প্রশ্ন করার অভ্যাস কী
প্রশ্ন করার অভ্যাস মানে কোনো ইনভেস্টমেন্ট বা "আয়ের সুযোগ"-এ টাকা দেওয়ার আগে কয়েকটা নির্দিষ্ট প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর চাওয়া, আর সেই উত্তর নিজে যাচাই করা। প্রস্তাবটা যে-ই দিক, আত্মীয়, বন্ধু, সহকর্মী বা নামকরা কেউ, প্রশ্নগুলো একই থাকে।
প্রশ্ন করা অভদ্রতা বা অবিশ্বাস নয়; এটা নিজের কষ্টের টাকার দায়িত্ব নেওয়া। একটা সৎ প্রস্তাবের পেছনের মানুষ সাধারণত সময় নিয়ে বুঝিয়ে বলেন, কাগজপত্র দেখান, আর ভেবে দেখার সময় দেন।
ধরা যাক পারভীনের এক পরিচিত বললেন, "আমাদের একটা গ্রুপ আছে, মাসে ১০% লাভ, গত ছয় মাস ধরে আমি নিজে পাচ্ছি।" পারভীন জিজ্ঞেস করলেন, "টাকাটা ঠিক কোথায় খাটানো হয়? কোন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আছে? চুক্তির কাগজ দেখাতে পারবেন?" উত্তর এল, "এত প্রশ্ন করলে হবে না, আজকের মধ্যে না দিলে সিট শেষ।" উত্তরের চেয়ে উত্তর না দেওয়ার ধরনটাই পারভীনকে সতর্ক করল। এটা একটা কাল্পনিক উদাহরণ।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- প্রতারণা টেকে প্রশ্নহীন বিশ্বাসে: বেশিরভাগ স্ক্যাম ভেঙে পড়ে যখন কেউ জিজ্ঞেস করে "লাভটা আসছে কোথা থেকে?"
- সৎ প্রস্তাবও বোঝা দরকার: বৈধ ইনভেস্টমেন্টেও রিস্ক, খরচ আর টাকা তোলার শর্ত থাকে। প্রশ্ন না করলে পরে অবাক হতে হয়।
- সময় কেনা যায়: প্রশ্ন করলে স্বাভাবিকভাবেই সিদ্ধান্ত একটু পিছিয়ে যায়, আর তাড়াহুড়োর চাপ কমে।
- পরে অভিযোগ করতে কাজে লাগে: কে কী বলেছিল, কোন প্রতিষ্ঠানের নামে, কোন কাগজে, তা জানা থাকলে কিছু ভুল হলে প্রমাণ থাকে।
আমরা কেন প্রশ্ন করি না
- সম্পর্কের চাপ: আত্মীয় বা বড় ভাই-বোন প্রস্তাব দিলে প্রশ্ন করাকে অসম্মান মনে হয়।
- বোকা দেখানোর ভয়: "সবাই বুঝছে, আমিই বুঝছি না" ভেবে চুপ থাকা।
- অন্যদের লাভের গল্প: পরিচিত কেউ লাভ পাচ্ছেন দেখলে মনে হয় প্রশ্নের দরকারই নেই। অথচ পঞ্জি স্কিমে প্রথম দিকের মানুষেরা সত্যিই টাকা পান, পরের মানুষের টাকা থেকে।
- তাড়ার চাপ: "আজই শেষ সুযোগ" শুনলে ভাবার সময় থাকে না। এই চাপ প্রায়ই ইচ্ছে করেই তৈরি করা হয়।
যেকোনো প্রস্তাবে যে প্রশ্নগুলো করবেন
যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক এসইসি ইনভেস্টরদের জন্য পাঁচটা মূল প্রশ্নের একটা তালিকা প্রকাশ করে: বিক্রেতার লাইসেন্স আছে কি না, ইনভেস্টমেন্টটা নিবন্ধিত কি না, রিস্কের তুলনায় সম্ভাব্য লাভ কেমন, আপনি নিজে বুঝছেন কি না, আর সমস্যা হলে কোথায় যাবেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেগুলো মোটামুটি এমন দাঁড়ায়:
- কে নিয়ন্ত্রণ করে? প্রতিষ্ঠানটার পুরো নাম কী, আর কোন নিয়ন্ত্রকের (বিএসইসি, বাংলাদেশ ব্যাংক, আইডিআরএ, এমআরএ) লাইসেন্স আছে? নিয়ন্ত্রকের নিজের ওয়েবসাইটে নিজে খুঁজে দেখুন।
- লাভ আসে কোথা থেকে? টাকা ঠিক কোন ব্যবসায় বা সম্পদে খাটানো হয়, আর সেই ব্যবসা এত আয় করে কীভাবে? উত্তরটা নিজের ভাষায় কাউকে বুঝিয়ে বলতে না পারলে, আপনি এখনও বোঝেননি।
- রিস্ক কী? সবচেয়ে খারাপ ক্ষেত্রে কত টাকা হারাতে পারি? "কোনো রিস্ক নেই" উত্তরটাই সবচেয়ে বড় সতর্কসংকেত।
- টাকা তুলব কীভাবে? কত দিনে, কী শর্তে, কত খরচে? লিখিত চুক্তি আছে কি না।
- খরচ কত? ফি, কমিশন, কর, সব মিলিয়ে। বিক্রেতা নিজে কীভাবে টাকা পান?
