বন্ড ফান্ড কী
বন্ড ফান্ড হলো এক ধরনের মিউচুয়াল ফান্ড, যা মূলত সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড, কোম্পানির বন্ড, সুকুক আর মেয়াদি আমানতের মতো ধার-ভিত্তিক সম্পদে টাকা রাখে। আপনি ফান্ডের ইউনিট কেনেন, আর ফান্ড যে সুদ বা মুনাফা পায় এবং বন্ডের দাম যতটা ওঠানামা করে, তার ভাগ আপনার ইউনিটের মূল্যে (এনএভি) প্রতিফলিত হয়।
একটা বন্ড সরাসরি কিনলে তার একটা মেয়াদ থাকে: মেয়াদ শেষে ইস্যুকারী ঠিকমতো শোধ করলে আপনি মূল টাকা ফেরত পান। বন্ড ফান্ডের সাধারণত কোনো মেয়াদ নেই। পুরোনো বন্ডের মেয়াদ শেষ হলে ফান্ড নতুন বন্ড কেনে, তাই নির্দিষ্ট কোনো দিনে নির্দিষ্ট টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি থাকে না।
ধরা যাক রফিক তাঁর ভাইকে ২ বছরের জন্য ধার দিলেন, শর্ত লেখা আছে, মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত। এটা একটা বন্ডের মতো। এখন ধরা যাক রফিক ও আরও অনেকে মিলে একটা তহবিল বানালেন, যেটা একসঙ্গে শত শত মানুষকে নানা মেয়াদে ধার দেয়, আর পুরোনো ধার শোধ হলেই নতুন ধার দেয়। রফিকের ভাগের মূল্য প্রতিদিন হিসাব হয়, কিন্তু "কবে কত ফেরত পাবেন" তার নির্দিষ্ট দিন নেই। এটাই বন্ড ফান্ড।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- "ফিক্সড" মানে নিশ্চিত নয়: এফডিআরের মতো নির্দিষ্ট সুদের হার নেই। ইন্টারেস্ট রেট বাড়লে এনএভি কমতে পারে, আর কোনো ইস্যুকারী শোধ না করলে লোকসানও হতে পারে।
- অল্প টাকায় অনেক বন্ড: ট্রেজারি বন্ড বা কর্পোরেট বন্ড একা কিনতে যে প্রক্রিয়া আর অঙ্ক লাগে, ফান্ডে তার চেয়ে সহজে আর অল্প টাকায় অনেক বন্ডে ছড়িয়ে রাখা যায়।
- সহজে টাকা তোলা: ওপেন-এন্ড ফান্ডের ইউনিট সাধারণত যেকোনো সময় এনএভিভিত্তিক দামে ফেরত দেওয়া যায়, তবে দাম তখনকার এনএভি অনুযায়ী।
- নাম নয়, ভেতরে কী আছে: কিছু "ফিক্সড ইনকাম" ফান্ডের বড় অংশ শেয়ারেও থাকতে পারে। ঝুঁকি বুঝতে পোর্টফোলিও দেখতে হয়।
রেট বদলালে এনএভি কেন বদলায়
বাজারে ইন্টারেস্ট রেট বাড়লে নতুন বন্ড বেশি সুদ দেয়, তাই আগের কম সুদের বন্ডের দাম কমে যায়। রেট কমলে উল্টোটা হয়। বন্ড ফান্ডের হাতে অনেক বন্ড, তাই এই দাম বদল সরাসরি এনএভিতে আসে। আমেরিকার এসইসির একটা উদাহরণে, ৩% সুদের ১,০০০ ডলারের বন্ডের দাম বাজারের রেট ৪% হলে নেমে যায় প্রায় ৯২৫ ডলারে।
কতটা ওঠানামা করবে, তার একটা মোটা আন্দাজ দেয় "ডিউরেশন", যা ফান্ডের ফ্যাক্ট শিটে দেওয়া থাকতে পারে। ফিনরার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ডিউরেশন ১০ বছর হলে রেট ১% বাড়লে ফান্ডের মূল্য প্রায় ১০% কমতে পারে; ডিউরেশন ২ বছর হলে প্রায় ২%। দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ফান্ড তাই বেশি দোলে, স্বল্পমেয়াদি বন্ডের ফান্ড কম।
