দুই রকম রিস্ক
ক্রিপ্টোর রিস্ককে দুই ভাগে ভাবা যায়। প্রথম ভাগ সব দেশেই এক: দামের তীব্র ওঠানামা, গোপন চাবি হারানো, যে প্ল্যাটফর্মে রাখছেন সেটা ভেঙে পড়া, আর প্রতারণা। এগুলো প্রযুক্তি আর বাজারের স্বভাব থেকে আসে।
দ্বিতীয় ভাগ বাংলাদেশের নিজস্ব: এখানে বাংলাদেশ ব্যাংক ক্রিপ্টোতে লেনদেনের অনুমতি দেয়নি। ফলে বিপদে পড়লে আইনি সুরক্ষা বা অভিযোগের নিয়ন্ত্রিত পথ নেই, আর লেনদেনটাই বৈদেশিক মুদ্রা আইনের প্রশ্ন তুলতে পারে।
ধরা যাক রাফি সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিত এক ব্যক্তিকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠিয়ে কিছু ক্রিপ্টো কিনল। এখানে একসঙ্গে কয়েকটা রিস্ক: দাম পড়তে পারে, বিক্রেতা টোকেন না-ও দিতে পারে, ওয়ালেটের চাবি কেউ হাতিয়ে নিতে পারে, আর লেনদেনটা অনুমোদিত পথে হয়নি বলে সমস্যা হলে অভিযোগ করার জায়গাও নেই। ঘটনাটা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- পুরো ছবি দেখতে: শুধু "দাম বাড়বে না কমবে" ভাবলে অর্ধেক রিস্ক চোখের আড়ালে থাকে।
- আইনি অবস্থা জানতে: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা না জেনে লেনদেন করলে আইনি ঝামেলার ঝুঁকি থাকে।
- প্রতারণা চিনতে: ক্রিপ্টোর নামে প্রতারণা বিশ্বজুড়ে বিপুল, আর এর শিকার হলে টাকা ফেরানো প্রায় অসম্ভব।
- ক্ষতির হিসাব বুঝতে: ৮০% পড়ে গেলে শুধু ফিরে আসতে দাম ৪০০% বাড়তে হয়।
যেকোনো দেশেই যে রিস্কগুলো থাকে
- দামের রিস্ক: ক্রিপ্টোর পেছনে কোনো আয় বা সম্পদ নেই, দাম চলে চাহিদা আর মনোভাবে। বড় টোকেনও কয়েক মাসে ৭০–৮০% পড়েছে, ছোট অনেক টোকেন প্রায় শূন্যে নেমেছে।
- চাবি ও কাস্টডির রিস্ক: ওয়ালেটের গোপন চাবি (প্রাইভেট কি বা সিড ফ্রেজ) হারালে বা কেউ জেনে গেলে টাকা ফেরানোর উপায় সাধারণত থাকে না, আর ভুল ঠিকানায় পাঠানো লেনদেন উল্টানো যায় না।
- প্ল্যাটফর্মের রিস্ক: কোনো এক্সচেঞ্জ বা অ্যাপে কয়েন রাখলে সেটা আসলে তাদের হাতে। প্ল্যাটফর্ম দেউলিয়া বা হ্যাক হলে গ্রাহকের টাকা আটকে যেতে পারে; ২০২২ সালে বিদেশের বড় এক্সচেঞ্জেও এমন হয়েছে।
- স্টেবলকয়েনের রিস্ক: ডলারের সমান থাকার কথা বলা "স্টেবলকয়েন"ও সমতা হারাতে পারে। মে ২০২২-এ পর্যাপ্ত সম্পদের ভিত্তি ছাড়া চলা একটি বড় স্টেবলকয়েন ডলারের সঙ্গে সমতা হারায়, আর তার সঙ্গী টোকেন প্রায় শূন্যে নামে। আইএমএফ প্রধান তখন সম্পদের ভিত্তিহীন স্টেবলকয়েনকে "পিরামিড" বলে মন্তব্য করেন।
- প্রতারণার রিস্ক: একটি ব্লকচেইন বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠানের হিসাবে, শুধু ২০২৪ সালেই ক্রিপ্টো প্রতারণায় প্রায় ১,০০০ কোটি ডলার হারিয়েছে মানুষ, আর পুরো হিসাবে তা ১,২০০ কোটি ডলার ছাড়াতে পারে।
বাংলাদেশে আইনি অবস্থা: সময়রেখা
বাংলাদেশে ক্রিপ্টো বৈধ মুদ্রা নয়, আর এর জন্য কোনো লাইসেন্সপ্রাপ্ত এক্সচেঞ্জ বা নিয়ন্ত্রক কাঠামো নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান ধাপে ধাপে এভাবে এসেছে:
- ২০১৪ ও ২০১৭: ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেন না করতে সতর্কবার্তা; বলা হয়, এতে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৪৭, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ ভঙ্গ হতে পারে।
