BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

মানি মার্কেট

যে বাজারে এক দিন থেকে এক বছরের জন্য বড় অঙ্কের টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ সরাসরি খুব কম দেখেন, কিন্তু এখানকার সুদের হার থেকেই এফডিআর আর লোনের হারের দিক বোঝা যায়।

ভিডিও আসছে
মানি মার্কেট: ব্যাংকগুলো রাতারাতি টাকা ধার নেয় কোথায়?

মানি মার্কেট কী

মানি মার্কেট হলো স্বল্পমেয়াদি ধারের বাজার, সাধারণত এক বছর বা তার কম সময়ের জন্য। এখানে প্রধান খেলোয়াড় ব্যাংক, ফাইন্যান্স কোম্পানি, সরকার আর সেন্ট্রাল ব্যাংক। কোনো ব্যাংকের হাতে আজ বাড়তি টাকা আছে, আরেকটার আজ ঘাটতি; মানি মার্কেটে এক রাত বা কয়েক দিনের জন্য সেই টাকা হাতবদল হয়।

এখানে লেনদেন হয় এমন জিনিসে যেগুলো খুব তাড়াতাড়ি নগদ করা যায় আর রিস্ক তুলনামূলক কম, যেমন এক দিনের ধার, সরকারি ট্রেজারি বিল বা সরকারি সিকিউরিটিজ জামানত রেখে ধার। তাই মানি মার্কেটকে বলা হয় অর্থনীতির "নগদ টাকার পাইপলাইন"। লম্বা মেয়াদের টাকা, যেমন শেয়ার বা দীর্ঘমেয়াদি বন্ড, লেনদেন হয় ক্যাপিটাল মার্কেটে।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক ঈদের আগে মানুষ বেতন-বোনাস তুলতে ব্যাংকে ভিড় করছেন। একটা ব্যাংকের এটিএম আর কাউন্টারে আজ অনেক নগদ লাগবে, কিন্তু তার বেশিরভাগ টাকা লোনে দেওয়া। আরেকটা ব্যাংকের হাতে আজ বাড়তি টাকা অলস পড়ে আছে। প্রথম ব্যাংক দ্বিতীয়টার কাছ থেকে এক রাতের জন্য টাকা ধার নিল, পরদিন সুদসহ ফেরত দিল। এটাই মানি মার্কেটের সবচেয়ে চেনা রূপ, কল মানি। ঘটনাটা কাল্পনিক উদাহরণ মাত্র।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • সুদের হারের দিক আগে বুঝতে: কল মানি আর ট্রেজারি বিলের হার সাধারণত আমানত ও লোনের হারের আগে নড়ে। এগুলো বাড়তে থাকলে কিছুদিন পরে এফডিআরের হারও সাধারণত বাড়ে।
  • ব্যাংক খাতের নগদ অবস্থা বুঝতে: কল মানির হার হঠাৎ অনেক বেড়ে গেলে বোঝা যায় ব্যাংকগুলোর হাতে নগদের টান পড়েছে।
  • ট্রেজারি বিল বুঝতে: সাধারণ মানুষও কিছু নিয়মে ট্রেজারি বিল কিনতে পারেন, আর এর ইল্ড ঠিক হয় এই বাজারেই।
  • মনিটারি পলিসি কীভাবে পৌঁছায় বুঝতে: সেন্ট্রাল ব্যাংক প্রথমে মানি মার্কেটের হার নাড়ায়, সেখান থেকে প্রভাব ছড়ায় পুরো অর্থনীতিতে।

বাংলাদেশের মানি মার্কেটের প্রধান অংশ

  • কল মানি: এক ব্যাংক আরেক ব্যাংককে এক দিনের জন্য জামানত ছাড়া ধার দেয়। এর বাইরে ২ থেকে ১৪ দিনের "শর্ট নোটিস" আর ৯০ থেকে ১৮০ দিনের "টার্ম" ধারও আছে। সব মিলিয়ে একে আন্তঃব্যাংক বাজার বলে।
  • রেপো: সরকারি সিকিউরিটিজ বিক্রি করে নির্দিষ্ট দিনে আবার কিনে নেওয়ার চুক্তি, যা আসলে জামানতসহ স্বল্পমেয়াদি ধার। ব্যাংকগুলো একে অন্যের সঙ্গে, আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গেও রেপো করে।
  • ট্রেজারি বিল: সরকারের স্বল্পমেয়াদি ধার। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের হয়ে ১৪, ৯১, ১৮২ আর ৩৬৪ দিনের বিলের নিলাম করে; প্রধান ক্রেতা ব্যাংক।
  • বাংলাদেশ ব্যাংকের বিল ও স্ট্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি: বাজারে টাকা বেশি হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তা টেনে নিতে পারে, কম হলে জামানত রেখে ধার দেয়।

