হার্ডিং ও FOMO কী
হার্ডিং শব্দটা এসেছে পশুর পাল থেকে: একটা গরু যেদিকে দৌড়ায়, বাকিরাও সেদিকে ছোটে, কেন ছুটছে না জেনেই। ইনভেস্টমেন্টে হার্ডিং মানে অনেক মানুষ কিনছে বলে কেনা, অনেকে বেচছে বলে বেচা, নিজে কোনো কারণ যাচাই না করে।
FOMO হলো "ফিয়ার অব মিসিং আউট", অর্থাৎ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয়। বন্ধু, আত্মীয় বা সহকর্মী লাভের গল্প করলে মনে হয় "আমিই শুধু পিছিয়ে আছি"। এই অনুভূতি প্রায়ই মানুষকে ঠিক সেই সময়ে বাজারে টেনে আনে, যখন দাম অনেক বেড়ে গেছে।
ধরা যাক তানভীরের অফিসে লাঞ্চের সময় সবাই একটা নতুন অনলাইন "ইনভেস্টমেন্ট" নিয়ে কথা বলে। কেউ বলে মাসে ভালো লাভ পেয়েছে, কেউ স্ক্রিনশট দেখায়। তানভীর জানেন না প্রতিষ্ঠানটা কে চালায় বা লাইসেন্স আছে কি না। কিন্তু সবাই আছে, তাই তিনিও টাকা দেন। তাঁর সিদ্ধান্তের আসল কারণ তথ্য নয়, ভিড়। ঘটনাটা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- দেরিতে ঢোকা: ভিড় যখন চোখে পড়ে, তখন দাম সাধারণত অনেকটা বেড়ে গেছে, তাই ভিড়ের পেছনে ঢুকলে প্রায়ই বেশি দামে কেনা হয়।
- একসঙ্গে বেরোনোর চাপ: ভিড় যখন বেরোতে শুরু করে, সবাই একসঙ্গে বেচতে চায়, তখন দাম খুব দ্রুত পড়ে আর ক্রেতা পাওয়া কঠিন হয়।
- প্রতারণার সহজ রাস্তা: অনেক স্কিম ইচ্ছা করে "সবাই লাভ করছে" ভাব তৈরি করে, যাতে নতুন মানুষ যাচাই না করেই আসে।
- নিজের লক্ষ্য ভুলে যাওয়া: অন্যের লাভের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে নিজের সময়, প্রয়োজন আর রিস্ক নেওয়ার সামর্থ্য মাথা থেকে সরে যায়।
মানুষ কেন ভিড়ের পেছনে ছোটে
১৯৫১ সালে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী সলোমন আশ একটা পরীক্ষা করেন। একটা দাগের সঙ্গে কোন দাগটা সমান লম্বা, এই সহজ প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো একটা দলের মধ্যে বসে। দলের বাকিরা গোপনে আগে থেকে ঠিক করা ভুল উত্তর দিত। একা থাকলে মানুষ ১%-এরও কম ভুল করত, কিন্তু দলের চাপে প্রায় ৩২% উত্তরে তারা দলের ভুল উত্তরটাই দিল। প্রায় ৭৫% মানুষ অন্তত একবার দলের সঙ্গে গলা মেলাল।
অর্থাৎ চোখের সামনে পরিষ্কার উত্তর থাকলেও ভিড়ের বিপক্ষে যাওয়া কঠিন লাগে। আর ইনভেস্টমেন্টে উত্তর কখনোই এত পরিষ্কার নয়, তাই ভিড়ের টান আরও বেশি। তাছাড়া অনেক সময় মানুষ ভাবে, "এত মানুষ যখন কিনছে, ওরা নিশ্চয়ই কিছু জানে", অথচ হয়তো সবাই একে অপরকে দেখেই কিনছে।
বাংলাদেশে: ২০১০ সালের শেয়ারবাজার
দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে বিও অ্যাকাউন্টের সংখ্যা এক বছরে প্রায় ১২.৫ লাখ থেকে বেড়ে ডিসেম্বরে প্রায় ৩২.১ লাখে পৌঁছায়, অর্থাৎ প্রায় ১৫৪% বৃদ্ধি। ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় প্রতি মাসেই দাম বেড়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেকে কোম্পানি যাচাই না করে ব্রোকার বা পরিচিতজনের কথায় আর গুজবে কেনাবেচা করতেন, কেউ কেউ ধার করেও।
ডিসেম্বর ২০১০ থেকে বাজার দ্রুত পড়তে শুরু করে, আর অনেক নতুন ইনভেস্টর বড় লোকসানে পড়েন। এই পতনের বিস্তারিত বাবল ও ক্র্যাশ লেসনে আছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে FOMO
- ফেসবুক, ইউটিউব বা টেলিগ্রামে মানুষ লাভের স্ক্রিনশট দেখায়, লোকসানের নয়। ফলে মনে হয় সবাই জিতছে।
- "আজই শেষ সুযোগ", "সীমিত আসন", এমন কথা ইচ্ছা করে FOMO জাগাতে ব্যবহার করা হয়।
- কেউ কেউ দল বেঁধে কোনো শেয়ার বা কয়েনের দাম তুলে, অন্যদের ঢুকিয়ে, নিজেরা বেচে বেরিয়ে যায়। এর নাম পাম্প অ্যান্ড ডাম্প।
- একটা ছোট প্রশ্ন সাহায্য করে: "কেউ কিছু না বললেও কি আমি এটা কিনতাম?"
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "এত মানুষ যখন আছে, নিশ্চয়ই ঠিক আছে" ভেবে নিজে যাচাই না করা।
- অন্যের লাভের স্ক্রিনশট দেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া।
- FOMO-তে পড়ে নিজের ইমার্জেন্সি ফান্ড বা ধার করা টাকা ঢালা।
- ভিড় বেরোতে শুরু করলে আতঙ্কে যে দামেই হোক বেরিয়ে আসা, আবার ভিড়ের পেছনেই।
ভিড় কোনো তথ্য নয়। অনেক মানুষ কিনছে মানে শুধু এটুকুই যে অনেক মানুষ কিনছে; কেন কিনছেন, সেই উত্তর নিজের হতে হবে।