লং টার্ম বলতে কী বোঝায়
কম্পাউন্ডিং মানে লাভের ওপর লাভ: আজকের রিটার্ন আগামী বছর নিজেও রিটার্ন আনে। এর হিসাব আলাদা পাঠে আছে। এখানে মূল কথা হলো, কম্পাউন্ডিং শুরুতে খুব ধীর, আর সময় যত যায় তত দ্রুত হয়। তাই প্রথম কয়েক বছরে ফল সামান্য মনে হয়, বড় অংশটা আসে শেষের দিকে।
ইনভেস্টমেন্টে "লং টার্ম" বলতে সাধারণত অন্তত পাঁচ-দশ বছর বা তার বেশি বোঝানো হয়, বিশেষ করে শেয়ারের মতো ওঠানামা করা সম্পদের ক্ষেত্রে। এক-দুই বছরে বাজার যেকোনো দিকে যেতে পারে; লম্বা সময়ে ব্যবসার আসল বৃদ্ধি দামের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।
ধরা যাক রিনা ২৫ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা ইনভেস্ট করলেন ১০ বছর, তারপর আর একটা টাকাও দিলেন না। তাঁর বন্ধু রাফি শুরু করলেন ৩৫ বছর বয়সে, প্রতি মাসে একই ২,০০০ টাকা, টানা ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত। বছরে ৮% রিটার্ন ধরলে, ৬০ বছর বয়সে রিনার কাছে থাকে প্রায় ২৬.৯ লাখ টাকা (জমা দিয়েছেন ২.৪ লাখ), আর রাফির কাছে প্রায় ১৯ লাখ টাকা (জমা দিয়েছেন ৬ লাখ)। রিনার ১০ বছরের এগিয়ে থাকা রাফির আড়াই গুণ বেশি জমাকেও হারিয়ে দিল। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- আগে শুরু করার মূল্য বুঝতে: অল্প টাকা দিয়েও আগে শুরু করলে সময় আপনার হয়ে কাজ করে। দেরিতে শুরু করলে সেই ঘাটতি পূরণ করতে অনেক বেশি জমাতে হয়।
- ধৈর্য ধরে রাখতে: কম্পাউন্ডিংয়ের বড় অংশ আসে শেষের বছরগুলোতে। মাঝপথে থেমে গেলে বা বারবার তুলে ফেললে সেই অংশটাই হারায়।
- ওঠানামাকে ঠিকভাবে দেখতে: এক বছরের বড় পতন লম্বা সময়ের হিসাবে প্রায়ই একটা ধাপ মাত্র, যদি সেই টাকা আপনার শিগগির না লাগে।
বাজারে টিকে থাকা বনাম সময় ধরার চেষ্টা
অনেকে ভাবেন, পতনের আগে বেরিয়ে যাবেন আর ওঠার আগে ঢুকবেন। শুনতে সহজ, কিন্তু বাস্তবে খুব কঠিন, কারণ বাজারের সবচেয়ে ভালো দিনগুলো প্রায়ই সবচেয়ে খারাপ দিনগুলোর আশপাশেই আসে। ভয়ে বেরিয়ে গেলে প্রায়ই ঠিক সেই ভালো দিনগুলো হাতছাড়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় ফান্ড প্রতিষ্ঠানের ২০২৪ সালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগের প্রায় ২০ বছরে মার্কিন শেয়ারবাজারের সবচেয়ে ভালো ১০টা দিন মিস করলে শেষ মূল্য প্রায় অর্ধেক হয়ে যেত। আর সেরা ১০ দিনের ৭টাই এসেছিল সবচেয়ে খারাপ ১০ দিনের দুই সপ্তাহের মধ্যে।
সময়ের সঙ্গে ওঠানামা মসৃণ হয়
বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেই দেখা যায় এক বছরের ফল কতটা আলাদা হতে পারে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০১৮ সালে প্রায় ১৩.৮% আর ২০১৯ সালে প্রায় ১৭.৩% কমেছিল, তারপর ২০২০ সালে প্রায় ২১.৩% বেড়েছিল। যিনি ২০১৯-এর শেষে হতাশ হয়ে বিক্রি করেছিলেন, তিনি পরের বছরের ওঠা পাননি।
- লম্বা সময় ঝুঁকি দূর করে না: কোনো বাজার দীর্ঘ সময়েও খারাপ করতে পারে, আর একটা কোম্পানি পুরোপুরি ডুবেও যেতে পারে। তাই লং টার্মের সঙ্গে ডাইভারসিফিকেশনও জরুরি।
- যে টাকা শিগগির লাগবে, তা লং টার্মের জন্য নয়: আগামী এক-দুই বছরের খরচের টাকা ওঠানামা করা সম্পদে রাখলে পতনের সময়েই হয়তো বিক্রি করতে হবে।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৩০ ডিসেম্বর ২০২০
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| বছরের পরিবর্তন | |
|---|---|
| ২০১৮ | -১৩.৮% |
| ২০১৯ | -১৭.৩% |
| ২০২০ | ২১.৩% |
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ১,০০,০০০ টাকা একবারে ইনভেস্ট করলেন, বছরে গড়ে ১০% রিটার্ন ধরে।
- ১০ বছর পরে: প্রায় ২,৫৯,০০০ টাকা। প্রথম দশকে বৃদ্ধি প্রায় ১,৫৯,০০০ টাকা।
- ২০ বছর পরে: প্রায় ৬,৭৩,০০০ টাকা। দ্বিতীয় দশকে বৃদ্ধি প্রায় ৪,১৪,০০০ টাকা।
- ৩০ বছর পরে: প্রায় ১৭,৪৫,০০০ টাকা। তৃতীয় দশকে বৃদ্ধি প্রায় ১০,৭২,০০০ টাকা।
ফল: একই টাকা, একই হার, কিন্তু তৃতীয় দশকে বৃদ্ধি প্রথম দশকের প্রায় সাত গুণ। বাস্তবে রিটার্ন প্রতি বছর সমান হয় না, আর কর, খরচ ও ইনফ্লেশন এখানে বাদ। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "আরও টাকা হলে শুরু করব" ভেবে বছরের পর বছর অপেক্ষা করা। অল্প দিয়ে আগে শুরু করা প্রায়ই বেশি দিয়ে পরে শুরু করার চেয়ে ভালো ফল দেয়।
- বড় পতনে ভয় পেয়ে সব বিক্রি করে দেওয়া, তারপর বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর পরে ফেরা।
- লং টার্মকে "কখনো লোকসান হবে না"র নিশ্চয়তা ভাবা। সময় রিস্ক কমাতে সাহায্য করে, শূন্য করে না।
- শিগগির লাগবে এমন টাকা দীর্ঘমেয়াদি, ওঠানামা করা সম্পদে রাখা।
কম্পাউন্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় উপাদান সময়: আগে শুরু করুন, শিগগির যে টাকা লাগবে না সেটাই দীর্ঘমেয়াদে রাখুন, আর ওঠানামায় ধৈর্য ধরুন।