রিব্যালান্সিং কী
ধরা যাক আপনি ঠিক করলেন টাকার ৬০% রাখবেন শেয়ার বা শেয়ারভিত্তিক ফান্ডে, আর ৪০% রাখবেন এফডিআর বা সঞ্চয়পত্রের মতো স্থির আয়ের জায়গায়। এই ভাগটাকে বলে অ্যাসেট অ্যালোকেশন। কিন্তু এক বছরে শেয়ারের দাম অনেক বাড়লে দেখা যাবে শেয়ারের ভাগ হয়ে গেছে ৭০%, আপনি কিছু না করলেও।
রিব্যালান্সিং মানে এই সরে যাওয়া ভাগকে আবার পরিকল্পনার কাছে ফেরানো: যেটা বেশি বেড়েছে তার কিছুটা বিক্রি করে, বা নতুন টাকা দিয়ে যেটা কম পড়েছে সেটা কিনে। উদ্দেশ্য বেশি লাভ করা নয়, বরং আপনার রিস্ক যেন আপনার পরিকল্পনার চেয়ে চুপচাপ বেড়ে না যায়।
ধরা যাক তানভীরের রান্নাঘরে চাল আর ডালের অনুপাত সে রাখে ২:১। মাসের মাঝে ডাল ফুরিয়ে গেলে সে বেশি করে ডাল কেনে, চাল নয়, যাতে অনুপাত আবার ঠিক হয়। পোর্টফোলিওর রিব্যালান্সিংও এমনই: যে ভাগ কমে গেছে সেটা পূরণ করা, যেটা বেশি হয়ে গেছে সেটা ছেঁটে ফেলা।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- রিস্ক নিয়ন্ত্রণে রাখতে: কখনো রিব্যালান্স না করলে সাধারণত শেয়ারের ভাগ ধীরে ধীরে বেড়ে যায়, কারণ দীর্ঘ সময়ে শেয়ার বেশি বাড়ে। তখন পোর্টফোলিও আপনার পরিকল্পনার চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
- আবেগ সামলাতে: নিয়ম মেনে রিব্যালান্স করলে দাম বেশি বাড়লে কিছুটা বিক্রি আর বেশি কমলে কিছুটা কেনা হয়, যা ভিড়ের সঙ্গে দৌড়ানোর উল্টো।
- লক্ষ্যের কাছে এলে: যত লক্ষ্য কাছে আসে (যেমন সন্তানের ভর্তি বা অবসর), তত কম রিস্ক নিতে চান অনেকে। রিব্যালান্সিং সেই বদলটা ধাপে ধাপে করতে সাহায্য করে।
কতবার আর কীভাবে
সাধারণত দুই রকম পদ্ধতি দেখা যায়। ক্যালেন্ডার পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময় পরপর, যেমন বছরে একবার, ভাগ মিলিয়ে দেখা হয়। সীমা পদ্ধতিতে কোনো ভাগ পরিকল্পনা থেকে একটা নির্দিষ্ট মাত্রা, যেমন ৫ শতাংশ পয়েন্ট, সরে গেলে রিব্যালান্স করা হয়। অনেকে দুটো মিলিয়ে করেন: বছরে এক-দুইবার দেখেন, আর বেশি সরে গেলে তবেই কেনাবেচা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় ফান্ড প্রতিষ্ঠানের গবেষণা (২০১০) সেখানকার ১৯২৬–২০০৯ সালের তথ্যে দেখেছে, মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বার্ষিক রিব্যালান্সিংয়ে রিস্কের তুলনায় রিটার্নে বড় পার্থক্য হয়নি, কিন্তু ঘন ঘন করলে কেনাবেচা আর খরচ অনেক বেশি হয়েছে। একই গবেষণায়, ৬০% শেয়ার আর ৪০% বন্ডের যে পোর্টফোলিও কখনো রিব্যালান্স করা হয়নি, শেষে তাতে শেয়ারের ভাগ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৯৮%।
