অর্ডার কী, আর ধরন কেন আলাদা
অর্ডার হলো ব্রোকারের মাধ্যমে এক্সচেঞ্জকে দেওয়া একটা নির্দেশ: কোন শেয়ার, কেনা না বেচা, কতগুলো, আর কোন শর্তে। এক্সচেঞ্জের সিস্টেমে সব কেনার অর্ডার আর বেচার অর্ডার দাম অনুযায়ী সাজানো থাকে; একে বলে অর্ডার বুক। কেনার সবচেয়ে বেশি দাম আর বেচার সবচেয়ে কম দাম মিলে গেলে লেনদেন হয়। একই দামে একাধিক অর্ডার থাকলে আগে যেটা এসেছে, সেটা আগে মেলে।
মূল দুটো ধরন হলো মার্কেট অর্ডার আর লিমিট অর্ডার। মার্কেট অর্ডার বলে, "এখন যে দাম পাওয়া যায় সেই দামেই করো", তাই লেনদেন প্রায় নিশ্চিত, কিন্তু দাম নিশ্চিত নয়। লিমিট অর্ডার বলে, "এর বেশি দিয়ে কিনব না" বা "এর কমে বেচব না", তাই দাম আপনার নিয়ন্ত্রণে, কিন্তু লেনদেন না-ও হতে পারে।
বাজারে গিয়ে আপনি দোকানিকে বলতে পারেন, "যা দাম, এক কেজি ইলিশ দিন", তাহলে মাছ পাবেন, কিন্তু দাম আগে থেকে জানেন না। আবার বলতে পারেন, "১,২০০ টাকার বেশি হলে নেব না", তাহলে দাম আপনার হাতে, কিন্তু কেউ রাজি না হলে খালি হাতে ফিরবেন। প্রথমটা মার্কেট অর্ডার, দ্বিতীয়টা লিমিট অর্ডার। দামগুলো উদাহরণ মাত্র।
একজন ইনভেস্টরের কাছে কেন জরুরি
- অপ্রত্যাশিত দাম এড়াতে: কম লেনদেন হওয়া শেয়ারে মার্কেট অর্ডার দিলে শেষ লেনদেনের দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে কেনা হয়ে যেতে পারে।
- অর্ডার কেন মেলেনি বুঝতে: লিমিট দাম বাজারের নাগাল থেকে দূরে হলে, বা দামের সীমার (সার্কিট ব্রেকার) বাইরে হলে, অর্ডার পড়ে থাকে বা বাতিল হয়।
- আংশিক লেনদেন বুঝতে: ১,০০০ শেয়ারের অর্ডারে হয়তো ৩০০টা কেনা হলো, বাকিটা পড়ে রইল। অর্ডারের ধরন ঠিক করে বাকি অংশের কী হবে।
- আবেগের বদলে পরিকল্পনায় চলতে: আগে থেকে দাম ঠিক করে লিমিট দিলে হঠাৎ দাম লাফালে তাড়াহুড়ো করে কেনার ঝোঁক কমে।
আরও কিছু ধরন আর মেয়াদ
বাংলাদেশের এক্সচেঞ্জের ট্রেডিং সিস্টেমে মার্কেট আর লিমিট ছাড়াও আরও কিছু ধরনের অর্ডার আছে। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকা অনুযায়ী এর মধ্যে আছে স্টপ-লস, "ফিল অর কিল" আর বড় পরিমাণের জন্য আলাদা অর্ডার। আপনার ব্রোকারের অ্যাপে এর সবগুলো না-ও থাকতে পারে।
- স্টপ-লস অর্ডার: দাম একটা নির্দিষ্ট "ট্রিগার" দামে পৌঁছালে বা পেরোলে সেটা সক্রিয় হয়। এটা লোকসান সীমিত রাখার চেষ্টা, নিশ্চয়তা নয়; দাম হঠাৎ অনেক পড়লে ট্রিগারের চেয়ে কম দামে বিক্রি হতে পারে।
- ফিল অর কিল: পুরো পরিমাণ একসঙ্গে পাওয়া গেলে হবে, নইলে পুরো অর্ডারটাই বাতিল।
- অর্ডারের মেয়াদ: শুধু সেদিনের জন্য (গুড ফর ডে, দিনের শেষে না মিললে বাতিল), নির্দিষ্ট তারিখ পর্যন্ত, বা বাতিল না করা পর্যন্ত; সিএসইর নিয়মে শেষের দুটো সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে।
দিনের শুরু আর শেষের সেশন
ডিএসইতে মূল লেনদেনের আগে একটা প্রি-ওপেনিং সেশন থাকে, যেখানে অর্ডার জমা নেওয়া হয় আর যে দামে সবচেয়ে বেশি অর্ডার মেলে, সেটাই হয় শুরুর দাম। মূল সেশনের পরে থাকে পোস্ট-ক্লোজিং সেশন, যেখানে নতুন দাম দিয়ে অর্ডার দেওয়া যায় না, শুধু দিনের ক্লোজিং দামে কেনাবেচা হয়। সেশনের সময় আর নিয়ম মাঝে মাঝে বদলায়।
হাতে-কলমে হিসাব
- ধরা যাক একটা কম লেনদেন হওয়া শেয়ারের শেষ দাম ৪০ টাকা। বিক্রির অর্ডার বুকে আছে: ৪০ টাকায় ২০০টা, ৪১ টাকায় ৩০০টা, ৪৩ টাকায় ৫০০টা।
- আপনি ১,০০০টা শেয়ারের মার্কেট অর্ডার দিলেন: ২০০ × ৪০ = ৮,০০০; ৩০০ × ৪১ = ১২,৩০০; ৫০০ × ৪৩ = ২১,৫০০ টাকা।
- মোট ৪১,৮০০ টাকা, অর্থাৎ গড় দাম প্রতি শেয়ার ৪১.৮০ টাকা, যা শেষ দামের চেয়ে ৪.৫% বেশি। ৪০ টাকার লিমিট দিলে শুধু ২০০টা কেনা হতো, বাকি ৮০০টার অর্ডার পড়ে থাকত।
ফল: মার্কেট অর্ডারে লেনদেন নিশ্চিত, দাম নয়; লিমিট অর্ডারে দাম নিশ্চিত, লেনদেন নয়। কোনটা কখন মানানসই, তা নির্ভর করে শেয়ারটা কতটা লেনদেন হয় আর আপনার কাছে কোনটা বেশি জরুরি তার ওপর। সংখ্যাগুলো উদাহরণ মাত্র।
যে ভুলগুলো প্রায়ই হয়
- শেষ লেনদেনের দাম দেখে ধরে নেওয়া যে মার্কেট অর্ডার ঠিক সেই দামেই হবে।
- স্টপ-লসকে "লোকসান আর হবেই না" ভাবা। দাম লাফিয়ে পড়লে বা ক্রেতা না থাকলে লোকসান ট্রিগারের চেয়ে বেশি হতে পারে।
- অর্ডার দিয়ে ভুলে যাওয়া। পুরনো লিমিট অর্ডার মেয়াদ থাকা অবস্থায় পরে অপ্রত্যাশিতভাবে মিলে যেতে পারে।
- দাম, পরিমাণ বা কেনা/বেচা ভুল টাইপ করা; অর্ডার পাঠানোর আগে একবার মিলিয়ে না দেখা।
মার্কেট অর্ডার লেনদেন নিশ্চিত করে, দাম নয়; লিমিট অর্ডার দাম নিশ্চিত করে, লেনদেন নয়। অর্ডার দেওয়ার আগে ঠিক করুন কোনটা আপনার কাছে বেশি জরুরি।