ইনকাম স্টেটমেন্ট কী
ইনকাম স্টেটমেন্ট (একে প্রফিট অ্যান্ড লস স্টেটমেন্ট বা "পি অ্যান্ড এল"-ও বলে) একটা সময়ের পারফরম্যান্সের হিসাব। সবার ওপরে থাকে রেভিনিউ, মানে বিক্রি থেকে আয়। তারপর ধাপে ধাপে খরচ বাদ যায়: পণ্য বানানোর খরচ, অফিস ও বিক্রির খরচ, লোনের ইন্টারেস্ট, ট্যাক্স। সবার নিচে যা থাকে, সেটাই নিট প্রফিট, যাকে বলে "বটম লাইন"।
এটা ব্যালান্স শিটের মতো একটা দিনের ছবি নয়, বরং একটা সময়ের সিনেমা: জুলাই থেকে জুন পুরো বছরে কী হলো। বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ কোম্পানির হিসাব-বছর জুলাই থেকে জুন; ব্যাংক, বিমা আর নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণত জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর।
ধরা যাক রহিমের একটা চায়ের দোকান। এক মাসে চা-বিস্কুট বিক্রি করলেন ৬০,০০০ টাকা। চা-পাতা, দুধ, চিনি, বিস্কুট কিনতে গেল ৩৫,০০০ টাকা, দোকান ভাড়া আর কর্মচারীর বেতন ১৫,০০০ টাকা। মাস শেষে রইল ১০,০০০ টাকা। এটাই তাঁর দোকানের ছোট্ট ইনকাম স্টেটমেন্ট। বড় কোম্পানির হিসাবও একই যুক্তিতে চলে, শুধু লাইন বেশি। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- শেয়ারের দাম শেষ পর্যন্ত কোম্পানির আয়ের ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত। কোম্পানি লাভ করছে কি না, আর লাভ বাড়ছে না কমছে, সেটা এখান থেকেই দেখা যায়।
- ইপিএস (শেয়ারপ্রতি আয়) আর তা থেকে পি/ই রেশিও, দুটোই এই স্টেটমেন্টের নিট প্রফিট থেকে হিসাব হয়।
- বিক্রি বাড়ছে অথচ লাভ কমছে কি না, খরচ কোথায় বাড়ছে, এসব প্রশ্নের উত্তর মেলে লাইনগুলো কয়েক বছর পাশাপাশি রাখলে।
- ডিভিডেন্ড দেওয়া হয় মূলত লাভ থেকে। লাভের মান না বুঝলে ডিভিডেন্ড টেকসই কি না, তাও বোঝা কঠিন।
লাইনগুলো ওপর থেকে নিচে
- রেভিনিউ (বিক্রি বা টার্নওভার): পণ্য বা সেবা বিক্রি থেকে মোট আয়।
- কস্ট অব গুডস সোল্ড: বিক্রি করা পণ্য বানাতে বা কিনতে সরাসরি যা খরচ হয়েছে, যেমন কাঁচামাল, কারখানার শ্রমিকের মজুরি। রেভিনিউ থেকে এটা বাদ দিলে গ্রস প্রফিট।
- অপারেটিং খরচ: অফিস, প্রশাসন, বিজ্ঞাপন, বিতরণ, ডেপ্রিসিয়েশন। গ্রস প্রফিট থেকে এগুলো বাদ দিলে অপারেটিং প্রফিট, মানে মূল ব্যবসা থেকে লাভ।
- ফাইন্যান্স কস্ট: লোনের ইন্টারেস্ট। বেশি দেনার কোম্পানিতে এই লাইন অনেক লাভ খেয়ে ফেলতে পারে।
- ডব্লিউপিপিএফ: বাংলাদেশের শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী অনেক লাভজনক কোম্পানিকে লাভের ৫% শ্রমিকদের অংশগ্রহণ তহবিলে দিতে হয়, তাই অনেক স্টেটমেন্টে এই লাইন দেখবেন।
- ট্যাক্স ও নিট প্রফিট: ট্যাক্সের পর যা থাকে, সেটা শেয়ারহোল্ডারদের লাভ। একে মোট শেয়ার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে ইপিএস।