বাংলাদেশে ফিক্সড ইনকাম ফান্ড
নভেম্বর ২০২৪-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার আগের দুই বছরে দেশে ছয়টি ওপেন-এন্ড ফিক্সড ইনকাম ফান্ড চালু হয়। এদের বেশিরভাগ সম্পদ ছিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে; তখন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ১২.৫%-এর ওপরে উঠেছিল। ছয়টির মধ্যে পাঁচটির বার্ষিক হিসাবে রিটার্ন ছিল মোটামুটি ৯% থেকে ১০%-এর একটু বেশি।
একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, একটা ফান্ডের রিটার্ন মূলধন কমে যাওয়ায় প্রায় ৪.৫%-এ নেমেছিল, আর আরেকটা "ফিক্সড ইনকাম" ফান্ডের প্রায় অর্ধেক সম্পদ ছিল শেয়ারে। অর্থাৎ একই নামের ফান্ডের ঝুঁকি আর ফল অনেক আলাদা হতে পারে। এগুলো একটা নির্দিষ্ট সময়ের সংখ্যা; সামনের রিটার্ন রেটের ওপর নির্ভর করে বদলাবে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা বন্ড ফান্ডের এনএভি ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা, ডিউরেশন ৪ বছর, আর ফান্ডের বন্ডগুলো গড়ে বছরে ১০% ইল্ড দিচ্ছে। আপনার আছে ১০,০০০ ইউনিট, মূল্য ১,০০,০০০ টাকা।
- হঠাৎ বাজারে রেট ১% বাড়ল। আন্দাজ: এনএভি প্রায় ৪% কমে ৯.৬০ টাকা। আপনার ইউনিটের মূল্য প্রায় ৯৬,০০০ টাকা।
- ভালো দিক: ফান্ড এখন নতুন বন্ড কিনবে প্রায় ১১% ইল্ডে। বছরে প্রায় ১% বাড়তি আয় দিয়ে ৪% ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মোটামুটি ডিউরেশনের সমান, প্রায় ৪ বছর লাগতে পারে।
ফল: রেট বাড়লে বন্ড ফান্ডে স্বল্প সময়ে লোকসান হতে পারে, আর লম্বা সময় ধরে রাখলে বাড়তি ইল্ড সেটা পুষিয়ে দিতে পারে। আপনার সময়সীমা ফান্ডের ডিউরেশনের চেয়ে ছোট হলে ঝুঁকি বেশি। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র, আর ডিউরেশনের হিসাব শুধু মোটা আন্দাজ।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- বন্ড ফান্ডকে এফডিআরের মতো নির্দিষ্ট সুদের জিনিস ভাবা। এনএভি কমতেও পারে।
- শুধু গত কয়েক মাসের বার্ষিক রিটার্ন দেখে ধরে নেওয়া সামনেও সেটাই থাকবে। রেট বদলালে রিটার্নও বদলায়।
- নাম দেখে ধরে নেওয়া ফান্ডে শুধু বন্ড আছে। কিছু ফান্ড শেয়ারেও বড় অংশ রাখে।
- অল্প দিনের জন্য রাখা টাকা লম্বা ডিউরেশনের ফান্ডে রাখা, তারপর রেট বাড়লে লোকসানে তুলে নেওয়া।
বন্ড ফান্ড অনেক বন্ডের একটা ঝুড়ি, যার কোনো মেয়াদ নেই: রেট বাড়লে এনএভি কমে, আর কতটা কমবে তার আন্দাজ দেয় ডিউরেশন।