BETAসাইটটি এখনো তৈরি হচ্ছে; অনেক কিছু বদলাতে পারে

লেন্ডার অব লাস্ট রিসর্ট (শেষ ভরসার ঋণদাতা)

কোনো ব্যাংকের কাছে যখন আর কোথাও থেকে টাকা ধার পাওয়ার উপায় থাকে না, তখন সেন্ট্রাল ব্যাংক শেষ ভরসা হিসেবে তাকে ধার দিতে পারে। উদ্দেশ্য একটা ব্যাংককে নয়, পুরো ব্যবস্থাকে আতঙ্ক থেকে রক্ষা করা।

ভিডিও আসছে
ব্যাংকে হঠাৎ টাকা ফুরোলে কে বাঁচায়?

লেন্ডার অব লাস্ট রিসর্ট কী

ব্যাংক আপনার আমানতের পুরো টাকা ভল্টে রেখে দেয় না। বেশিরভাগ টাকা লোন হিসেবে দেওয়া থাকে, যা কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে ফেরত আসবে। তাই সব আমানতকারী একসঙ্গে টাকা তুলতে চাইলে খুব শক্ত ব্যাংকেরও হাতে নগদ টাকা কম পড়ে। একে বলে লিকুইডিটি সংকট, মানে সম্পদ আছে কিন্তু এই মুহূর্তে নগদ নেই।

এমন সময় সেন্ট্রাল ব্যাংক জামানত রেখে ওই ব্যাংককে নগদ টাকা ধার দিতে পারে, যাতে আমানতকারীরা টাকা পান আর আতঙ্ক অন্য ব্যাংকে না ছড়ায়। যেহেতু আর কেউ ধার না দিলেও সেন্ট্রাল ব্যাংক দিতে পারে, তাই তাকে বলে "লেন্ডার অব লাস্ট রিসর্ট" বা শেষ ভরসার ঋণদাতা। বাংলাদেশে এই ভূমিকা বাংলাদেশ ব্যাংকের।

একটা উদাহরণ

ধরা যাক কোনো এলাকায় গুজব ছড়াল যে একটা ব্যাংক "ডুবে যাচ্ছে"। গুজব সত্যি না হলেও সকাল থেকে কাউন্টারে লম্বা লাইন। ব্যাংকের লোন আর সরকারি বন্ড ঠিকঠাক আছে, কিন্তু সেগুলো আজই নগদ করা যায় না। ব্যাংক বন্ডগুলো জামানত রেখে সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে নগদ ধার নিল, সবাই টাকা পেলেন, কয়েক দিনে লাইন ছোট হয়ে গেল। ঘটনাটা কাল্পনিক উদাহরণ মাত্র।

একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি

  • আতঙ্ক কীভাবে ছড়ায় বুঝতে: ব্যাংকে "রান" অনেক সময় গুজব থেকে শুরু হয়, আর এক ব্যাংক থেকে আরেক ব্যাংকে ছড়াতে পারে। শেষ ভরসার ঋণদাতা এই চেইন থামানোর একটা উপায়।
  • লিকুইডিটি আর সলভেন্সির পার্থক্য বুঝতে: সাময়িক নগদ সংকট আর লোকসানে মূলধন শেষ হয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়। সেন্ট্রাল ব্যাংকের ধার প্রথমটার জন্য, দ্বিতীয়টার জন্য আলাদা ব্যবস্থা লাগে।
  • নিজের আমানতের সুরক্ষা জানতে: আমানত সুরক্ষা আইনে প্রতি আমানতকারী একটা সীমা পর্যন্ত টাকা ফেরত পান। সীমা জানলে বড় অঙ্ক কোথায় কীভাবে রাখবেন, ভাবতে সুবিধা হয়।
  • বাজারের খবর পড়তে: "বিশেষ তারল্য সহায়তা" বা "রেপোর মাধ্যমে ধার" ধরনের খবর আসলে এই ভূমিকারই অংশ।