- সমস্যা হলে কোথায় যাব? কোন নিয়ন্ত্রকের কাছে অভিযোগ করা যায়?
উত্তরে কোন লক্ষণে সাবধান হবেন
বার্নার্ড ম্যাডফের প্রতারণা নিয়ে এসইসির নিজস্ব তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, ১৯৯২ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে সংস্থাটি তাঁর বিষয়ে ছয়টা গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ পেয়েছিল, কিন্তু কেউ সঠিক প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখেনি। প্রতিবেদনে যেসব লক্ষণের কথা আছে, তার মধ্যে ছিল প্রায় কখনও লোকসান না হওয়া অস্বাভাবিক স্থির রিটার্ন, কীভাবে আয় হয় তা নিয়ে গোপনীয়তা, আর এমন একটা ট্রেডিং কৌশল যা অন্য কেউ নকল করতে পারত না।
- উত্তর এড়িয়ে যাওয়া বা বিরক্ত হওয়া: "এত প্রশ্ন করলে হবে না", "বিশ্বাস না করলে দরকার নেই"।
- অস্পষ্ট বা জটিল উত্তর: "বিশেষ ফর্মুলা", "আন্তর্জাতিক ট্রেডিং", "গোপন কৌশল", কিন্তু বিস্তারিত কিছু নেই।
- কাগজের বদলে শুধু মুখের কথা বা স্ক্রিনশট: নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের নাম, লাইসেন্স নম্বর বা চুক্তি নেই।
- প্রশ্নের উত্তরে অন্যদের লাভের গল্প: "অমুক তো পাচ্ছেন" উত্তর নয়, শুধু প্রলোভন।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক কোনো অ্যাপ বলছে "প্রতিদিন ২% লাভ"। প্রশ্ন করুন: বছরে এটা কত দাঁড়ায়?
- লাভ আবার খাটালে, ৩৬৫ দিনে ১০,০০০ টাকা হয় ১০,০০০ × ১.০২^৩৬৫, মানে প্রায় ১,৩৭,৭০,০০০ টাকা: এক বছরে প্রায় ১,৩৭৭ গুণ।
- পরের প্রশ্ন: পৃথিবীর কোন বৈধ ব্যবসা টানা এত আয় করে? আর যদি সত্যিই করত, তারা অচেনা মানুষের কাছ থেকে ১০,০০০ টাকা নিতে কেন চাইবে?
ফল: একটা সাধারণ গুণ আর দুটো প্রশ্নেই দাবিটা অসম্ভব বলে বোঝা যায়। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র; যেকোনো "দৈনিক" বা "মাসিক" লাভের দাবিকে বছরে রূপান্তর করে দেখুন।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- পরিচিত বা বিশ্বস্ত মানুষ প্রস্তাব দিয়েছেন বলে প্রশ্ন না করা। প্রতারণার বড় অংশ ছড়ায় পরিচিতদের মাধ্যমেই, অনেক সময় তাঁরাও না জেনে।
- প্রস্তাবদাতার দেওয়া সার্টিফিকেট বা লিংক দেখে লাইসেন্স যাচাই হয়ে গেছে ভাবা, নিয়ন্ত্রকের নিজের ওয়েবসাইটে না দেখে।
- প্রথমবার অল্প টাকা ফেরত পেয়ে আর কোনো প্রশ্ন না করা। ছোট ফেরত দেওয়া অনেক সময় বড় টাকা নেওয়ার কৌশল।
- না বুঝেও "ঠিক আছে" বলে দেওয়া। বুঝতে না পারলে "না" বলা বা অপেক্ষা করাও একটা পূর্ণ উত্তর।
টাকা দেওয়ার আগে জিজ্ঞেস করুন: কে নিয়ন্ত্রণ করে, লাভ কোথা থেকে আসে, রিস্ক কী, টাকা তুলব কীভাবে। পরিষ্কার উত্তর না পেলে টাকাও দেবেন না।