হারগুলো কোথায় থাকে

২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সুদের হারভিত্তিক মনিটারি পলিসির দিকে গেছে, যেখানে একটা "ইন্টারেস্ট রেট করিডোর" থাকে। মাঝখানে পলিসি রেট; ওপরের সীমা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি, যে হারে ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার নিতে পারে; নিচের সীমা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি, যে হারে বাড়তি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখতে পারে। লক্ষ্য হলো কল মানির হার এই দুই সীমার মধ্যে থাকা।

হারগুলো সময়ের সঙ্গে অনেক বদলায়। যেমন, নিলামে ট্রেজারি বিলের ইল্ড ২০২১ সালের এপ্রিলে ছিল ১%-এর আশপাশে বা তারও কম, আর ২০২৫ সালের জুনে ১২%-এর একটু ওপরে। জুলাই ২০২৫-এ এক মাসে কল মানি লেনদেন হয়েছিল প্রায় ১.১৬ লাখ কোটি টাকা। সর্বশেষ হার বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়মিত প্রকাশ করে।

হাতে-কলমে হিসাব

এক রাতের কল মানির সুদ (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক একটা ব্যাংক আরেকটাকে এক রাতের জন্য ১০০ কোটি টাকা ধার দিল, বছরে ১০% হারে।
  2. এক দিনের সুদ = ১০০ কোটি × ১০% ÷ ৩৬৫ ≈ ২৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
  3. পরদিন ধারকারী ব্যাংক ফেরত দেয় প্রায় ১০০ কোটি ২৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

ফল: একদিনের হার শুনতে ছোট, কিন্তু অঙ্ক বড় বলে ব্যাংকের কাছে অলস টাকা এক রাতও ফেলে না রেখে ধার দেওয়া লাভজনক। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • মানি মার্কেটকে শেয়ারবাজারের অংশ ভাবা। এখানে শেয়ার নয়, স্বল্পমেয়াদি ধার লেনদেন হয়।
  • "স্বল্পমেয়াদি" মানেই "রিস্ক শূন্য" ধরে নেওয়া। জামানতহীন ধারে, যেমন কল মানিতে, ধারকারী প্রতিষ্ঠানের রিস্ক থাকে।
  • একদিনের কল মানির হার দেখে ধরে নেওয়া আমানতের হার কালই বদলাবে। প্রভাব পৌঁছাতে সময় লাগে।
  • কোনো একটা সময়ের ট্রেজারি বিলের ইল্ডকে স্থায়ী ধরে নেওয়া; গত কয়েক বছরেই তা অনেক ওঠানামা করেছে।
মনে রাখুন

মানি মার্কেট হলো এক বছরের কম মেয়াদের ধারের বাজার; এখানকার হার দেখে বোঝা যায় আপনার এফডিআর আর লোনের হার কোন দিকে যাচ্ছে।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
কল মানি (এক দিন), শর্ট নোটিস (২–১৪ দিন), টার্ম (৯০–১৮০ দিন) ও জুলাই ২০২৫-এ প্রায় ১.১৬ লাখ কোটি টাকা: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, "Call money borrowing jumps 31.6% in July", ১৮ আগস্ট ২০২৫ ↗
১৪, ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিনের ট্রেজারি বিল: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ৩ নভেম্বর ২০২৫ ↗
এপ্রিল ২০২১-এ ট্রেজারি বিলের ইল্ড (৯১ দিন ০.৫৫%, ৩৬৪ দিন ১.৫৪%): দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২৬ এপ্রিল ২০২১ ↗
জুন ২০২৫-এ ট্রেজারি বিলের ইল্ড ১২%-এর একটু ওপরে: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২ জুন ২০২৫ ↗
সুদের হারভিত্তিক কাঠামোয় যাওয়া (জুলাই–ডিসেম্বর ২০২৩-এর মনিটারি পলিসি): আইএমএফ, "Bangladesh: Technical Assistance Report-Interest Rate Corridor Adoption", ২৮ জুন ২০২৪ ↗
করিডোরের ওপরের ও নিচের সীমা (এসএলএফ ও এসডিএফ): দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, "From BB hand to invisible hand", দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।