বাজহটের নিয়ম

ব্রিটিশ সাংবাদিক ওয়াল্টার বাজহট ১৮৭৩ সালে "লম্বার্ড স্ট্রিট" বইয়ে এই ধারণার সবচেয়ে বিখ্যাত নিয়মটা লিখেছিলেন। আজও বিশ্বের সেন্ট্রাল ব্যাংকগুলো এটাকে ভিত্তি হিসেবে ধরে।

  • আতঙ্কের সময় দ্রুত ও উদারভাবে ধার দাও, যাতে "টাকা নেই" এই ভয়টাই চলে যায়।
  • কিন্তু উঁচু সুদে দাও, যাতে শুধু যাদের সত্যিই দরকার তারাই নেয়, আর সংকট কেটে গেলে ব্যাংক নিজেই অন্য উৎসে ফিরে যায়।
  • শুধু ভালো জামানতের বিপরীতে দাও, যেমন সরকারি বন্ড, যাতে সহজে বেচা যায় এমন সম্পদ। এতে সাময়িক সংকটে পড়া সুস্থ ব্যাংককে সাহায্য করা যায়, স্থায়ীভাবে দুর্বল ব্যাংককে নয়।

বাংলাদেশে কীভাবে কাজ করে

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২ অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দিষ্ট জামানতের বিপরীতে শিডিউলড ব্যাংককে স্বল্পমেয়াদি ধার দিতে পারে, আর বিশেষ পরিস্থিতিতে বোর্ড বা গভর্নর উপযুক্ত মনে করলে অন্য জামানতেও ধার দিতে পারে। সাধারণ দিনগুলোতে ব্যাংকগুলো রেপো বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির মতো ব্যবস্থায় সরকারি সিকিউরিটিজ জামানত রেখে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অল্প সময়ের জন্য টাকা নেয়।

আমানতকারীদের জন্য আরেকটা নিরাপত্তা জাল হলো আমানত সুরক্ষা। আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ অনুযায়ী কোনো সদস্য ব্যাংক অবসায়িত হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে প্রত্যেক আমানতকারী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পান, যা আগের আইনে ছিল ১ লাখ টাকা। বাকি টাকার দাবি অবসায়কের কাছে করতে হয়। ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোকে ১ জুলাই ২০২৮-এর মধ্যে এর সদস্য হতে হবে। সীমা প্রতি তিন বছরে পর্যালোচনা হবে, তাই বদলাতে পারে।

এই ভূমিকার সীমা

  • সেন্ট্রাল ব্যাংকের ধার সাময়িক নগদ সংকটের জন্য। যে ব্যাংকের লোন বড় আকারে খেলাপি হয়ে মূলধন শেষ, তাকে শুধু ধার দিয়ে ঠিক করা যায় না।
  • অর্থনীতিবিদেরা একে "মোরাল হ্যাজার্ড" বলেন: ব্যাংক যদি ধরে নেয় বিপদে পড়লে সবসময় সাহায্য মিলবে, তারা বেশি রিস্ক নিতে পারে। তাই উঁচু সুদ আর কড়া জামানতের শর্ত।
  • বড় অঙ্কের জরুরি ধার দিতে সেন্ট্রাল ব্যাংক নতুন টাকা তৈরি করে, যা অনেক বেশি হলে ইনফ্লেশনের চাপ বাড়াতে পারে। কতটা দেওয়া উচিত, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকে।

হাতে-কলমে হিসাব

একটা ব্যাংকে "রান" (শুধু হিসাব বোঝার জন্য)
  1. ধরা যাক একটা ব্যাংকের আমানত ১,০০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে নগদ ও সেন্ট্রাল ব্যাংকে জমা ১০০ কোটি, সরকারি বন্ড ২০০ কোটি, আর লোন ৮০০ কোটি টাকা (বাকিটা মালিকদের মূলধন)।
  2. গুজবে এক সপ্তাহে আমানতকারীরা ২৫০ কোটি টাকা তুলতে চাইলেন। হাতের নগদ ১০০ কোটি দিয়ে মেটানো যায় না; ঘাটতি ১৫০ কোটি।
  3. লোনগুলো আজই বেচা যায় না, তাড়াহুড়ো করে বেচলে বড় লোকসান। কিন্তু ২০০ কোটির বন্ড জামানত রেখে সেন্ট্রাল ব্যাংক থেকে ১৫০ কোটি টাকা ধার নেওয়া যায়।

