেশাদার ম্যানেজার রাখেন, আর প্রতি বছর ভাড়ার আয় সবার মধ্যে ভাগ করেন, তাহলে অল্প টাকাতেই আপনি মার্কেটের ভাড়ার একটা ভাগ পাবেন। রিট এভাবেই কাজ করে।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- অল্প টাকায় রিয়েল এস্টেট: ফ্ল্যাট বা জমি কিনতে যে বড় অঙ্ক লাগে, রিটে তা লাগে না; আর একসঙ্গে অনেক সম্পত্তিতে ভাগ থাকতে পারে।
- নিয়মিত আয়ের সম্ভাবনা: আয়ের বড় অংশ ভাগ করে দেওয়া বাধ্যতামূলক বলে রিট সাধারণত নিয়মিত ডিভিডেন্ড দেয়, তবে আয় কমলে ডিভিডেন্ডও কমে।
- ঝামেলা কম: ভাড়াটিয়া খোঁজা, মেরামত, কাগজপত্র, এসব ম্যানেজার করেন। বিনিময়ে তিনি ফি নেন।
- ঝুঁকি দুই রকম: সম্পত্তির ঝুঁকি (খালি থাকা, ভাড়া কমা) আর বাজারের ঝুঁকি (ইউনিটের দাম ওঠানামা)।
রিটের ধরন আর ঝুঁকি
বেশিরভাগ রিট নিজেরা সম্পত্তির মালিক হয়ে ভাড়া থেকে আয় করে; এদের বলে ইকুইটি রিট। কিছু রিট সম্পত্তি না কিনে রিয়েল এস্টেটে ধার দেয় বা বন্ধকি ঋণে বিনিয়োগ করে; এদের বলে মর্টগেজ রিট, আর এরা সাধারণত বেশি ধার নিয়ে চলে। কিছু রিট স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, কিছু নয়।
- খালি জায়গা আর ভাড়া: ভাড়াটিয়া চলে গেলে বা ভাড়া কমলে আয় আর ডিভিডেন্ড দুটোই কমে।
- সুদের হার: রিট সাধারণত ধার নিয়েও সম্পত্তি কেনে। সুদের হার বাড়লে ধারের খরচ বাড়ে, আর আয়ের জন্য রিট কেনা ইনভেস্টররা তখন বন্ডের মতো অন্য বিকল্পের দিকেও তাকান।
- বিক্রির সুবিধা: তালিকাভুক্ত রিটের ইউনিট এক্সচেঞ্জে বেচা যায়, তবে দাম তখনকার বাজারদরে। তালিকাভুক্ত নয় এমন রিট সহজে বেচা যায় না; আমেরিকার এসইসির এক সতর্কবার্তায় এমন রিটে শুরুতেই বিনিয়োগের প্রায় ৯–১০% ফি ও কমিশনের কথা বলা হয়েছে।
- ম্যানেজারের ওপর নির্ভরতা: কোন সম্পত্তি কেনা হবে, কত দামে, কত ধার নিয়ে, তা ম্যানেজারের সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশে রিট
বিএসইসি ৩১ মার্চ ২০২৪-এ রিট বিধিমালা অনুমোদন করে, আর চূড়ান্ত বিধিমালা আগস্ট ২০২৪-এ প্রকাশ হয়। এই নিয়মে রিট গঠিত হয় ট্রাস্ট হিসেবে, আর প্রতি বছর বণ্টনযোগ্য নিট আয়ের অন্তত ৯০% নগদ ডিভিডেন্ড হিসেবে দিতে হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের রিট হয় ক্লোজড-এন্ড, ১০ বছর মেয়াদের; ভাড়াভিত্তিক রিট ওপেন-এন্ড, ১৫ বছর মেয়াদের।
নিয়ম তৈরি হলেও অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত আমাদের খোঁজে বাংলাদেশে কোনো রিট চালু হয়ে লেনদেন শুরুর খবর পাওয়া যায়নি। নিয়মকানুন বদলাতে পারে; কোনো রিট এলে বিএসইসি আর স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ তথ্য দেখে নিন।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা রিটের মার্কেট আর অফিস ভবন থেকে বছরে খরচ বাদে বণ্টনযোগ্য আয় ২০ কোটি টাকা। রিটের ইউনিট আছে ১০ কোটি।
- ৯০% ভাগ করে দিলে ১৮ কোটি টাকা: ইউনিটপ্রতি ১.৮০ টাকা। ইউনিটের বাজারদর ১৫ টাকা হলে এটা দামের ১২%।
- পরের বছর কিছু দোকান খালি হলো, আয় নেমে এল ১৫ কোটি টাকায়। ৯০% দিলে ১৩.৫ কোটি: ইউনিটপ্রতি ১.৩৫ টাকা। এমন খবরে ইউনিটের দামও কমতে পারে।
ফল: রিটের ডিভিডেন্ড আসে ভাড়া থেকে, তাই সম্পত্তি কতটা ভাড়া হচ্ছে আর কত দামে, সেটাই আসল। "৯০% দিতে হয়" মানে আয়ের ভাগ, নির্দিষ্ট কোনো অঙ্কের নিশ্চয়তা নয়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "৯০% ভাগ করে দিতে হয়" শুনে নির্দিষ্ট আয় ভাবা। আয় কমলে ডিভিডেন্ডও কমে।
- রিটকে নিজের ফ্ল্যাট বা জমির মতো ভাবা। ইউনিটের দাম শেয়ারের মতো প্রতিদিন ওঠানামা করতে পারে।
- শুধু ডিভিডেন্ডের হার দেখা, কোন সম্পত্তি, কত ধার আর কত খালি জায়গা, তা না দেখা।
- তালিকাভুক্ত নয় এমন রিটে টাকা রেখে ধরে নেওয়া যে দরকার হলেই তোলা যাবে।
রিট মানে বড় সম্পত্তির ভাড়ার আয়ে ছোট ভাগ: আয় আসে ভাড়া থেকে, তাই ভাড়া, ধার আর বাজারদর তিনটাই এর ঝুঁকি।