পাম্প অ্যান্ড ডাম্প কী
পাম্প অ্যান্ড ডাম্পের দুটো ধাপ। "পাম্প" ধাপে একটা চক্র কোনো শেয়ার বা কয়েন নিয়ে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত খবর ছড়ায়: "বড় অর্ডার আসছে", "বিদেশি কোম্পানি কিনে নেবে", "কাল থেকে দাম দ্বিগুণ"। অনেক সময় নিজেরাই নিজেদের মধ্যে কেনাবেচা করে দেখায় যেন শেয়ারটার চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে।
"ডাম্প" ধাপে, দাম যখন উঠছে আর সাধারণ ইনভেস্টররা কিনতে ছুটছেন, চক্রটা তখন চুপচাপ নিজেদের শেয়ার বেচে দেয়। প্রচার থেমে যায়, কেনার চাপ কমে, আর দাম দ্রুত নামে। যাঁরা উঁচু দামে কিনেছিলেন, তাঁদের হাতে থাকে কম দামের শেয়ার।
ধরা যাক রাতে একটা মেসেজিং গ্রুপে পোস্ট এল: "কাল সকালে অমুক শেয়ার ধরেন, ভেতরের খবর আছে, ১ সপ্তাহে ডাবল।" গ্রুপে হাজারো সদস্য। সকালে অনেকে একসঙ্গে কেনায় দাম সত্যিই বাড়ে, আর তা দেখে আরও মানুষ কেনেন। কিন্তু যিনি পোস্ট দিয়েছিলেন, তিনি আগেই সস্তায় কিনে রেখেছিলেন, আর এই উঁচু দামেই বেচে দিচ্ছেন। ঘটনাটা কাল্পনিক।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- দাম বাড়া মানেই কোম্পানি ভালো হওয়া নয়: কোম্পানির আয় বা ব্যবসায় কিছু না বদলেও কৃত্রিম চাহিদায় দাম লাফাতে পারে।
- "টিপস" কে দিচ্ছে আর কেন দিচ্ছে, সেটা ভাবতে শেখা: যিনি আগে কিনে রেখেছেন, আপনি কিনলে তাঁরই লাভ।
- ছোট আর কম লেনদেনের শেয়ারে ঝুঁকি বেশি: অল্প টাকাতেই এগুলোর দাম নাড়ানো যায়, আর বেচতে গেলে ক্রেতা পাওয়া কঠিন হতে পারে।
- এটা আইনত অপরাধ: বাংলাদেশের সিকিউরিটিজ আইনে দাম কারসাজি আর গুজব ছড়ানো দণ্ডনীয়; না জেনে এতে জড়িয়ে পড়াও বিপদ।
কোথায় বেশি দেখা যায়
যেসব শেয়ারের মোট বাজারমূল্য কম, ফ্রি-ফ্লোট (বাজারে কেনাবেচার জন্য থাকা শেয়ার) কম, আর প্রতিদিনের লেনদেন অল্প, সেগুলো পাম্প করা সবচেয়ে সহজ। কোম্পানি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য কম থাকলে গুজব আরও সহজে বিশ্বাসযোগ্য হয়। ক্রিপ্টোতে, বিশেষ করে নতুন ও ছোট কয়েনে, একই কৌশল আরও খোলাখুলি দেখা যায়, কারণ সেখানে নজরদারি কম।
প্রচার এখন মূলত চলে ফেসবুক পেজ, মেসেজিং অ্যাপের গ্রুপ, ইউটিউব আর পেইড "সিগন্যাল" সার্ভিসে। গ্রুপে অনেক সদস্য থাকলে আর সবাই একই কথা বললে মনে হয় খবরটা সত্যি, যদিও উৎস একজনই।
বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক কী করেছে
শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক বিএসইসি (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ারের দাম নিয়ে গুজব ছড়ানোকে সিকিউরিটিজ আইনে দণ্ডনীয় বলে উল্লেখ করেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে ২০২১-এ বিএসইসি ফেসবুক আর হোয়াটসঅ্যাপে ছদ্মনামে গ্রুপ খুলে গুজব ছড়ানো মানুষদের চিহ্নিত করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ওই তদন্তের সুপারিশে বিটিআরসির সহায়তায় ৩১টি ফেসবুক পেজ বন্ধ করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিলেও তা সাধারণত ক্ষতির পরে আসে, আর যাঁরা উঁচু দামে কিনেছেন তাঁদের টাকা তাতে ফেরত আসে না। তাই নিজের সুরক্ষা নিজের প্রশ্ন করার অভ্যাসেই।
চেনার লক্ষণ
- "এখনই কিনুন", "আজই শেষ সুযোগ": তাড়া দেওয়া কেনার আহ্বান।
- "ভেতরের খবর" বা "নিশ্চিত টার্গেট প্রাইস"-এর দাবি, যা কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যে নেই।
- কোনো খবর ছাড়াই অল্প দিনে দাম আর লেনদেন হঠাৎ অনেক বেড়ে যাওয়া।
- প্রচার হঠাৎ থেমে যাওয়া, তারপর দ্রুত দরপতন।
হাতে-কলমে হিসাব
- একটা চক্র একটা ছোট কোম্পানির শেয়ার ২০ টাকা দরে কিনে রাখল। তারপর শুরু হলো গ্রুপে গ্রুপে "ভেতরের খবর"।
- কয়েক সপ্তাহে দাম উঠল ৫০ টাকায়। মিতু ৪৮ টাকা দরে ১,০০০টা শেয়ার কিনলেন: খরচ ৪৮,০০০ টাকা। চক্রটা এই সময়েই নিজেদের শেয়ার বেচে দিল।
- প্রচার থামল, দাম নেমে এল ২২ টাকায়। মিতুর শেয়ারের দাম এখন ২২,০০০ টাকা।
ফল: মিতুর লোকসান ২৬,০০০ টাকা, অর্থাৎ ইনভেস্টমেন্টের ৫০%-এর বেশি; আর চক্রটা প্রতি শেয়ারে মোটামুটি ২৫–৩০ টাকা লাভ করেছে। একজনের লাভ এখানে আরেকজনের লোকসান থেকেই আসে। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- "দাম তো বাড়ছেই, তাই খবরটা নিশ্চয়ই সত্যি" ভাবা। চক্রের কেনাবেচাতেও দাম বাড়ে।
- "আমি একটু লাভ নিয়েই বেরিয়ে যাব" ভাবা। চক্রটা কখন বেচবে আপনি জানেন না, তারা জানে।
- গ্রুপের সদস্যসংখ্যা বা "স্ক্রিনশটে লাভ" দেখে বিশ্বাস করা। এগুলো সহজেই বানানো যায়।
- কোম্পানির নিজের প্রকাশিত তথ্য (আর্থিক বিবরণী, ডিএসইর ঘোষণা) না দেখে শুধু গুজবে কেনা।
কেউ আপনাকে কোনো শেয়ার বা কয়েন কিনতে তাড়া দিলে আগে জিজ্ঞেস করুন: আমি কিনলে তাঁর কী লাভ?