ফল: সব আমানতকারী টাকা পেলেন, ব্যাংকের লোন বাঁচল, আতঙ্ক থামল। লোন ফেরত আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক সেন্ট্রাল ব্যাংকের ধার শোধ করে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।

যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়

  • ভাবা যে সেন্ট্রাল ব্যাংক যেকোনো ব্যাংককে যেকোনো অবস্থায় বাঁচাবে। এই ভূমিকা সাময়িক নগদ সংকটের জন্য, আর শর্তসাপেক্ষ।
  • আমানত সুরক্ষার সীমাকে প্রতিটি অ্যাকাউন্টের সীমা ভাবা। আইন অনুযায়ী এটা একটা প্রতিষ্ঠানে একজন আমানতকারীর সব হিসাব মিলিয়ে।
  • গুজব শুনেই তাড়াহুড়ো করে মেয়াদের আগে আমানত ভাঙানো, ভালো করে খোঁজ না নিয়ে। আতঙ্ক নিজেই সংকট তৈরি করতে পারে।
  • ব্যাংক আর ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানত সুরক্ষাকে একই সময় থেকে একই রকম ধরে নেওয়া; ফাইন্যান্স কোম্পানির সদস্যপদ চালু হওয়ার সময়সীমা আলাদা।
মনে রাখুন

সেন্ট্রাল ব্যাংক আতঙ্কের সময় জামানতের বিপরীতে ব্যাংককে নগদ ধার দিয়ে পুরো ব্যবস্থা রক্ষা করে, কিন্তু খারাপ ব্যবস্থাপনার লোকসান মুছে দেওয়া তার কাজ নয়।

এর সঙ্গে আরও পড়ুন

সূত্র
বাজহটের নিয়ম (লম্বার্ড স্ট্রিট, ১৮৭৩): ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক, টমাস সি. ব্যাক্সটার জুনিয়রের বক্তৃতা, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ↗
শিডিউলড ব্যাংককে ধার (অনুচ্ছেদ ১৬ ও ১৭): বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার ১৯৭২, বাংলাদেশ আইন (bdlaws), দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ও জামানতের বিপরীতে ধার: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, "From BB hand to invisible hand: IMF looks to streamline standing lending and deposit facilities", দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
বাংলাদেশ ব্যাংক শেষ ভরসার ঋণদাতা:বাংলাপিডিয়া, "Bangladesh Bank", দেখা হয়েছে অক্টোবর ২০২৬ ↗
২ লাখ টাকা সীমা (আগে ১ লাখ), তিন বছরে পর্যালোচনা, ফাইন্যান্স কোম্পানির সদস্যপদ ১ জুলাই ২০২৮: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, "Parliament passes bill to safeguard depositors’ interests", ১০ এপ্রিল ২০২৬ ↗
আইনটি ১০ এপ্রিল ২০২৬ রাষ্ট্রপতির সম্মতি পায়, তহবিল পরিচালনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড নিয়ে গঠিত ট্রাস্টি বোর্ড: ঢাকা ট্রিবিউন (বাসস), ৬ মে ২০২৬ ↗
এক প্রতিষ্ঠানে একজন আমানতকারীর সব হিসাব মিলিয়ে সীমা: আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর খসড়া, ঢাকা ট্রিবিউন, ২৪ মার্চ ২০২৫ ↗
এটি শিক্ষামূলক তথ্য, ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইস নয়। সংখ্যাগুলো উল্লেখ করা সময়ের; আজকের তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জেনে নিন।