ব্রোকার কী
ব্রোকার হলো এমন প্রতিষ্ঠান, যার এক্সচেঞ্জে লেনদেন করার অধিকার আছে আর যে অন্যের হয়ে শেয়ার কেনাবেচা করে। আপনি ব্রোকারকে বলেন কোন শেয়ার, কতগুলো, কোন দামে কিনতে বা বেচতে চান; ব্রোকার সেটা এক্সচেঞ্জের সিস্টেমে বসিয়ে দেয়। এখন বেশিরভাগ ব্রোকারের অ্যাপ বা ওয়েবসাইট আছে, তাই অর্ডার নিজেই দেওয়া যায়, কিন্তু সেটা যায় ব্রোকারের মাধ্যমেই।
ব্রোকার শুধু অর্ডার পাঠায় না। সে আপনার জমা দেওয়া টাকার হিসাব রাখে, কেনার সময় দাম পরিশোধ করে, বিক্রির টাকা আপনার হিসাবে জমা করে, আর আপনাকে স্টেটমেন্ট দেয়। অনেক ব্রোকার ডিপজিটরি পার্টিসিপেন্ট হিসেবে আপনার বিও অ্যাকাউন্টও খুলে দেয়।
বাজারে আলু কিনতে গেলে আপনি সরাসরি কৃষকের কাছে যান না, যান আড়তদারের কাছে, যার পাইকারি বাজারে ঢোকার জায়গা আছে। শেয়ার বাজারে ব্রোকার অনেকটা তেমন: এক্সচেঞ্জে ঢোকার "চাবি" তার কাছে। পার্থক্য হলো, ব্রোকার নিজে শেয়ারটা কিনে আপনাকে বেচে না; সে আপনার হয়ে কেনে, আর শেয়ারটা সরাসরি আপনার নামে জমা হয়।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- খরচ বুঝতে: প্রতিটি কেনা ও বেচায় কমিশন কাটে। ঘন ঘন লেনদেন করলে এই ছোট খরচগুলো মিলে বড় হয়।
- টাকার নিরাপত্তা বুঝতে: আপনার শেয়ার থাকে আপনার বিও অ্যাকাউন্টে, কিন্তু অব্যবহৃত নগদ টাকা থাকে ব্রোকারের রাখা একটা ব্যাংক হিসাবে। এই পার্থক্য জানা দরকার।
- নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে: ব্রোকারের কাজ অর্ডার কার্যকর করা। কোন শেয়ার কিনবেন, সেই দায় আপনার, ব্রোকার বা তার কর্মীর "টিপস"-এর নয়।
- সমস্যা হলে কোথায় যাবেন জানতে: ব্রোকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ যায় এক্সচেঞ্জ আর বিএসইসির কাছে।
বাংলাদেশে কারা ব্রোকার
বাংলাদেশে এক্সচেঞ্জে লেনদেন করতে একটা প্রতিষ্ঠানের লাগে ট্রেক (ট্রেডিং রাইট এনটাইটেলমেন্ট সার্টিফিকেট), অর্থাৎ ডিএসই বা সিএসইতে লেনদেনের অধিকার সনদ, আর বিএসইসির নিবন্ধন। ২০২০ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী তখন ডিএসইতে ২৫০টি আর সিএসইতে ১৪৮টি ট্রেক ছিল; এরপর নতুন অনেক লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, তাই সংখ্যা বদলায়। কোনো ব্রোকারের সঙ্গে কাজ শুরুর আগে দেখে নিন সেটা নিবন্ধিত কি না।
আপনার জমা দেওয়া নগদ টাকা ব্রোকার রাখে "কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট" (সিসিএ) নামে একটা আলাদা ব্যাংক হিসাবে। নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা শুধু ক্লায়েন্টের শেয়ার কেনা বা ক্লায়েন্টের পাওনা কমিশন-ফি কাটার জন্য ব্যবহার করা যায়। তবু অতীতে কিছু ব্রোকারের বিরুদ্ধে এই টাকা অন্য কাজে সরানোর অভিযোগ উঠেছে, আর রেগুলেটর এখন সিসিএর অবস্থা প্রতিদিন হালনাগাদ করার মতো নিয়ম চালু করছে।
খরচগুলো কী কী
- কমিশন: প্রতিটি কেনা ও বেচার মূল্যের একটা ছোট শতাংশ। হার ব্রোকারভেদে আলাদা, তাই লিখিতভাবে জেনে নিন।
- লেনদেনের ওপর কর: শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ইউনিটের লেনদেন মূল্যের ওপর একটা ছোট কর উৎসে কাটা হয় (প্রতিবেদন অনুযায়ী ০.০৫%), যা ব্রোকারের বিলে দেখা যায়। হারটা অর্থ আইনে বদলাতে পারে।
- বিও অ্যাকাউন্টের বার্ষিক ফি আর কিছু ক্ষেত্রে সিডিবিএল চার্জ।
- মার্জিন লোন নিলে তার সুদ। ধার করা টাকায় শেয়ার কিনলে লাভ-লোকসান দুটোই বড় হয়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক ৫০ টাকা দরে ২০০টা শেয়ার কিনলেন: দাম ১০,০০০ টাকা। ধরা যাক কমিশন ০.৪%: ৪০ টাকা। মোট খরচ ১০,০৪০ টাকা।
- পরে ৫১ টাকা দরে বেচলেন: ১০,২০০ টাকা। কমিশন ০.৪%: প্রায় ৪১ টাকা। হাতে আসে প্রায় ১০,১৫৯ টাকা।
- দামের লাভ ২০০ টাকা, কিন্তু দুই দিকের কমিশন প্রায় ৮১ টাকা। আসল লাভ প্রায় ১১৯ টাকা।
ফল: ছোট দামের ওঠানামায় ঘন ঘন কেনাবেচা করলে লাভের বড় অংশ কমিশনেই চলে যায়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র; সঙ্গে লেনদেনের করও কাটে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- ব্রোকারকে নিজের পাসওয়ার্ড দিয়ে বা মৌখিক অনুমতি দিয়ে "আপনিই কেনাবেচা করে দিন" বলা। পরে অননুমোদিত লেনদেন প্রমাণ করা কঠিন হয়।
- ব্রোকারের স্টেটমেন্ট সিডিবিএলের স্টেটমেন্টের সঙ্গে মিলিয়ে না দেখা।
- শুধু কম কমিশন দেখে ব্রোকার বেছে নেওয়া, নিবন্ধন, সেবা আর অভিযোগের ইতিহাস না দেখে।
- ব্রোকারের কর্মীর "নিশ্চিত লাভের" টিপসে কেনা।
ব্রোকার আপনার অর্ডার এক্সচেঞ্জে পৌঁছায় আর টাকার হিসাব রাখে; খরচ, নিবন্ধন আর স্টেটমেন্ট নিজে যাচাই করুন, সিদ্ধান্তও নিজে নিন।