ইনভেস্টিংয়ে ধৈর্য মানে কী
ইনভেস্টিংয়ে ধৈর্য মানে ভেবেচিন্তে নেওয়া সিদ্ধান্তকে সময় দেওয়া: প্রতিদিনের দামের ওঠানামায় প্রতিক্রিয়া না দেখানো, আর কম্পাউন্ডিংকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া। একটা ভালো সিদ্ধান্তের ফলও ছয় মাসে খারাপ দেখাতে পারে; পাঁচ-দশ বছরে আসল ছবিটা বোঝা যায়।
ধৈর্য মানে কিছু না দেখে বসে থাকা নয়। নিয়মিত খোঁজ রাখবেন, কিন্তু কাজ করবেন কারণ বদলালে, শুধু দাম বদলালে নয়। কোম্পানির ব্যবসা খারাপ হয়ে গেলে বা আপনার নিজের লক্ষ্য বদলালে সিদ্ধান্ত বদলানোই যুক্তিসংগত।
আম বাগানের কথা ভাবুন। ধরা যাক করিম সাহেব একটা আমের চারা লাগালেন। প্রতি সপ্তাহে যদি তিনি মাটি খুঁড়ে দেখেন শিকড় কতটা বেড়েছে, চারাটা হয়তো মরেই যাবে। আবার কয়েক বছর একেবারে খোঁজ না নিলে পোকায় ধরলেও টের পাবেন না। পানি দেওয়া, মাঝে মাঝে দেখা, আর ফলের জন্য কয়েক বছর অপেক্ষা: ইনভেস্টিংয়ের ধৈর্যও অনেকটা এমন।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- কম্পাউন্ডিংয়ের জন্য সময় লাগে: আয়ের ওপর আয়ের প্রভাব প্রথম কয়েক বছরে ছোট দেখায়, পরে বড় হয়। মাঝপথে বারবার বের হয়ে গেলে সেই বড় অংশটা হাতছাড়া হয়।
- প্রতিটা কেনা-বেচায় খরচ আছে: ব্রোকারের কমিশন, কেনা আর বেচার দামের ফারাক, আর লাভ হলে কর। ঘন ঘন ট্রেড করলে এই ছোট খরচগুলো জমে বড় হয়।
- ছোট সময়ের দাম প্রায় এলোমেলো: এক সপ্তাহ বা এক মাসে শেয়ারের দাম কোথায় যাবে, তা অনেক সময় খবর, গুজব আর আবেগে চলে। লম্বা সময়ে ব্যবসার আয় বেশি গুরুত্ব পায়।
- অধৈর্যই অনেক স্ক্যামের দরজা: "দ্রুত দ্বিগুণ" জাতীয় প্রস্তাব কাজ করে কারণ মানুষ অপেক্ষা করতে চায় না।
গবেষণা কী বলে
অর্থনীতিবিদ ব্র্যাড বারবার আর টেরেন্স ওডিন যুক্তরাষ্ট্রের একটা ব্রোকারেজের ৬৬,৪৬৫টি পরিবারের ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের লেনদেন বিশ্লেষণ করেছিলেন। যাঁরা সবচেয়ে বেশি ট্রেড করতেন, তাঁরা বছরে গড়ে প্রায় ১১.৪% আয় করেছেন, যখন বাজার আয় করেছে প্রায় ১৭.৯%। তাঁদের গবেষণাপত্রের নামটাই ছিল "ট্রেডিং ইজ হ্যাজার্ডাস টু ইয়োর ওয়েলথ", মানে ট্রেডিং আপনার সম্পদের জন্য ক্ষতিকর। তাঁরা এর বড় কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস।
এটা পুরোনো আর বিদেশি তথ্য, তাই সংখ্যাগুলো হুবহু বাংলাদেশে খাটবে না। কিন্তু মূল শিক্ষাটা মনে রাখার মতো: বেশি কাজ করা মানেই বেশি আয় নয়, আর প্রতিটা বাড়তি লেনদেনের খরচ আয় থেকেই কাটা যায়।
ধৈর্য, জেদ আর অবহেলা
ধৈর্যের নামে দুটো ভুল সহজে ঢুকে পড়ে। একটা হলো জেদ: ব্যবসা স্পষ্টভাবে খারাপ হয়ে গেলেও "একদিন দাম ফিরবে" ভেবে ধরে রাখা, শুধু লোকসান মেনে নিতে কষ্ট হয় বলে। আরেকটা হলো অবহেলা: বছরের পর বছর কোনো খোঁজই না রাখা।
- ধৈর্য: কারণ এখনও ঠিক আছে, তাই দাম পড়লেও অপেক্ষা করছি।
- জেদ: কারণ আর ঠিক নেই, কিন্তু ভুল মানতে চাই না বলে ধরে আছি।
- অবহেলা: কারণ ঠিক আছে কি না, সেটাই জানি না।
ধৈর্য ধরে রাখার কিছু উপায়
- পোর্টফোলিও কম দেখুন: প্রতিদিন দাম দেখলে প্রতিদিনই কিছু করতে ইচ্ছে করে। মাসে একবার বা নির্ধারিত রিভিউয়ের দিনে দেখাই যথেষ্ট হতে পারে।
- কেনার সময় কারণটা লিখে রাখুন: পরে দাম পড়লে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, কারণটা কি বদলেছে, নাকি শুধু দাম?