- নতুন টাকা দিয়ে রিব্যালান্স: মাসে মাসে যা জমান, তা দিয়ে শুধু পিছিয়ে পড়া ভাগটা কিনলে অনেক সময় কিছু বিক্রিই করতে হয় না, ফলে খরচ আর কর দুটোই কম হয়।
সূত্র: ভ্যানগার্ড রিসার্চ, জুলাই ২০১০
সংখ্যাগুলো টেবিলে দেখুন
| শেয়ার | বন্ড | |
|---|---|---|
| শুরুতে | ৬০ | ৪০ |
| কখনো রিব্যালান্স না করলে, শেষে | ৯৮ | ২ |
খরচ আর কর মাথায় রাখা
প্রতিটি বিক্রিতে ব্রোকারেজ কমিশন বা অন্য চার্জ লাগে। মেয়াদের আগে এফডিআর ভাঙলে বা সঞ্চয়পত্র নগদ করলে মুনাফা কমে যেতে পারে। শেয়ার বিক্রিতে লাভ বেশি হলে মূলধনি মুনাফার ওপর করও আসতে পারে। তাই খুব ছোট বিচ্যুতির জন্য বারবার কেনাবেচা করলে রিব্যালান্সিংয়ের সুবিধার চেয়ে খরচ বেশি হয়ে যেতে পারে।
হাতে-কলমে হিসাব
- শুরুতে ১,০০,০০০ টাকা: ৬০,০০০ টাকা শেয়ারে, ৪০,০০০ টাকা স্থির আয়ে। পরিকল্পনা ৬০:৪০।
- ধরা যাক এক বছরে শেয়ার বাড়ল ৫০%, স্থির আয় বাড়ল ৮%। এখন শেয়ার ৯০,০০০ টাকা, স্থির আয় ৪৩,২০০ টাকা, মোট ১,৩৩,২০০ টাকা। শেয়ারের ভাগ এখন প্রায় ৬৮%।
- রিব্যালান্স করলে: প্রায় ১০,০৮০ টাকার শেয়ার বিক্রি করে স্থির আয়ে রাখা হলো। শেয়ার ৭৯,৯২০ টাকা, স্থির আয় ৫৩,২৮০ টাকা, আবার ৬০:৪০।
- পরের বছর শেয়ার ৩০% কমল (সরলতার জন্য স্থির আয় ধরা হলো অপরিবর্তিত)। রিব্যালান্স না করলে মোট দাঁড়ায় ১,০৬,২০০ টাকা; রিব্যালান্স করলে ১,০৯,২২৪ টাকা।
ফল: রিব্যালান্স করা পোর্টফোলিওতে পতন কম লেগেছে, কারণ রিস্ক পরিকল্পনামতো ছিল। তবে শেয়ার যদি আরও বাড়ত, রিব্যালান্স না করাই বেশি লাভ দিত। রিব্যালান্সিং লাভ বাড়ানোর কৌশল নয়, রিস্ক নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস। খরচ ও কর এখানে বাদ রাখা হয়েছে; সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- রিব্যালান্সিংকে বাড়তি লাভের উপায় ভাবা। এর মূল কাজ রিস্ককে পরিকল্পনার মধ্যে রাখা।
- কখনোই না করা, তারপর বড় পতনে টের পাওয়া যে পোর্টফোলিও অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল।
- খুব ঘন ঘন করা, যাতে কমিশন, ভাঙানোর জরিমানা আর কর মিলে সুবিধাটাই খেয়ে ফেলে।
- বাজারের খবর দেখে "এবার শেয়ার আরও বাড়বে" ভেবে নিয়ম ভেঙে ফেলা। তখন সেটা আর রিব্যালান্সিং থাকে না, অনুমান হয়ে যায়।
একটা ভাগ ঠিক করুন, বছরে এক-দুইবার মিলিয়ে দেখুন, আর বেশি সরে গেলে আগের পরিকল্পনায় ফিরুন: রিব্যালান্সিং আপনার রিস্ককে আপনার নিয়ন্ত্রণে রাখে।