- ২০২১: পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দেওয়া এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ক্রিপ্টো রাখা বা লেনদেন স্বীকৃত না হলেও তা নিজে অপরাধ বলে প্রতীয়মান হয় না; তবে মানি লন্ডারিং বা সন্ত্রাসে অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত হলে বিষয়টা ভিন্ন।
- সেপ্টেম্বর ২০২২: সার্কুলারে সবাইকে ভার্চুয়াল সম্পদ ও মুদ্রায় লেনদেন থেকে বিরত থাকতে বলা হয়, আর ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসকে এতে সহায়তা করতে নিষেধ করা হয়। নির্দেশ অমান্য করে লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারা ২৩(১)-এ দণ্ডনীয় বলা হয়, যেখানে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ডের বিধান আছে।
- অক্টোবর ২০২২: ব্যাংকগুলোকে ক্রিপ্টো লেনদেনে নজরদারি বাড়াতে আর শাখা ও ওয়েবসাইটে নিষেধাজ্ঞার নোটিশ টাঙাতে বলা হয়।
- জুন ২০২৬: অর্থ বিল ২০২৬-এ রিটার্নে দেখানো সোনা, রুপা, গয়না ও "ডিজিটাল কারেন্সি" বিক্রির লাভে ১৫% মূলধনী লাভ কর বসানোর প্রস্তাব আসে। প্রতিবেদনে কোন ডিজিটাল কারেন্সি বোঝানো হয়েছে বা এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান বদলায় কি না, তা স্পষ্ট নয়।
আইনি রিস্ক বাস্তবে কী মানে
অনুমতি না থাকায় ক্রিপ্টোর জন্য কোনো বিনিয়োগকারী সুরক্ষা, আমানত সুরক্ষা বা অভিযোগের নিয়ন্ত্রিত পথ নেই। বিদেশি প্ল্যাটফর্মে কার্ড বা অন্য পথে টাকা পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা আইনের প্রশ্ন তোলে, আর ব্যাংক ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এ ধরনের লেনদেনে নজরদারি আছে।
এই পাতা হালনাগাদ করার সময় (অক্টোবর ২০২৬) ২০২২ সালের সার্কুলার প্রত্যাহারের কোনো ঘোষণা আমরা পাইনি। তবে নিয়ম বদলাতে পারে; সর্বশেষ অবস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেখুন। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য সেই দেশের আইন আলাদা হতে পারে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ১,০০,০০০ টাকার সমপরিমাণ কোনো টোকেন কিনলেন।
- দাম ৮০% পড়লে মূল্য দাঁড়ায় ২০,০০০ টাকা।
- আবার ১,০০,০০০ টাকায় ফিরতে ২০,০০০ টাকাকে ৫ গুণ হতে হবে, অর্থাৎ দাম বাড়তে হবে ৪০০%।
ফল: পতন যত গভীর, ফিরে আসা তত কঠিন: ৫০% পড়লে ১০০% বাড়তে হয়, ৮০% পড়লে ৪০০%, ৯০% পড়লে ৯০০%। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- রিস্ক মানে শুধু দাম ভাবা, চাবি, প্ল্যাটফর্ম আর আইনি রিস্ক উপেক্ষা করা।
- কর প্রস্তাবে "ডিজিটাল কারেন্সি" শব্দ দেখে ধরে নেওয়া যে লেনদেন বৈধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ নির্দেশনা নিজে পড়ে দেখুন।
- "স্টেবলকয়েন" নাম দেখে ধরে নেওয়া যে এর দাম কখনো পড়বে না।
- সিড ফ্রেজ বা পাসওয়ার্ড "সাপোর্ট"-এর নামে কাউকে দেওয়া।
ক্রিপ্টোর রিস্ক শুধু দাম পড়া নয়: চাবি, প্ল্যাটফর্ম, প্রতারণা, আর বাংলাদেশে আইনি অনুমতি না থাকা, সব মিলিয়ে হিসাব করুন।