অ্যাঙ্করিং কী
অ্যাঙ্করিং হলো এমন একটা মানসিক ঝোঁক, যেখানে কোনো কিছুর মূল্য আন্দাজ করার সময় আমরা প্রথমে শোনা বা দেখা একটা সংখ্যা থেকে শুরু করি, তারপর সেখান থেকে যথেষ্ট সরতে পারি না। সংখ্যাটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও এটা ঘটে।
এটা বোকামির ব্যাপার নয়; মানুষের মস্তিষ্ক এভাবেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ইনভেস্টিংয়ে যেখানে দাম প্রতিদিন বদলায় আর পুরোনো সংখ্যার ছড়াছড়ি, সেখানে এই শর্টকাট আমাদের ভুল দিকে টানতে পারে।
ধরা যাক নিউমার্কেটে একটা শার্টের দাম দোকানদার চাইলেন ২,০০০ টাকা। অনেক দরদাম করে আপনি কিনলেন ১,২০০ টাকায়, আর মনে হলো জিতে গেছেন। কিন্তু পাশের দোকানে একই শার্ট হয়তো শুরু থেকেই ৮০০ টাকা। আপনার "জয়" মাপা হয়েছে দোকানদারের বলা প্রথম সংখ্যা থেকে, শার্টের আসল মূল্য থেকে নয়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- কেনা দামে আটকে থাকা: শেয়ারের দাম কেনা দামের নিচে নামলে "অন্তত কেনা দামে ফিরুক, তারপর বেচব" ভাবনা আসে, যদিও বাজার আপনার কেনা দাম জানে না।
- পুরোনো সর্বোচ্চ দামকে "আসল দাম" ভাবা: একসময় ৯০ টাকা ছিল বলে ৫০ টাকাকে সস্তা মনে হয়, অথচ কোম্পানির অবস্থা হয়তো বদলে গেছে।
- ফেস ভ্যালু বা আইপিও দামকে মাপকাঠি বানানো: ১০ টাকা ফেস ভ্যালুর কাছে দাম দেখে "এর নিচে আর নামবে না" ভাবা।
- গুজব বা টার্গেট প্রাইসে বাঁধা পড়া: কেউ "এটা ২০০ টাকায় যাবে" বললে সেই সংখ্যা মাথায় বসে যায়, যুক্তি না থাকলেও।
ভাগ্যের চাকার সেই পরীক্ষা
১৯৭৪ সালে মনোবিজ্ঞানী আমোস টভারস্কি আর ড্যানিয়েল কানেম্যান একটা মজার পরীক্ষা করেন। একটা "ভাগ্যের চাকা" ঘোরানো হতো, যা আসলে থামত হয় ১০-এ, নয়তো ৬৫-তে। তারপর অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞেস করা হতো, জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর কত শতাংশ আফ্রিকার?
যাঁদের চাকা ১০-এ থেমেছিল, তাঁদের আন্দাজের মাঝামাঝি মান (মিডিয়ান) ছিল ২৫%। যাঁদের চাকা ৬৫-তে থেমেছিল, তাঁদের ৪৫%। সবাই জানতেন চাকার সংখ্যাটা এলোমেলো, তবু সেটাই তাঁদের উত্তর টেনে নিয়ে গেছে। ভাবুন, একটা অর্থহীন সংখ্যা যদি এতটা প্রভাব ফেলে, তাহলে নিজের কেনা দামের মতো "অর্থপূর্ণ মনে হওয়া" সংখ্যা কতটা ফেলে।
নোঙর আলগা করার অভ্যাস
- নিজেকে প্রশ্ন করুন: "এই শেয়ারটা যদি আজ আমার না থাকত, এই দামে কি কিনতাম?" এই প্রশ্নে কেনা দাম বাদ পড়ে যায়।
- দাম দেখার আগে নিজের হিসাব করুন: কোম্পানির আয়, নগদ, ধার দেখে আগে একটা মূল্যের পরিসর ভাবুন, তারপর বাজারদর দেখুন।
- একটা সংখ্যার বদলে পরিসর ভাবুন: "৪০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে কোথাও" ভাবা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় আটকে থাকার চেয়ে নিরাপদ।
- কেনার সময়ই লিখে রাখুন কেন কিনছেন, আর কোন অবস্থায় বেচবেন। পরে সিদ্ধান্ত নিন সেই কারণ দেখে, কেনা দাম দেখে নয়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক রিনা একটা শেয়ার কিনেছিলেন ১০০ টাকায়। দাম ৪০% কমে এখন ৬০ টাকা।
- আবার ১০০ টাকায় ফিরতে হলে ৬০ টাকা থেকে বাড়তে হবে ৪০ টাকা। ৪০ ÷ ৬০ ≈ ০.৬৭, মানে প্রায় ৬৭% বৃদ্ধি।
- বাজার রিনার ১০০ টাকা জানে না। শেয়ারটা ৬৭% উঠবে কি না, তা নির্ভর করে কোম্পানির ব্যবসার ওপর, কেনা দামের ওপর নয়।
ফল: আসল প্রশ্ন "কবে ১০০-তে ফিরবে" নয়, বরং "আজকের ৬০ টাকায় এই কোম্পানি রাখার মতো কি না"। কেনা দাম শুধু আপনার লাভ-লোকসানের হিসাবের জন্য; সামনে কী হবে, তা বলে না। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু কেনা দামে ফেরার আশায় শেয়ার ধরে রাখা, কোম্পানির অবস্থা আর না দেখে।
- আগের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় অনেক কম বলে কোনো শেয়ারকে "সস্তা" ধরে নেওয়া।
- কারও বলা টার্গেট প্রাইস বা গুজবের সংখ্যাকে নিজের হিসাবের শুরু বানানো।
- ভাবা যে "আমি জানি তো, তাই আমার ওপর কাজ করবে না"। পরীক্ষায় দেখা গেছে, সংখ্যাটা অর্থহীন জেনেও মানুষ তার টানে পড়ে।
বাজার আপনার কেনা দাম জানে না: প্রতিটি সিদ্ধান্তের আগে জিজ্ঞেস করুন, আজ নতুন করে এই দামে কি কিনতাম?