মার্জিন: লাভকে বিক্রির অনুপাতে দেখা
শুধু টাকার অঙ্ক দেখলে বড় কোম্পানিকে সব সময় ভালো দেখাবে। তাই লাভকে বিক্রির শতাংশ হিসেবে দেখা হয়। গ্রস মার্জিন = গ্রস প্রফিট ÷ রেভিনিউ; অপারেটিং মার্জিন = অপারেটিং প্রফিট ÷ রেভিনিউ; নিট মার্জিন = নিট প্রফিট ÷ রেভিনিউ। প্রতি ১০০ টাকা বিক্রিতে কত টাকা থাকে, মার্জিন সেটাই বলে।
মার্জিনের তুলনা অর্থবহ হয় একই কোম্পানির আগের বছরের সঙ্গে বা একই খাতের অন্য কোম্পানির সঙ্গে। মুদি দোকানের মতো ব্যবসার মার্জিন স্বাভাবিকভাবে কম, ওষুধ বা সফটওয়্যারের মতো ব্যবসায় বেশি। তাই খাত না দেখে "ভালো মার্জিন" বলে কিছু নেই।
লাভের মান: যেখানে সাবধান থাকবেন
- একবারের আয়: জমি বা কারখানা বিক্রির লাভ, বা কোনো ক্ষতিপূরণ, এক বছরের লাভ ফুলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু পরের বছর তা আর আসবে না। নোট পড়ে দেখুন লাভের কতটা মূল ব্যবসা থেকে।
- লাভ মানেই নগদ নয়: বাকিতে বিক্রি করলেও রেভিনিউ দেখানো হয়। টাকা আসলে ঢুকল কি না, দেখতে হবে ক্যাশ ফ্লো স্টেটমেন্টে।
- কোয়ার্টার বনাম বছর: বাংলাদেশে কোম্পানিগুলো তিন মাস পর পর অনিরীক্ষিত (আন-অডিটেড) হিসাব দেয়, আর বছর শেষে নিরীক্ষিত হিসাব। মৌসুমি ব্যবসায় এক কোয়ার্টার দিয়ে পুরো বছর বিচার করা ভুল হতে পারে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক "রূপসা ফুডস লিমিটেড" নামের একটা কাল্পনিক কোম্পানি বছরে বিক্রি করল ৫০০ কোটি টাকা। পণ্য বানানোর খরচ ৩৫০ কোটি। গ্রস প্রফিট ১৫০ কোটি, গ্রস মার্জিন ৩০%।
- অফিস, বিক্রি ও বিতরণ খরচ ৭০ কোটি। অপারেটিং প্রফিট ৮০ কোটি (মার্জিন ১৬%)। লোনের ইন্টারেস্ট ২০ কোটি বাদে থাকে ৬০ কোটি।
- সহজ রাখার জন্য ধরা যাক ডব্লিউপিপিএফ আর ট্যাক্স মিলিয়ে ১৫ কোটি। নিট প্রফিট ৪৫ কোটি (মার্জিন ৯%)। কোম্পানির শেয়ার ১০ কোটিটি।
ফল: ইপিএস = ৪৫ কোটি ÷ ১০ কোটি শেয়ার = শেয়ারপ্রতি ৪.৫০ টাকা। প্রতি ১০০ টাকা বিক্রিতে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য থাকল ৯ টাকা। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শুধু নিট প্রফিট দেখা, লাভটা কোথা থেকে এল (মূল ব্যবসা নাকি একবারের আয়) তা না দেখা।
- বিক্রি বাড়লেই কোম্পানি ভালো করছে ভাবা, অথচ মার্জিন কমছে বা খরচ আরও দ্রুত বাড়ছে।
- লাভ আর নগদ টাকাকে এক মনে করা।
- এক কোয়ার্টার বা এক বছরের হিসাব দেখে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, কয়েক বছরের ধারা না দেখা।
ইনকাম স্টেটমেন্ট বলে কোম্পানি কত লাভ করল; ভালো ইনভেস্টর জিজ্ঞেস করেন, লাভটা কোথা থেকে এল, আর তা কি আবার আসবে?