মার্কেট রিস্ক কী
শেয়ারের রিস্ককে দুই ভাগে ভাবা যায়। একটা কোম্পানির নিজস্ব রিস্ক: ব্যবস্থাপনার ভুল, একটা পণ্যের চাহিদা কমা, কারখানায় দুর্ঘটনা। অন্যটা মার্কেট রিস্ক: এমন ঘটনা যা প্রায় সব কোম্পানিকে একসঙ্গে ছুঁয়ে যায়, যেমন অর্থনৈতিক মন্দা, সুদের হার বাড়া, মহামারি বা বাজারজুড়ে আতঙ্ক।
অনেক কোম্পানির শেয়ার কিনে প্রথম ধরনের রিস্ক অনেকটা কমানো যায়, কারণ সব কোম্পানিতে একসঙ্গে একই দুর্ঘটনা ঘটে না। কিন্তু একই বাজারে যত শেয়ারই কিনুন, দ্বিতীয় ধরনের রিস্ক থেকে যায়। এজন্যই একে "ডাইভারসিফাই করা যায় না এমন রিস্ক"ও বলা হয়।
ঢাকায় টানা কয়েক দিন ভারী বৃষ্টি হলে শহরের প্রায় সব রিকশাচালকের আয় কমে, কেউ খুব দক্ষ হলেও। একজনের রিকশা নষ্ট হওয়া তাঁর নিজস্ব সমস্যা; কিন্তু বৃষ্টি সবার সমস্যা। শেয়ারবাজারেও তাই: একটা কোম্পানির খারাপ খবর তার নিজের রিস্ক, আর পুরো অর্থনীতির ধাক্কা হলো মার্কেট রিস্ক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- ভালো কোম্পানি বাছাইয়ের সীমা বুঝতে: গবেষণা করে ভালো কোম্পানি বাছলে কোম্পানির নিজস্ব রিস্ক কমে, কিন্তু পুরো বাজারের পতন থেকে বাঁচা যায় না।
- ডাইভারসিফিকেশনের সীমা বুঝতে: ২০টা শেয়ার কিনলেও সবগুলো একই বাজারে থাকলে বড় পতনে প্রায় সবই একসঙ্গে পড়তে পারে।
- শেয়ারে বেশি রিটার্ন আশা করার কারণ বুঝতে: অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, যে রিস্ক এড়ানো যায় না, তা বহনের বিনিময়ে ইনভেস্টরেরা লম্বা সময়ে আমানতের চেয়ে বেশি রিটার্ন আশা করেন। আশা মানে নিশ্চয়তা নয়।
- ধারের বিপদ বুঝতে: মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনলে বাজার পড়ার সময় ক্ষতি বহুগুণ হয়, আর জোর করে বিক্রিও হয়ে যেতে পারে।
কোথা থেকে আসে, আর কত বড় হতে পারে
- অর্থনীতির গতি: মন্দায় বিক্রি আর লাভ কমে, তাই প্রায় সব কোম্পানির শেয়ারের দাম চাপে পড়ে।
- সুদের হার ও ইনফ্লেশন: সুদ বাড়লে আমানত আর বন্ড বেশি আকর্ষণীয় হয়, কোম্পানির ঋণের খরচও বাড়ে।
- বৈশ্বিক ধাক্কা: ১৯ অক্টোবর ১৯৮৭ ("ব্ল্যাক মানডে") আমেরিকার ডাও জোন্স সূচক এক দিনে ২২.৬% পড়ে, আর পতন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা বাজারে। ২০০৭–০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ অক্টোবর ২০০৭-এর চূড়া থেকে মার্চ ২০০৯-এর তলা পর্যন্ত ৫৭% পড়ে।
- বাংলাদেশে: কোভিডের সময় ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে সাধারণ ছুটিতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই লেনদেন বন্ধ থাকে, আবার চালু হয় ৩১ মে ২০২০, মোট ৬৬ দিন পর। কোম্পানি ভালো হোক বা খারাপ, ওই সময় কোনো শেয়ারই বেচা যায়নি। ২০১০-১১ সালের বড় পতনের কথা আছে "রিস্কের ধরন" পাঠে।
বিটা: বাজারের সঙ্গে কতটা দোলে
একটা শেয়ার বাজারের সঙ্গে কতটা ওঠানামা করে, তার মাপ হলো বিটা। বিটা ১ মানে, বাজার যতটা নড়ে, শেয়ারটাও গড়ে প্রায় ততটা নড়েছে। বিটা ১.৫ মানে বাজারের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ, আর ০.৫ মানে প্রায় অর্ধেক। বিটা অতীতের দাম থেকে হিসাব করা হয়, সময়ের সঙ্গে বদলায়, আর প্রতিটা দিনে মেলে না; এটা একটা মোটামুটি ধারণা।
মার্কেট রিস্ক পুরোপুরি দূর করা যায় না, তবে এর সঙ্গে মানিয়ে চলার কয়েকটা প্রচলিত উপায় আছে: শেয়ারের পাশাপাশি অন্য ধরনের অ্যাসেটে টাকা ভাগ করা (অ্যাসেট অ্যালোকেশন), যে টাকা শিগগিরই লাগবে তা শেয়ারে না রাখা, ধার করে না কেনা, আর আলাদা ইমার্জেন্সি ফান্ড রাখা যাতে খারাপ সময়ে বাধ্য হয়ে বেচতে না হয়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক আপনার ১,০০,০০০ টাকা দুটো শেয়ারে সমান ভাগ: ৫০,০০০ টাকা শেয়ার ক-তে (বিটা ১.৫), ৫০,০০০ টাকা শেয়ার খ-তে (বিটা ০.৬)।
- বাজার ২০% পড়ল। বিটা অনুযায়ী শেয়ার ক মোটামুটি ১.৫ × ২০% = ৩০% পড়বে (১৫,০০০ টাকা), শেয়ার খ মোটামুটি ০.৬ × ২০% = ১২% (৬,০০০ টাকা)।
- মোট আন্দাজি ক্ষতি ২১,০০০ টাকা, মানে প্রায় ২১%। পোর্টফোলিওর বিটা (১.৫ + ০.৬) ÷ ২ = ১.০৫। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
ফল: শেয়ার বদলে পোর্টফোলিওর বিটা কমানো-বাড়ানো যায়, কিন্তু শুধু শেয়ার দিয়ে মার্কেট রিস্ক শূন্য করা যায় না। আর বাস্তব ক্ষতি বিটার আন্দাজ থেকে বেশ আলাদা হতে পারে।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "কোম্পানি ভালো, তাই বাজার পড়লেও এটা পড়বে না" ভাবা। বড় পতনে ভালো কোম্পানির শেয়ারও সাধারণত পড়ে।
- অনেকগুলো শেয়ার থাকলেই রিস্ক নেই ধরে নেওয়া, যদিও সবগুলো একই বাজারে।
- ধার বা মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কেনা, যাতে বাজার পড়লে ক্ষতি আরও বড় হয়।
- বিটাকে নিশ্চিত মাপ ভাবা। এটা অতীতের গড়, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়।
যত ভালো শেয়ারই বাছুন, পুরো বাজারের ঢেউ থেকে পুরোপুরি বাঁচা যায় না; আসল প্রশ্ন হলো কতটা ঢেউ আপনি সইতে পারবেন।