বাজেট কী
বাজেট হলো আগামী মাসের আয় কোথায় কোথায় যাবে, তার একটা পরিকল্পনা। ট্র্যাকিং বলে টাকা কোথায় গেছে; বাজেট বলে টাকা কোথায় যাবে। দুটো মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যায় পরিকল্পনা কাজ করছে কি না।
বাজেটের নিয়মগুলো হলো আয় ভাগ করার তৈরি ছক, যাতে প্রতিটা খরচ নিয়ে আলাদা করে ভাবতে না হয়। কোনো নিয়মই সবার জন্য ঠিক নয়; আপনার আয়, পরিবার আর দায়িত্ব অনুযায়ী মানিয়ে নিতে হয়।
ধরা যাক নাদিয়া মাসের শুরুতে বেতন পেয়েই ঠিক করে নেন: ভাড়া, বাজার আর বাবা-মাকে পাঠানোর টাকা আলাদা; ৫,০০০ টাকা সঞ্চয়ে; আর বাকি টাকা ঘোরাঘুরি ও শখে। মাসের মাঝে কোনো দাওয়াতে যাওয়ার আগে তাঁকে আর ভাবতে হয় না "টাকা থাকবে তো?", কারণ শখের ভাগে কত আছে, তিনি জানেন। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- নিয়মিত ইনভেস্টমেন্টের টাকা বাজেট থেকেই আসে: সঞ্চয়ের ভাগ আগে ঠিক না থাকলে "যা বাঁচবে তা জমাব" প্রায়ই শূন্যে গিয়ে দাঁড়ায়।
- ইনভেস্টমেন্ট ভাঙতে না হয়: খরচের পরিকল্পনা থাকলে হঠাৎ টাকার দরকারে এফডিআর বা শেয়ার অসময়ে ভাঙার ঝুঁকি কমে।
- লক্ষ্যকে মাসিক অঙ্কে বদলাতে: "পাঁচ বছরে এত টাকা" লক্ষ্যটা বাজেটে "প্রতি মাসে এত টাকা" হয়ে কাজের জিনিস হয়।
- লাইফস্টাইল ইনফ্লেশন ঠেকাতে: আয় বাড়লে খরচ যেন নিজে থেকে না বাড়ে, বাজেট সেটা চোখে রাখে।
৫০/৩০/২০ নিয়ম
সবচেয়ে পরিচিত নিয়মটা জনপ্রিয় হয় মার্কিন আইনের অধ্যাপক এলিজাবেথ ওয়ারেনের সহ-লেখা ২০০৫ সালের বই All Your Worth থেকে। হাতে পাওয়া আয়ের ৫০% প্রয়োজনে (ভাড়া, বাজার, বিল, কিস্তি), ৩০% চাওয়ায় (বাইরে খাওয়া, ঘোরা, শখ), আর ২০% সঞ্চয় ও ধার শোধে।
বাংলাদেশে অনেক পরিবারের জন্য প্রয়োজনের ভাগ ৫০%-এর বেশি হয়। বিবিএসের হায়েস ২০২২ অনুযায়ী, গড় পরিবারের খরচের প্রায় ৪২% যায় শুধু খাবারে। তার সঙ্গে ভাড়া আর বাবা-মা বা আত্মীয়দের সাহায্য যোগ হলে ৫০% সহজেই ছাড়িয়ে যায়। তাই অনেকে ৬০/২০/২০ বা ৭০/১৫/১৫-এর মতো ভাগ দিয়ে শুরু করেন। মূল কথা অনুপাত নয়, সঞ্চয়ের একটা নির্দিষ্ট ভাগ রাখা।
অন্য কয়েকটা পদ্ধতি
- আগে নিজেকে পে করুন: বেতন আসার দিনই সঞ্চয়ের টাকা আলাদা করুন (যেমন ডিপিএস বা আলাদা অ্যাকাউন্টে), বাকিটা দিয়ে মাস চালান। খরচের পরে নয়, খরচের আগে সঞ্চয়।
- জিরো-বেসড বাজেট: আয়ের প্রতিটা টাকাকে একটা কাজ দিন, যতক্ষণ না "বাকি" শূন্য হয়। সঞ্চয়ও একটা কাজ। সময় লাগে, কিন্তু সবচেয়ে বিস্তারিত।
- খাম পদ্ধতি: বাজার, যাতায়াত, শখ, প্রতিটার জন্য আলাদা খাম বা আলাদা ওয়ালেটে টাকা রাখুন। খাম খালি হলে সেই খাতে মাসের খরচ শেষ।
অনিয়মিত আয়ে বাজেট
ফ্রিল্যান্সার, ব্যবসায়ী, কৃষক বা কমিশনে কাজ করা মানুষের আয় মাসে মাসে ওঠানামা করে। এক্ষেত্রে গত এক বছরের সবচেয়ে কম আয়ের মাসগুলোর কাছাকাছি একটা অঙ্ক ধরে প্রয়োজনের খরচ সাজান। ভালো মাসের বাড়তি টাকা আগে একটা "বাফার" অ্যাকাউন্টে রাখুন, যা খারাপ মাসে ঘাটতি মেটাবে।
হাতে-কলমে হিসাব
- ৫০/৩০/২০: প্রয়োজন ২০,০০০, চাওয়া ১২,০০০, সঞ্চয় ৮,০০০ টাকা।
- কিন্তু ধরা যাক ভাড়া ১২,০০০, বাজার ৮,০০০ আর বাবা-মাকে পাঠানো ৪,০০০, প্রয়োজনই ২৪,০০০ টাকা, মানে ৬০%।
- তাহলে ৬০/২৫/১৫ ভাগ: প্রয়োজন ২৪,০০০, চাওয়া ১০,০০০, সঞ্চয় ৬,০০০ টাকা।
- বেতন বাড়লে বাড়তি অংশের অর্ধেক সঞ্চয়ে দিলে ধীরে ধীরে ২০%-এর দিকে যাওয়া যায়।
ফল: নিয়মটা হুবহু না মানলেও চলে; জরুরি হলো সঞ্চয়ের ভাগটা আগে ঠিক করা আর সময়ের সঙ্গে বাড়ানো। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| প্রয়োজন | চাওয়া | সঞ্চয় | |
|---|---|---|---|
| ৫০/৩০/২০ | ২০,০০০ | ১২,০০০ | ৮,০০০ |
| ৬০/২৫/১৫ | ২৪,০০০ | ১০,০০০ | ৬,০০০ |
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- কোনো নিয়ম হুবহু না মেলায় বাজেটই বাদ দেওয়া। ছকটা মানিয়ে নিন, ছেড়ে দেবেন না।
- "চাওয়া"-র ভাগ শূন্য রাখা। খুব কঠিন বাজেট কয়েক সপ্তাহ পরে ভেঙে পড়ে; একটু আনন্দের জায়গা রাখলে টেকে বেশি।
- ঈদ, ভর্তি বা চিকিৎসার মতো অনিয়মিত খরচ বাজেটে না রাখা, তারপর সঞ্চয় ভেঙে ফেলা।
- একবার বাজেট বানিয়ে আর না দেখা। আয়, দাম আর পরিবারের প্রয়োজন বদলায়; কয়েক মাস পরপর বাজেটও বদলান।
বাজেটের কোনো নিয়মই জাদু নয়। যে নিয়ম আপনি মাসের পর মাস মানতে পারবেন, আর যেখানে সঞ্চয় খরচের আগে আসে, সেটাই আপনার জন্য ভালো নিয়ম।