- শুধু লম্বা মেয়াদের টাকা ইনভেস্ট করুন: যে টাকা আগামী এক-দুই বছরে লাগবে, তা শেয়ারে থাকলে দাম পড়ার সময় ধৈর্য ধরা প্রায় অসম্ভব।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক দুজন বন্ধু ১,০০,০০০ টাকা করে একই ধরনের শেয়ারে ইনভেস্ট করলেন, আর খরচের আগে দুজনের পোর্টফোলিওই বছরে গড়ে ১০% বাড়ে।
- প্রথম জন প্রায় কিছুই বেচাকেনা করেন না। দ্বিতীয় জন ঘন ঘন ট্রেড করেন; কমিশন, দামের ফারাক আর ভুল সময়ে কেনা-বেচা মিলিয়ে ধরা যাক বছরে ৫% খেয়ে যায়, তাই তাঁর আয় দাঁড়ায় বছরে ৫%।
- ১০ বছর পরে প্রথম জনের হাতে প্রায় ২,৫৯,০০০ টাকা (১,০০,০০০ × ১.১০^১০)। দ্বিতীয় জনের হাতে প্রায় ১,৬৩,০০০ টাকা (১,০০,০০০ × ১.০৫^১০)।
ফল: একই বাজারে থেকেও ফারাক প্রায় ৯৬,০০০ টাকা, মানে শুরুর পুরো টাকার প্রায় সমান। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র; আসল খরচ আপনার ব্রোকার আর লেনদেনের ধরনের ওপর নির্ভর করে।
বছর
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| কম লেনদেন | ঘন ঘন লেনদেন | |
|---|---|---|
| ০ | ১ লাখ | ১ লাখ |
| ১ | ১.১ লাখ | ১.১ লাখ |
| ২ | ১.২ লাখ | ১.১ লাখ |
| ৩ | ১.৩ লাখ | ১.২ লাখ |
| ৪ | ১.৫ লাখ | ১.২ লাখ |
| ৫ | ১.৬ লাখ | ১.৩ লাখ |
| ৬ | ১.৮ লাখ | ১.৩ লাখ |
| ৭ | ২.০ লাখ | ১.৪ লাখ |
| ৮ | ২.১ লাখ | ১.৫ লাখ |
| ৯ | ২.৪ লাখ | ১.৬ লাখ |
| ১০ | ২.৬ লাখ | ১.৬ লাখ |
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- কয়েক সপ্তাহ বা মাসের ফল দেখে সিদ্ধান্তকে ভালো বা খারাপ বলে ফেলা।
- "কিছু একটা করতেই হবে" ভেবে অকারণে কেনা-বেচা করা। অনেক সময় কিছু না করাটাই সিদ্ধান্ত।
- লোকসান মেনে নিতে না পারাকে ধৈর্য বলে ভাবা।
- অল্প সময়ের দরকারি টাকা দীর্ঘমেয়াদি ইনভেস্টমেন্টে রেখে পরে বাধ্য হয়ে খারাপ দামে বেচা।
ধৈর্য মানে কারণ ঠিক থাকলে সময় দেওয়া, আর কারণ বদলালে কাজ করা; শুধু দাম বদলালে নয়।